বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯
walton1

সাক্ষ্যই কাল হলো শেখ মোহনের

যাযাদি রিপোর্ট
  ০১ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
'সাক্ষী হওয়ার কারণেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেলাম। আমি সাক্ষী হতে চাইনি। কিন্তু আমার সামনে অপহরণের ঘটনাটি ঘটায় পুলিশের অনুরোধে সাক্ষী হই। সাক্ষী হওয়ায়ই আমার আর পরিবারের জন্য কাল হলো। আসামিপক্ষের লোকজন আমাকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে। মাথায় ১৮টি সেলাই লেগেছে। দুই পা ও ডান হাত ভেঙে দিয়েছে। ডান পা কেটে ফেলতে হচ্ছে। আমি সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যাচ্ছি। টানা ১৫ দিন ধরে বিছানায় শুয়ে আছি। উঠতে পারি না। এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো ছিল।'- এই বলেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন একটি অপহরণ মামলার সাক্ষী ৬০ বছর বয়সি মোজাম্মেল শেখ মোহন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন মোহন নামের এক ব্যক্তি। তার সারা শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল। এ সময় চিকিৎসকরা ঘটনাটি পুলিশ কেস হিসেবে লিপিবদ্ধ করে তাকে চিকিৎসা দেন। ঢামেক হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া জানান, আহত মোহনের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ি থানাধীন যশলং ইউনিয়নে। তিনি টঙ্গীবাড়ি থানায় নারী ও নির্যাতন আইনে দায়েরকৃত একটি মামলার সাক্ষী। সাক্ষী হওয়ায় আসামিপক্ষের লোকজন তার ওপর হামলা করে মারাত্মকভাবে জখম করে। মোহন যশলং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ১ নং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক। তার পিতার নাম মৃত মুনসুর আলী শেখ। কয়েক দিন চিকিৎসা নেওয়ার পর মোহন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে চলে যান। কোথায় চলে যান তা জানা যায়নি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোহন প্রাণ ভয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে গোপনে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কথা হয় মোহনের সঙ্গে। তিনি বলেন, তার পাশের বাড়ির এক মেয়েকে অপহরণ করার সূত্র ধরেই তার ওপর হামলাটি হয়। চলতি বছরের জুলাইয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ি থানাধীন যশলং এলাকার ওই মেয়েকে রবীন নামের এক ছেলে অপহরণ করে নিয়ে যায়। রবীন বর্তমানে কারাগারে। ঘটনাটি কাকতালীয়ভাবে আমার সামনেই ঘটে। স্বাভাবিক কারণেই অন্যের মতো আমিও ঘটনাটি দেখি। পরবর্তীতে এ ব্যাপারে মেয়েপক্ষ টঙ্গীবাড়ি থানায় মামলা দায়ের করেন। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। অনেকেই দেখলেও ঝামেলা এড়াতে তারা সাক্ষী হননি। আমি যেহেতু বয়স্ক মানুষ, নামাজ পড়ি, মরার চিন্তা করি। পুলিশও আমাকে মামলার সাক্ষী হতে অনুরোধ করে। পুলিশ সদস্যরা বলেন, মুরুব্বি আপনি তো আর মিথ্যা বলবেন না। যা ঘটেছে তাই বলবেন। তাতে বিচার স্বচ্ছ হবে। অপরাধী সাজা পাবে। পরকালের কথা চিন্তা করে আমি আলস্নাহর নামে সাক্ষী হই। এটিই আমার জীবনের বড় ভুল। তিনি আরও বলেন, 'গত ৪ অক্টোবর বিকাল আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে আমাকে গ্রামের নির্জন জায়গায় একা পেয়ে আসামিপক্ষের লোকজন আমার ওপর দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা করে। আমার মাথায় মারাত্মকভাবে কোপ দেয়। দুই পা, ডান হাত ভেঙে দেয়। সারা শরীরে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে জখম করে। আমাকে তারা হত্যার চেষ্টা করে। আমার চিৎকারে গ্রামবাসী এগিয়ে আসে। এ সময় হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। এলাকাবাসী প্রথমে আমাকে টঙ্গীবাড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেস্নক্সে নিয়ে যায়। সেখান থেকে ঢাকায় পাঠায়।' এরপরই তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, 'আমি ডায়াবেটিসের রোগী। আমার ডান পায়ে ইনফেকশন হয়েছে। ইতোমধ্যেই একাধিকবার অপারেশন হয়েছে। ডাক্তাররা আমার ডান পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলতে হবে জানিয়েছেন। এরপর থেকে আমার আর ঘুম নেই। একটি সত্য সাক্ষী দেওয়ার আগেই আমি সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেলাম। ঘটনার পর থেকে গত ১৯ অক্টোবর বিকাল পর্যন্ত আমি বিছানা থেকে উঠতে পারিনি। আর কোনোদিনই হয়তো নিজের পায়ে ভর দিয়ে চলাফেরা করতে পারব না। শুনেছি সাক্ষীদের সুরক্ষার বিষয়ে সরকারের নানা পদক্ষেপ আছে। তাহলে আমার কী হবে। আমি এখন পরিবারের বোঝা হয়ে গেছি। আমার এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো ছিল।' এদিকে, হামলার ঘটনায় মোজাম্মেল শেখ মোহনের স্ত্রী বাদী হয়ে একই এলাকার রমজান (৩৫), হিরন (৪০), ইমন (২২), মানিক (৩৩), আকতার (৫৫), ওয়াসিম (৩৮), জলিল (৪৫), রাকিব (৩৫), রোজিনা (৩৬) ও রশিদের (৫৮) বিরুদ্ধে টঙ্গীবাড়ি থানায় মামলা দায়ের করেন। টঙ্গীবাড়ী থানার ওসি মো. রাজিব খান যায়যায়দিনকে বলেন, আসামিরা সবাই উচ্চ আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন। সাক্ষী সংক্রান্ত নানা বিষয়াদি সম্পর্কে পুলিশ বু্যরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক বনজ কুমার মজুমদার বলেন, সাক্ষীদের যাতায়াত খরচ, সময়ের মূল্যায়ন করা, নিরাপত্তাজনিত নানা ইসু্য নিয়ে সরকারের সঙ্গে কথাবার্তা চলছে। বর্তমানে মামলায় সাক্ষীর সংখ্যা কম করার চেষ্টা চলছে। উপযুক্ত প্রমাণাদির ভিত্তিতে আদালতে মামলার চার্জশিট দাখিলের চেষ্টা চলছে। কারণ সাক্ষী নিয়ে প্রায়ই নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। যার মধ্যে সাক্ষীকে হত্যা, সাক্ষীর ওপর হামলা ও নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো বা হয়রানি উলেস্নখযোগ্য।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে