বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

মার্কিন বাজারে অস্থিতিশীলতা ও বাংলাদেশের অর্থনীতি

যদিও সরকার দাম বৃদ্ধির পরিসীমা সীমাবদ্ধ করছে, বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে এবং মধ্য বা নিম্নআয়ের গ্রাহকরা এমন কিছু দেখতে পারেন যা তারা মহামারিকালেও দেখেননি। বাংলাদেশের নেতৃত্ব আগেও দেশকে ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছে এবং জনগণকেও সরকারের ওপর আস্থা রাখতে হবে।
প্রান্ত সাহা
  ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০
বিশ্ব বিগত দুই দশকে কয়েক দফা আর্থিক অস্থিতিশীলতা দেখেছে। গত দুই দশকে, ২০০১, ২০০৭ এবং ২০২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রায় তিনবার অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার মুখোমুখি হয়েছিল। মার্কিন অর্থনীতি বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বিধায় মার্কিন অর্থনীতিতে এই অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের মতো দেশ, যাদের অর্থনীতি মূলত তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভর করে, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্য সেসব দেশের অর্থনীতি মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। ২০২২-এর শুরুটা বাংলাদেশের জন্য কল্যাণকর বলেই ধারণা করা হচ্ছিল। করোনভাইরাস সংক্রমণ হ্রাস, স্বাভাবিক অর্থনৈতিক গতিশীলতায় ফিরে আসা এবং বিশ্ববাজার আবার চালু হওয়া- দেশকে একটি স্থিতিশীল এবং সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক রাষ্ট্রের আশা দেখিয়েছিল। তবে এই অগ্রগতি খুব সুদূরপ্রসারী হয়নি। ফেব্রম্নয়ারির শেষদিকে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর বৈশ্বিক পরিস্থিতি অবনতি হতে শুরু করে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি, ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির হার এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাধা বিশ্বব্যাপী মন্দার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তুলেছে এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিলে এর ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে বাংলাদেশও রেহাই পাবে না। ২০০৭ এবং ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় এবং এমনকি মহামারির সর্বোচ্চ সময়েও যখন বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল, সে সময়েও বাংলাদেশ উলেস্নখযোগ্য কোনো অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়নি। বিশ্বব্যাপী নানাবিধ অস্থিরতায়, দেশের এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি সম্প্রতি বিভিন্ন চাপের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে, যেমনটি বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছিল। এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি ৬.২৯ শতাংশে ছিল যা ক্রমেই বর্ধিত হয়ে জুলাই মাসে ৭.৪৮% গিয়ে দাঁড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতির এ ঊর্ধ্বগতি নিম্ন ও মধ্যআয়ের লোকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা গুরুতর চাপের মধ্যে ফেলেছে। আমদানির কার্যক্রম বৃদ্ধি কিছুটা অবকাশ দিয়েছিল কারণ এটি মহামারির পুনরুদ্ধারের সময় উন্নততর অর্থনৈতিক কার্যকলাপের ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের মধ্যে ডলারের মূল্য টাকার বিপরীতে আকাশচুম্বী হওয়ার সময় এটি দ্রম্নত সমস্যায় পরিণত হয়। জুলাই-আগস্টের দিকে ডলারের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও সেপ্টেম্বরের শুরুতে তা ৯৫ টাকায় নেমে আসে। যদিও দেশের বৈদেশিক লেনদেনের বর্তমান উদ্বৃত্ত দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাটতিতে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে, কিন্তু রেমিট্যান্স কমছে এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে রিজার্ভ চাপের মধ্যে রয়েছে। ক্রমেই বিভিন্ন আমদানি বিল পরিশোধ এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের জোগান দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ডলার ব্যয় করা হচ্ছে। বাজারে ডলারের চাহিদা ও জোগানের সরবরাহের ভিত্তিতে সমন্বয় করার জন্য কিছুটা বাধ্য হয়েই যেন টাকার অবমূল্যায়ন করতে হচ্ছে। এসব বিষয়গুলো মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বছরে মোট উৎপাদন বৃদ্ধির পরিমাণ নির্ধারণ করে, যা একটি দেশের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণকে প্রতিফলিত করে। কোনো বছরে সামগ্রিক ফলাফল কমে গেলে, অর্থনীতি সংকুচিত হয়, যার ফলে বৃদ্ধির হার শূন্যের নিচে চলে যায়, যাকে অর্থনৈতিক মন্দা বলা হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে, বাংলাদেশ রেকর্ড ৮.১৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। কোভিড-১৯ এর সময়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.৪৫ শতাংশে নেমে এসেছে। তারপরে ২০২০-২১ অর্থবছরে অর্থনীতি ৬.৯৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মূল্যস্ফীতি উদ্বেগের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সালের জুন মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.৫৬ শতাংশ, যা বিগত ২০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশে এক মাসে কিছু জাতের চালের দাম ১০ টাকা বেড়েছে, অন্যান্য জিনিসের দাম অস্থিতিশীল রয়েছে। সরকার চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৫.৩ শতাংশ নির্ধারণ করলেও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক আশা করছে বছরের শেষ নাগাদ তা আরও বেশি হবে। ডলারের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ যেন শূন্য না হয়ে যায় সেজন্য লড়াই করছে। গত দুই মাসে কয়েক দফা ডলারের মূল্য পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে ঝামেলায় পড়তে হয়েছে। দেশের ডলারের বাজারে নিয়ন্ত্রক শুল্ক প্রয়োগ করা হয়েছে। অসংখ্য আমদানিকৃত পণ্যের চাহিদা কমাতে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহকে উদ্দীপিত করার জন্য প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। বিগত অর্থবছরের এপ্রিল জুন মাসের মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় হয় ১০৬.২৭ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে আমদানি ব্যয় হয় ১৮৮.৪৫ মিলিয়ন ডলার। এই তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে প্রায় ৮২ মিলিয়ন ডলারের মতো বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায় গত অর্থবছরে (জুলাই ২১ থেকে জুন ২২) বাংলাদেশে ১৮.৭১ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ কম। জুলাই ২২ পর্যন্ত এই পরিমাণ ২০.৯৬ বিলিয়নে পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল, কিন্তু আমদানি এবং ডলার উভয়ই বেড়ে যাওয়ায় তা কমে মার্কিন ডলার ৩৮.৯৪ বিলিয়ন হয়েছে। অন্যদিকে বিশ্লেকরা, বর্তমান রিজার্ভকে আশ্বস্ত হিসেবে বিবেচনা করছেন না, যা মাত্র তিন মাসের জন্য আমদানি মূল্য পর্যাপ্ত করতে পারে। সরকারের মতে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় হয়েছে ২,৮২৪ ডলার, যা গত বছরের ২,৫৯১ ডলার থেকে বেশি। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১,০০০ মার্কিন ডলারে পৌঁছতে ৪০ বছর লেগেছিল, কিন্তু পরবর্তী দশ বছরে তা ১৮০ শতাংশ বেড়েছে। বিবিএসের মতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.২৫%। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ২৫.৯৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। জুন ২০২২ পর্যন্ত সরকারের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ৮১.৯৫ বিলিয়ন ডলার। 'দ্য গোবাল এমপস্নয়মেন্ট ট্রেন্ডস ফর ইয়ুথ' বা 'বিশ্বজুড়ে তরুণদের কর্মসংস্থানের প্রবণতা ২০২২' শীর্ষক এক প্রতিবেদনে আইএলও ঘোষণা দেয়, ২০২২ সালে এই তরুণ বেকারের সংখ্যা ৭ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছাতে পারে। তবে ২০২১ সালের চেয়ে তা কিছুটা কম (৭ কোটি ৫০ লাখ)। গত অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগ ৩৫.৩১ বিলিয়ন ডলার যা গত অর্থবছরের তুলনায় ৩৪.৮২% বেশি। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পরিস্থিতি এখন কী? এটা কি অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার মুখোমুখি হবে নাকি কাটিয়ে উঠবে? তর্ক-বিতর্ক চলতেই থাকবে, তবে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি আমরা স্বচক্ষেই দেখতে পাচ্ছি। উপরের পরিসংখ্যান এবং তথ্যসমূহ আমাদের নির্দেশ করে বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল বা উন্নয়নশীল অবস্থায় নেই বরং তার বিপরীত দিকে অবস্থান করছে। জাতীয় নির্বাচন কাছে আসছে। মন্দার প্রভাব থেকে জনগণকে রক্ষা করার জন্য এটি সরকারের জন্য একটি চমৎকার সুযোগ হতে পারে। যদিও সরকার দাম বৃদ্ধির পরিসীমা সীমাবদ্ধ করছে, বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে এবং মধ্য বা নিম্নআয়ের গ্রাহকরা এমন কিছু দেখতে পারেন যা তারা মহামারিকালেও দেখেননি। বাংলাদেশের নেতৃত্ব আগেও দেশকে ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছে এবং জনগণকেও সরকারের ওপর আস্থা রাখতে হবে। প্রান্ত সাহা : কলাম লেখক
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে