সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৩ মাঘ ১৪২৯
walton1

পাল্টে গেছে সিনেমার প্রচারণা

মাতিয়ার রাফায়েল
  ২৫ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:০০
চলতি সপ্তাহে মুক্তি পাওয়া 'অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন' সিনেমার প্রচারণায় পরীমনি
ঢাকাই সিনেমার সঙ্গে একসময়ে দেশের সর্বস্তরের মানুষের যেরকম আত্মীয়তা বা সম্পৃক্ততা ছিল, সেটা অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। আগে প্রযুক্তির যেসব সুবিধা ছিল সেগুলো আজকের মতো এত ব্যাপক ও সুবিস্তৃত না থাকলেও সেই সীমিত প্রযুক্তির মাধ্যমেই যতটুকু পারা যায়, ততটুকু সুবিধা নিয়েই বাংলা সিনেমাকে দেশের আপামর সব মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। কারণ সিনেমা প্রচারের জন্য প্রযুক্তির সেই সুবিধাগুলোও যথেষ্ট কার্যকর ছিল। তার মধ্যে অন্যতম প্রধান রেডিও। তখন টিভি প্রতি ঘরে ঘরে না থাকলেও রেডিওর ব্যবহার মোটামুটি অনেকেরই হাতে-হাতে ছিল। নিদেন ওয়ানব্যান্ড রেডিও তো শ্রমজীবী অনেক মানুষের হাতে-হাতেই থাকত। কখনো বা তাতে দুই বা ততোধিক শ্রোতাও থাকত। সেই রেডিওর প্রধান আকর্ষণই ছিল নতুন মুক্তি আসন্ন সিনেমার প্রচারণা। বাংলা সিনেমার প্রচারে রেডিও যে কত বড় ভূমিকা রেখেছে তা লিখে শেষ করা যাবে না। তখন বেলা ১টার পর থেকেই শুরু হতো মুক্তিপ্রাপ্ত অথবা মুক্তি প্রতিক্ষিত ছায়াছবির ওপর ভিত্তি করে বিশেষ অনুষ্ঠান। পরপর দুই-তিনটি সিনেমার বিজ্ঞাপন অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো। প্রতিটি সিনেমার বিজ্ঞাপন অনুষ্ঠানের দৈর্ঘ্য ছিল পনেরো মিনিট। এই পনেরো মিনিট দেশের আপামর শ্রোতা রেডিওর পাশে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বসে থাকত মুক্তিপ্রাপ্ত বা মুক্তি প্রতিক্ষিত সিনেমার বিজ্ঞাপন শুনতে। সেই সময়ে সিনেমার বিজ্ঞাপনে কণ্ঠ দিয়ে নাজমুল হোসাইন এবং মাজহারুল ইসলাম নামের দুইজন তো একপ্রকার তারকা খ্যাতিই অর্জন করে ফেলেছিলেন। নাজমুল হোসাইনকে তো এজন্য 'কণ্ঠরাজ' উপাধিও দেওয়া হয়েছিল। চলচ্চিত্রে যার পরিচয় সহকারী পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা, বিজ্ঞাপন কণ্ঠদাতা হিসেবে। 'হঁ্যা ভাই, আসিতেছে আসিতেছে আগামী শুক্রবার ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন পেক্ষাগৃহে...' সিনেমার সেই বিজ্ঞাপনের এমন দরাজ কণ্ঠের ঘোষণা সেই নব্বই দশক সময়ের দর্শকদের কানে এখনো বাজে। কিন্তু এখন সেই প্রচারের এমন দরাজ কণ্ঠ যেমন নেই সেই দর্শকও আর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে না কোনো প্রেক্ষাগৃহে। সিনেমা প্রচারণায় আরও একটি ব্যবহারও দেখা গেছে ব্যাপক। সেটি হচ্ছে মাইক। রিকশা বা ঘোড়ার টমটম গাড়িতে মাইক ব্যবহার করে 'হঁ্যা ভাই আসিতেছে...' এমন হাঁক ছেড়ে নতুন সিনেমার প্রচার বছরের পর বছরজুড়ে কত হয়েছে সেটাও বলে শেষ করা যাবে না। এই প্রচারে প্রেক্ষাগৃহের মালিকরাও প্রতিটি সপ্তাহের জন্যই থাকতেন উজ্জীবিত। প্রেক্ষাগৃহের সামনেসহ দর্শকের নজরে পড়ে এমন সুবিধামতো অন্যদিকের উপরে নায়ক-নায়িকার চিত্রসহ সিনেমাটির গল্পের মূল ভাব নিয়ে যে একাধিক বিশাল রঙিন পর্দা টাঙিয়ে রাখতে দেখা যেত সেটাও এখন কোনো প্রেক্ষাগৃহে দেখা যায় না। বিলুপ্তই হয়ে গেছে সেই বাহারি চিত্রটি। এখন অবস্থা এমন হয়েছে সিনেমায় দর্শক টানতে এখন শেষমেশ নায়ক-নায়িকাদেরই ব্যবহার করা হচ্ছে। যেটা আগে কখনো কল্পনাও করা যায়নি। এখন দর্শক টানতে নায়ক-নায়িকাসহ অন্যান্য কলাকুশলীরা স্কুলে-স্কুলে যাচ্ছেন। 'বীরকন্যা প্রীতিলতা', 'অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন' প্রভৃতি সিনেমা প্রচারে তারকারা দলবেঁধে বেড়িয়েছেন নগরীর বহু স্কুলে-স্কুলে বা কলেজে কোমলমতি শিশুদের তাদের সিনেমা সম্পর্কে জানাতে। কিন্তু এভাবে স্কুলে-স্কুলে গিয়ে সব ধরনের সিনেমার জন্যই প্রচারণা চালানো সম্ভব? মারদাঙ্গা, ভায়োলেন্স প্রভৃতি বাণিজ্যিক সিনেমার প্রচার তো স্কুলে-স্কুলে গিয়ে কোমলমতি শিশুদের মধ্যে সম্ভব নয়। সে জন্যই বর্তমান সময়ের বিশিষ্ট নির্মাতা গাজী রাকায়েত হোসেন বলেন, 'এভাবে তারকারা প্রচারে গেলে দর্শক হবে এটাও আমি মনে করি না। দর্শক তারকা দেখার জন্য প্রেক্ষাগৃহে যায় না। আমাদের দর্শকই তো তৈরি হয়নি। দর্শককে বরং আমরা তাড়িয়ে দিয়েছি। সেই দর্শককে ফেরাতে হলে আগে নিজস্ব গড়মানের সিনেমা তৈরি করতে হবে।' সিনেমার প্রচার নিয়ে বলা যায়, এখন সিনেমা সংশ্লিষ্ট সবার মাঝেই একধরনের খরার মতোই হাহাকার চলছে। কারণ সম্প্রতি সিনেমা ভালো হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলেও, আকর্ষণীয় হলেও দর্শক নেই। সবার মাথাতেই এখন একটা কথাই শুধু ঘোরে, কীভাবে দর্শক পাওয়া যাবে। সেজন্যই তরুণ নির্মাতা মীর সাব্বির বলেন, 'শুধু প্রপার সিনেমা বানালেই হবে না, এটা সঠিকভাবে মানুষকে জানাতেও হবে। তাদের আকৃষ্ট করতে হবে। এখন তো আগের মতো আর মাইকিং করে সিনেমা প্রচার করা হয় না। এখন ফেসবুকটাই মাইক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।' তার মানে বাংলা সিনেমা প্রচারে একসময় যেসব মাধ্যমগুলো অত্যন্ত কার্যকর ও সুলভ ছিল সেগুলোই এখন দখল করে নিয়েছে ফেসবুকসহ নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কিন্তু এগুলো দর্শক টানতে কতটা কার্যকর হতে পারছে? এই প্রশ্ন রেখে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলম খসরুও যায়যায়দিনকে বলেন, 'আগে একটা সিনেমা রিলিজ হলে সেটা নিয়ে মাসের পর মাস প্রচার হতো। তখন ব্যানার, মাইকের ব্যবহার ছিল, রেডিওর ব্যবহার ছিল, দৈনিক পত্রিকায় একসঙ্গে অনেক সিনেমার বিজ্ঞাপনের প্রচলন ছিল। কথায় আছে প্রচারেই প্রসার। এখন সেগুলোতে প্রচার না থাকাতে সিনেমার প্রসারও আগের মতো হচ্ছে না। এখন আমরা পাইছি এক ফেসবুক এইটার ওপরই নির্ভর হয়ে পড়েছি। ফেসবুক কারা চালায়, এটা নির্দিষ্ট একটা কমিউনিটি চালায়। এটা ব্যবহার করে কেউ কেউ কিছু দর্শক টানতে পারলেও আলটিমেটলি এটা সার্বিক সিনেমার জন্য কার্যকর নয়। আগে যেমন প্রচার হতো সেটা এখনো আমরা করতে পারি। কিন্তু খরচে কুলাতে পারি না বলে সেটা করতে পারছি না।'
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে