logo
শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৯ ফাল্গুন ১৪২৬

  যাযাদি ডেস্ক   ১৯ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

স্থবির সরকারি প্রাথমিকের বায়োমেট্রিক হাজিরা!

স্থবির সরকারি প্রাথমিকের বায়োমেট্রিক হাজিরা!
বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন
ব্যাপক অনিয়ম ও সমন্বয়হীনতার কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন চালুর প্রকল্প। অভিযোগ উঠেছে, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে নিম্নমানের এ মেশিন কেনার 'নির্দেশনা' দেয়া হয়। 'নির্দেশনা' পেয়ে যেসব বিদ্যালয় মেশিন কিনেছে, তাদের অধিকাংশই এখন অকেজো হয়ে পড়েছে।

প্রতিটি মেশিন কেনা-বাবদ ১৩ থেকে ১৮ হাজার টাকার অবৈধ 'বাণিজ্য' হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পটি থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকা। অসাধু এ চক্রের নেতৃত্বে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের এক উপপরিচালকসহ অনেকে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

অনৈতিক 'বাণিজ্যের' বিষয়টি জানাজানি হলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আর কোনো ডিজিটাল হাজিরা মেশিন না কিনতে নতুন করে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সে কারণে যেসব বিদ্যালয় আগেই কিনেছে, সেখানেও বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন ব্যবহার হচ্ছে না।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত বছর সারাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের জন্য বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন ক্রয়ের নির্দেশনা দেয় সরকার। সে অনুযায়ী, গত বছরের ২৮ এপ্রিল প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে সব জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের (ডিপিইও) চিঠি দেওয়া হয়। প্রথম ধাপে গত বছরের ২৬ জুন স্পেসিফিকেশন নির্ধারণ করে সারাদেশে নির্দেশনা পাঠানো হয়। ১৩ অক্টোবর আবারও নতুন করে স্পেসিফিকেশন দেওয়া হয়।

চিঠিতে চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি-৪) স্স্নিস্নপ ফান্ড থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীদের বায়োমেট্রিক হাজিরা নিশ্চিত করতে ডিভাইস (ডিজিটাল হাজিরা মেশিন) কিনতে বলা হয়। এ ফান্ড থেকে প্রতি বছর স্কুলগুলোকে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে।

সূত্র জানায়, দুই দফায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে 'স্পেসিফিকেশন' (সবিস্তার বর্ণনা) নির্ধারণ করে এ মেশিন কিনতে স্কুল কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে প্রথম ধাপে নিম্নমানের স্পেসিফিকেশন ধরে যারা এ মেশিন কিনে ফেলে, তাদের অধিকাংশেরই এ মেশিন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সেজন্য নতুন করে ফের স্পেসিফিকেশন দেয়া হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাজারদর অনুযায়ী স্পেসিফিকেশন অনুসরণ করে কেনার নির্দেশ উপেক্ষা করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একটি অসাধু চক্র অতিরিক্ত দামে ওই মেশিন কিনতে তৎপর হয়। এ চক্রই নিম্নমানের মেশিন কিনতে বাধ্য করে অনেক বিদ্যালয়কে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব আকরাম আল হোসেন বলেন, 'কোনো প্রতিষ্ঠানে বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন অকেজো হয়েছে কি-না, আমার জানা নেই। মেশিন কেনার জন্য আমরা শুধু স্পেসিফিকেশন নির্ধারণ করে দিয়েছি। কোনো কোম্পানি নির্ধারণ করা হয়নি। যদি কেউ আমার নাম ভাঙিয়ে থাকেন, তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।'

তিনি এ সময় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক সোহেল আহমেদকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে মৌখিক নির্দেশ দেন।

জানা যায়, দেশে ৬৫ হাজার ৫৯৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। ইতোমধ্যে অতিরিক্ত দামে প্রায় ২০ হাজার বিদ্যালয়ে এ মেশিন কেনা হয়েছে। স্পেসিফিকেশন অনুসারে বাজারে এসব মেশিনের দাম কোম্পানিভেদে ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। কিন্তু সেই 'নির্দিষ্ট' কোম্পানিটি নিচ্ছে ২৫ হাজার থেকে ৩৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। সে হিসাবে প্রতিটি মেশিন কেনা-বাবদ ১৩ থেকে ১৮ হাজার টাকার 'বাণিজ্য' হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অর্থাৎ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকা। এ চক্রের নেতৃত্বে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের এক উপপরিচালকসহ অনেকে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, স্পেসিফিকেশন অনুমোদন করে সংশ্লিষ্ট স্কুল কর্তৃপক্ষকে বাজার থেকে যাচাই-বাছাই করে ওই মেশিন কেনার নির্দেশ দেয় মন্ত্রণালয়। মেশিন কেনা নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠায় পরবর্তীতে ২৩ ডিসেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন না কিনতে মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা জারি হয়। এরপর থেকে বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন কেনা বন্ধ রয়েছে। যেসব বিদ্যালয়ে এ মেশিন কেনা হয়েছিল সেগুলোও অকেজো করে রাখা হয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, নিম্নমানের মেশিনগুলো নিয়ে সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব আকরাম আল হোসেনের কাছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও শিক্ষক অভিযোগ করেন। অভিযোগে বলা হয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ঢাকার বিভাগীয় এক উপপরিচালক মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে একটি কোম্পানির কাছ থেকে বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন কিনতে মৌখিক নির্দেশ দেন।

একাধিক কর্মকর্তা-শিক্ষকের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আকরাম আল হোসেন গত ১৮ অক্টোবর দুপুরে নিজের ফেসবুকে এক পোস্ট দিয়ে জানান, 'বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন কেনার জন্য কোনো বিশেষ কোম্পানিকে সিলেক্ট করা হয়নি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় শুধু স্পেসিফিকেশন অনুমোদন করেছে।'

ঢাকা বিভাগে মোট ১০ হাজার ৮৯০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ-খবর নিয়ে জানা যায়, ঢাকা বিভাগের মধ্যে ডেমরা, সূত্রাপুর, সাভার, মোহাম্মদপুরের প্রায় ২৫০টি বিদ্যালয়ে ডিজিটাল হাজিরা মেশিন কেনা হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ মেশিনই অকেজো হয়ে পড়েছে। কয়েকটি মেশিন সচল থাকলেও তা ব্যবহার করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

জানতে চাইলে ঢাকা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আলেয়া ফেরদৌসী শিখা বলেন, 'ঢাকা বিভাগের কয়েকটি জেলায় এ মেশিন কিনলেও অধিকাংশ বিদ্যালয়ে তা ব্যবহার হচ্ছে না। এটি ব্যবহারে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান সফটওয়্যার সরবরাহ না করায় এ সমস্যা দেখা দিয়েছে।'

তিনি আরও বলেন, সরকার মহৎ উদ্যোগ থেকে নতুন সিদ্ধান্ত নিলেও বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অনেকে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেন। এ কারণে ওই উদ্যোগের সুফল পাওয়া যায় না। গত ২৩ ডিসেম্বর এ মেশিন ক্রয় না করতে নির্দেশ দেয়ায় বর্তমানে নতুন করে আর কোনো বিদ্যালয়ে কেনা হচ্ছে না। যেসব বিদ্যালয়ে মেশিন কেনা হয়েছিল সেগুলোও আর ব্যবহার হচ্ছে না।

তবে মেশিন কেনা সংক্রান্ত বিষয়ে তার কোনো হস্তক্ষেপ নেই বলেও জানান তিনি।

স্কুল কমিটিকে দেখেশুনে বাজার যাচাই করে মেশিন কিনতে নির্দেশনা দেয়া হলেও দেশের অধিকাংশ স্কুলে এ মেশিন কিনে দিয়েছেন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার (এটিইও), উপজেলা শিক্ষা অফিসার (টিইও) বা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসাররা (ডিপিইও)। কোথাও আবার জেলা প্রশাসক নিজে এ মেশিন কিনে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। ফলে অনেকে বাধ্য হয়েই দ্বিগুণেরও বেশি দামে ওই মেশিন কিনেছেন। তবে কেউই নাম প্রকাশ করে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জানতে চাইলে নেত্রকোনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ডিপিইও) মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, তার জেলায় ৯০০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৭০০টিতে ডিজিটাল হাজিরা মেশিন কেনা হয়েছে। অধিকাংশ মেশিন কেনা হয়েছে গত দুই মাসে। ২০০ প্রতিষ্ঠানের কেনা বাকি রয়েছে। প্রথম ধাপে যেসব মেশিন কেনা হয়েছিল তার অধিকাংশ নষ্ট হয়ে পড়েছে। বর্তমানে সেগুলো মেরামতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে যেসব মেশিন ব্যবহার হচ্ছে তার রিপোর্ট ডিপিইও অফিসে আসছে না বলেও জানান তিনি। এ কর্মকর্তার দাবি, এসব মেশিন ক্রয়-সংক্রান্ত বিষয়ে তার হস্তক্ষেপ ছিল না। তিনি এ জেলায় নতুন যোগ দিয়েছেন। তবে এসব মেশিন ক্রয় নিয়ে নানা অভিযোগ শোনা যায় বলে স্বীকার করেন তিনি। মন্ত্রণালয় থেকে নতুন নির্দেশনা দেওয়ায় মেশিন কেনা বন্ধ রাখা হয়েছে বলেও জানান জাহাঙ্গীর আলম।

তবে কোথাও অনিয়মের অভিযোগ পেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব আকরাম আল হোসেন। তিনি বলেন, 'ডিজিটাল হাজিরা মেশিন ক্রয়-সংক্রান্ত বিষয়ে কোথায় অনিয়ম হয়েছে তার তথ্য দেন, আমরা ব্যবস্থা নেব। নির্দিষ্ট করে না বললে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। কোথাও কোনো অনিয়ম হয়েছে কি-না, তা খতিয়ে দেখা হবে।' জাগো নিউজ
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে