রোববার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১৪ মাঘ ১৪২৯

স্মৃতিভ্রম :চিকিৎসায় 'ঐতিহাসিক' আবিষ্কার

বছরে আক্রান্ত হয় এক কোটি মানুষ হ আবিষ্কৃত 'লিকেনেম্যাব' প্রাথমিক অবস্থায় কাজ করে
যাযাদি ডেস্ক
  ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০
পৃথিবীতে মৃতু্যঘাতী রোগের মধ্যে প্রথম সারির রোগ আলঝেইমার্স বা ডিমেনশিয়া প্রতিরোধের ওষুধের সন্ধান পেয়েছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। যদিও 'লিকেনেম্যাব' নামের ওষুধটির প্রভাব এখনো কম। মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এটি কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তাও এখনো পরিষ্কার নয়। তবুও এ রোগের ওষুধ আবিষ্কারের ঘটনাকে 'চিকিৎসায় যুগান্তকারী অগ্রগতি' এবং 'ঐতিহাসিক' অ্যাখ্যা দিয়েছেন গবেষকরা। খবর বিবিসির। বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, কয়েক দশকের ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর অবশেষে আবিষ্কৃত এ ওষুধটি আলঝেইমার্স রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে কাজ করে। আলঝেইমার্স আক্রান্ত ব্যক্তির মস্তিষ্কে বেটা অ্যামিলয়েড নামে যে আঁঠালো পদার্থ তৈরি হয়, সেটিকে আক্রমণ করে 'লিকেনেম্যাব'। অ্যামিলয়েড হচ্ছে এমন একটি প্রোটিন, যা মস্তিষ্কের নিউরনের মাঝে জমা হতে থাকে। এর ফলে মস্তিষ্কের কোষগুলো ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। এ ধরনের অ্যামিলয়েডের জন্ম নেওয়া আলঝেইমার্স রোগের অন্যতম উপসর্গ। স্মৃতিভ্রম বা আলঝেইমার্স আক্রান্ত মানুষের স্মৃতি, বিচার, বুদ্ধি, জ্ঞান, বিবেচনা, যুক্তি, হিসাব করার ক্ষমতা লোপ পায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা দশকের পর দশক ধরে এ রোগের ওষুধ আবিষ্কারে সময় ব্যয় করেছেন। বিবিসি এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলছে, লিকেনেম্যাব নামের ওষুধটি এই রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে কাজ করে। ফলে আলঝেইমার্সে আক্রান্ত অনেক রোগী হয়তো এর সুফল পাবেন না। মানুষের শরীরে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করলে সেটি দূর করতে শরীরের ভেতরে যে ধরনের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, লিকেনেম্যাব হচ্ছে সেরকম একটি অ্যান্টিবডি। কিন্তু এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে; যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে মস্তিষ্ক থেকে অ্যামিলয়েড দূর করে ফেলতে সহায়তা করবে। তবে ওষুধটি আলঝেইমার্স রোগ পুরোপুরি সারিয়ে তুলতে পারে না। কিন্তু মস্তিষ্কের ক্ষতি হওয়ার হার চার ভাগের এক ভাগ কমিয়ে ফেলতে পারে। আলঝেইমার্স রোগের চিকিৎসায় ওষুধ আবিষ্কার করতে গিয়ে যে হতাশা তৈরি হয়েছিল, সেখানে এই ওষুধের পরীক্ষার ফলাফলকে অনেকে বিশাল 'জয়' হিসেবে দেখছেন। যুক্তরাজ্যের গবেষণা সংস্থা আলঝেইমার্স রিসার্চ বলেছে, গবেষণার এই ফলাফল 'গুরুত্বপূর্ণ'। আলঝেইমার্স রোগের চিকিৎসার উপায় খুঁজতে গিয়ে ৩০ বছর আগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা প্রথমে অ্যামিলয়েড লক্ষ্য করে গবেষণা করবেন বলে ঠিক করেছিলেন। ওই গবেষকদের একজন অধ্যাপক জন হার্ডি। আলঝেইমার্সের নতুন এই ওষুধের আবিষ্কারের পর তিনি এটিকে 'ঐতিহাসিক' আখ্যা দিয়েছেন। এর ফলে আলঝেইমার্স রোগের চিকিৎসার নতুন নতুন উপায় বেরিয়ে আসতে শুরু করবে বলেও আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারা স্পিয়ার-জোনস বলছেন, নতুন এই গবেষণার ফলাফল অনেক বড় একটি সাফল্য। কারণ বহুদিন ধরেই এই গবেষণায় ব্যর্থতার হার ছিল শতভাগ। সুনির্দিষ্ট কোনো ওষুধ না থাকায় বর্তমানে আলঝেইমার্স আক্রান্ত রোগীদের উপসর্গ সামলানোর মতো কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। কিন্তু এসব ওষুধ রোগটি ঠেকাতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। নতুন এই ওষুধের সাফল্য প্রাথমিক পর্যায়ে আলঝেইমার্স শনাক্ত রোগীদের চিকিৎসায় কাজে আসবে বলে আশার আলো দেখা দিয়েছে। গত বছরের জুনের দিকে আলঝেইমার্সের চিকিৎসায় অ্যাডুকেনুম্যাব নামের একটি ওষুধের অনুমোদন দেয় যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ)। সে সময় গত দুই দশকের মধ্যে এই রোগের প্রথম ওষুধ হিসেবে অ্যাডুকেনুম্যাবের অনুমোদন দেওয়া হয় বলে জানায় দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রে আলঝেইমার্সের ওষুধের এই অনুমোদন নিয়ে উচ্চাশা থাকলেও বিতর্ক পিছু ছাড়েনি। কারণ ২০২০ সালের নভেম্বরে দেশটির একটি স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ প্যানেল অ্যাডুকেনুম্যাবের উপকারিতার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পায়নি বলে এফডিএকে জানিয়েছিল। এদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডবিস্নওএইচও) হিসাব মতে, পৃথিবীজুড়ে সাড়ে চার কোটি সত্তর লাখ মানুষ স্মৃতি ভুলে যাওয়ার রোগে ভুগছেন। সংস্থাটি আরও জানায়, পৃথিবীতে মৃতু্যঘাতী রোগের মধ্যে প্রথম সারিতেই রয়েছে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রম। প্রতি বছর নতুন করে এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন এক কোটি মানুষ। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হতে পারে সাড়ে সাত কোটি এবং ২০৫০ সালে তা বেড়ে হতে পারে ১৪ কোটিরও বেশি। ডবিস্নওএইচও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু ডিমেনশিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত কারণে বছরে বিভিন্ন দেশের সম্মিলিত অর্থ ব্যয় হয় ৮১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা! সাধারণভাবে ৬০ বছরের বেশি বয়সের লোক এই রোগে আক্রান্ত হন বেশি। প্রতি ১০০ জন ষাটোর্ধ্বের মধ্যে পাঁচ থেকে আটজন ভোগেন এই সমস্যায়। নতুন ওষুধ আবিষ্কার হওয়ায় এখন কিছুটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছে সংস্থাটি।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে