শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
walton1

র্যাবের নিষেধাজ্ঞা নাকি জঙ্গিবাদের উর্ত্থানযাবের নিষেধাজ্ঞা নাকি জঙ্গিবাদের উত্থান

সবচেয়ে বড় কথা জঙ্গিবাদের বিষয়টি শুধু দেশীয় কোনো বিষয় নয়, এক স্থানে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা সম্ভব হলে পুরো বিশ্বকেই আতঙ্কগ্রস্ত করা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজনর্ যাবের মতো এলিট ফোর্সের, প্রয়োজনর্ যাবের আরও আধুনিকীকরণ। তা হলে জঙ্গিবাদের যে কালিমা লেপন হয়েছিল সেটির পুনর্জাগরণ অসম্ভব নয়।
অধ্যাপক মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া
  ০১ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের করাল থাবা ও আতঙ্ক থেকে অনেক আগেই মুক্ত হয়েছে। দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান আফগানফেরত মুজাহেদিনের মাধ্যমে হলেও প্রকৃতপক্ষে জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ এবং পরে জেএমবির মাধ্যমেই উগ্রবাদের বিকাশ ঘটে। ২০০৫ সালে সারাদেশে সিরিজ বোমা হামলা এবং তার আগে সিনেমা হল ও আদালতে বিচারকদের ওপর বোমা হামলার মাধ্যমে আলোচনায় আসে জেএমবি। পরে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর হিযবুত তাহযিবের উত্থান হয়, নব্য জেএমবি যারা আবার সংগঠিত হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছিল তাদের কঠোর হস্তে দমন করতে সক্ষম হয়। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি হলে এবং বিভিন্ন বস্নগে কথিত ধর্মীয় অবমাননা সংক্রান্ত লেখালেখির প্রতিবাদে বস্নগার হত্যা ও নাশকতার সূচনা করে আনসারুলস্নাহ্‌ বাংলা টিম। পরে এরা নাম বদলে হয় আনসার আল ইসলাম। এদের সংক্রিয়তা দমনে সবচেয়ে উলেস্নখযোগ্য ভূমিকা রাখের্ যাপিট অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বার্ যাব নামে পরিচিত। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছিল ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ মদতে, বিএনপি জামায়াত সরকারের সরাসরি মদতে। ২০০১ সালের পরবর্তী সময়গুলোতে জঙ্গিবাদ ডালপালা মেলতে শুরু করে। রমনার বটমূলে বোমা হামলা, সারাদেশে একযোগে সিরিজ বোমাহামলা পুরো দেশকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলে। জেএমবির উত্থান, বাংলা ভাই, শায়খ আবদুর রহমানদের ত্রাসের রাজত্ব, দেশের সুনাম ভূলুণ্ঠিত করে বহির্বিশ্বের কাছে। সেসময় পুরো বিশ্বই নাইন ইলেভেনের ঘটনায় তখন আতঙ্কগ্রস্ত। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে জঙ্গিবাদকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার নজির প্রত্যক্ষ হয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বুকে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাবেশে নজিরবিহীন হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। গ্রেনেড হামলার প্রধান টার্গেট ছিলেন শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় আয়োজিত সমাবেশে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এসে সন্ত্রাসের শিকার হয়েছিলেন তিনি। ওই ঘটনায় শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও গ্রেনেডের আঘাতে আইভি রহমানসহ ২৩ জন নেতাকর্মী প্রাণ হারান। বাংলাদেশের ইতিহাসে সশস্ত্র জঙ্গিবাদের উত্থানের সর্ববৃহৎ আলামত দৃশ্যমান হয় ২০০৫ সালে জেএমবির ৬১টি জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে। বাংলাদেশে এই সমস্ত কর্মকান্ড অনেককেই বিস্মিত করে তোলে। বিস্মিত হওয়ার কারণ হলো, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি। অনেকের ধারণা, জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠে বাউল লালন যে দেশের মানুষের মানস গড়ে তুলেছেন, রবীন্দ্র-নজরুল যাদের প্রেরণার উৎস এবং সুফিবাদ যাদের বিশ্বাসের অংশ, তাদের পক্ষে উগ্রবাদের পথে হাঁটা অসম্ভব। অনেকের মতে, বাঙালির মনন-মানসেই সহনশীলতা ও প্রগতিশীলতার বীজ লুক্কায়িত আছে, জঙ্গিবাদ এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সর্বশেষ হলি আর্টিজেনের মতো নৃশংস ঘটনা ইঙ্গিত দেয়, দেশে জঙ্গিবাদের পুনরুত্থান ঘটানোর জন্য বিভিন্ন মহল তৎপর হয়ে আছে- যার্ যাবের ওপর অযাচিত নিষেধাজ্ঞা আসার পর থেকেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। জঙ্গিবাদ দমনের্ যাবের ভূমিকা, লাশ ও ত্রাসকে আশ্রয় করা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য অস্বস্তি ও গায়ের কাটা হয়ে উঠেছিল। প্রতিষ্ঠার পর আট বছর পার করল এলিট ফোর্সর্ যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বার্ যাব। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও জানমালের নিরাপত্তায় আরো সক্রিয় ভূমিকার জন্য পুলিশের নিয়মিত বাহিনীর পাশাপাশি গঠন করা হয়র্ যাব। মোট সাতটি ব্যাটালিয়ন পাঁচ হাজার ৫২১ জন লোকবল নিয়ে যাত্রা শুরু হয়র্ যাবের। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌ-বাহিনী, বিমানবাহিনী, বাংলাদেশ পুলিশ, বিজিবি, আনসার, কোস্ট গার্ড ও সিভিল সাভির্সের চৌকস সদস্যদের নিয়ে এ বাহিনী গঠন করা হয়। শুরুতেই সবার নজর কাড়তে সক্ষম হয়র্ যাব। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে সন্ত্রাসীদের মূর্তিমান আতঙ্ক। দেশের নানা দুর্যোগ আর বিপদশঙ্কুল পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের ভরসার স্থল হয়ে ওঠে। বিশেষত দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি আর শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নানামুখী অত্যাচারে জনগণের জীবন অতিষ্ঠ উঠলে এর দমনের্ যাবের ভূমিকা ছিল সব মহলে প্রশংসনীয়। চরমপন্থি, জঙ্গি, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ও মাদক নিয়ন্ত্রণের্ যাবের বহু সফল অভিযানের নজির রয়েছে। সন্ত্রাস দমন করে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, জাতীয়, সামাজিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে এ বাহিনী। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে সিরিজ বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয় জঙ্গি সংগঠন জেএমবি। ওই ঘটনায় নিহত ও আহত হয়েছেন অনেকে। এ ঘটনার পর জঙ্গি সংগঠনটির শক্তির উৎস ও তাদের দমনে মাঠে নামের্ যাব। এ বাহিনীর অত্যন্ত চৌকস গোয়েন্দা বিভাগ জেএমবিসহ বিভিন্ন ধর্মীয় জঙ্গি সংগঠনের আস্তানা, এদের মূল হোতা ও শক্তির জোগানদাতাদের খুঁজে বের করে।র্ যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হয় জেএমবি ও বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের কয়েকশ সদস্য। এর মধ্যে উলেস্নখযোগ্য হচ্ছে জেএমবি প্রধান শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলাভাই, সামরিক শাখার প্রধান আতাউর রহমান সানি প্রমুখ। এছাড়া সরকারের পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নান, আরমানসহ অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করের্ যাব।র্ যাব সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছর ১৮ মার্চ পর্যন্ত গত আট বছরে বিভিন্ন অপরাধের দায়ে এক লাখ ১৭ হাজার ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় বিভিন্ন সংগঠনের ৮৬২ জন সদস্যকে। যার মধ্যে শুধু জেএমবির সদস্য হচ্ছে ৫৬৩ জন। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ২০৪টি গ্রেনেড, ৭৫টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, দুই হাজার ৯২৯ রাউন্ড গোলাবারুদ, এক হাজার ৮১১ কেজি বিস্ফোরক ও বিপুলসংখ্যক সাংগঠনিক বই, সিডি ও লিফলেট। জঙ্গিবাদ দমন করতে আরও শক্তিশালী করার জন্য বর্তমান সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে র্'যাবের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ' প্রকল্পের আওতায় জিএসএম ইউএমটি ভেহিকুলার অ্যাকটিভ সাপোর্ট সিস্টেম কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ২৯ কোটি ৬৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকা। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জঙ্গি দমনের্ যাবের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করছে, এমতাবস্থায় তাদের কর্তৃক এরূপ আরোপিত নিষেধাজ্ঞার্ যাবের অগ্রগতির ধারাকে কিছুটা বিচলিত করছে। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার একাগ্রতা, নিষ্ঠা ও চেষ্টার ফলে বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদ দমনে রোল মডেল দেশ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছিল। এক সময়ের বিদেশি অনুদাননির্ভর দেশটি ইতোমধ্যে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ প্রবৃত্তির দেশে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ এশিযায় বাংলাদেশ এখন একটা আশা জাগানিয়া শক্তি; এটা স্বীকার করতেই হবে। বঙ্গোপসাগরে তথা ভারত মহাসাগরে নিজেদের চলাচলকে অবাধ করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু ভারত নয়, বাংলাদেশকেও আস্থায় নিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বাংলাদশ এখন সারা বিশ্বে জঙ্গিবাদ দমনে সফল এক দেশের নাম। এ বিষয়ে সাফল্য পাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দশকের পর দশক ধরে প্রচুর অর্থব্যয়ের পাশাপাশি ঘাম ঝরাতে হচ্ছে। সেই বাংলাদশেকে যুক্তরাষ্ট্র শুধু শুধু ঘাটাতে যাবে কেন। দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন ষড়যন্ত্র যে এখানে সক্রিয় তা দিনের আলোর মতই পরিষ্কার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক্ষেত্রে সবকিছুর আগে পিছে বিবেচনা করে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের পুনরুত্থান ঠেকানোর জন্য সাহায্যকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা জঙ্গিবাদের বিষয়টি শুধু দেশীয় কোনো বিষয় নয়, এক স্থানে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা সম্ভব হলে পুরো বিশ্বকেই আতঙ্কগ্রস্ত করা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজনর্ যাবের মতো এলিট ফোর্সের, প্রয়োজনর্ যাবের আরও আধুনিকীকরণ। তা হলে জঙ্গিবাদের যে কালিমা লেপন হয়েছিল সেটির পুনর্জাগরণ অসম্ভব নয়। অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া : ট্রেজারার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে