শ্রীলংকা পরিস্থিতি

রাজনীতিবিদরা কি এবার দেশকে বাঁচাতে পারবেন?

এ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন যে, যদি প্রেসিডেন্টও পদত্যাগ করেন তবে পরিস্থিতি আরও বিশৃঙ্খল হতে পারে; সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সংসদের স্পিকার তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার বিধান থাকলেও।
রাজনীতিবিদরা কি এবার দেশকে বাঁচাতে পারবেন?

সোমবার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসের সমর্থকদের দ্বারা গলে বিক্ষোভকারীদের উপর হামলার আগে, দেশব্যাপী সমর্থন ভিত্তির দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ সম্পর্কে কেউ ধারণা পেতে পারেনি। এখন দেশ তা জানে, রাজাপাকসেকে ধন্যবাদ। সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সমর্থকদের দ্বারা এ প্রতিবাদের স্থানে আক্রমণ করা হয়েছে, এই কথাটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাখ লাখ মানুষ সারাদেশে রাস্তায় নেমে আসে। হামলার প্রতিবাদে তারা তাৎক্ষণিকভাবে নিজ নিজ এলাকায় বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করে, আক্রমণকারীরা বিভিন্ন জায়গায়, প্রধানত কলম্বোতে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে। এ জন্য তারা বিভিন্ন স্থানে যানবাহন চেক করে।

পরে তাদের কেউ কেউ সরকারি দলের রাজনীতিবিদদের বাড়ি ও গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিতে শুরু করে। সারাদেশ এই গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে, পুলিশকে দেখা যাচ্ছে যে, তারা আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। সরকার বিরোধী বিক্ষোভকারীরা আক্ষরিক অর্থেই আইন হাতে তুলে নেয়। সব দলের রাজনীতিবিদরা লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেছেন। এদিক ওদিক থেকে লুটপাটের খবরও পাওয়া গেছে। মাহিন্দা রাজাপাকসে যাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধের সমাপ্তির পরে রাজাদুতুগেমুনুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল তাকে ত্রিনকোমালিতে নৌবাহিনীর শিবিরে লুকিয়ে থাকার আগে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যেতে হয়েছিল।

দ্বীপব্যাপী কারফিউ প্রথমে পুলিশ এবং তারপরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দ্বারা জননিরাপত্তা অধ্যাদেশের অধীনে জারি হলেও জনতা তা অমান্য করে রাজনীতিবিদদের সম্পত্তিতে আগুন দেয়।

\হপ্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের পদত্যাগের দাবিতে এক মাস ধরে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভকারীদের ওপর আক্রমণের এই প্রতিক্রিয়াটি স্বতঃস্ফূর্ত ছিল এবং এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে, এটি একটি সংগঠিত কাজ ছিল, যেমনটি প্রতিরক্ষা সচিব কমল গুনারত্ন তার প্রেস ব্রিফিং-এ বলেছেন। বুধবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সময় প্রেসিডেন্ট সরাসরি তাকে অভিযুক্ত করেছেন।

সরকারি দলের রাজনীতিবিদদের বাড়িতে হামলা যদি একটি সুসংগঠিত কাজ হয়ে থাকে, তবে এটা করছিল হামলাকরীরা, আর এর ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি করল- যা সরকারকে পদক্ষেপ নিতে প্ররোচিত করবে। যাই হোক, এখানে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন, টেম্পল ট্রিস থেকে একদল গুন্ডাকে পাঠিয়ে বা অনুমতি দিয়ে ভিড়ের মধ্যে ঢুকতে দিয়েছিল যারা মন্দিরের গাছের সামনে এবং গল ফেসে প্রেসিডেন্টের সচিবালয়ের সামনে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালাচ্ছে, এমনকি প্রেসিডেন্ট বুধবার তার বক্তৃতায় স্বীকার করেছেন যে, সরকার সমর্থকরাই সহিংস পরিবেশের সূত্রপাত করেছে।

প্রতিরক্ষা সচিব প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় বলেছিলেন যে, টেম্পল ট্রিস প্রাঙ্গণে জড়ো হওয়া সরকার সমর্থকদের গল ফেসে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়ার জন্য কোনো পূর্বের গোয়েন্দা প্রতিবেদন ছিল না। কেউ এটা মেনে নিলেও, টেম্পল ট্রিস থেকে প্রেসিডেন্সিয়াল সেক্রেটারিয়েট পর্যন্ত এক কিলোমিটারের মধ্যে টিয়ারগ্যাস ও জলকামানে সজ্জিত পুলিশ কেন তাদের থামাতে ব্যর্থ হয়েছে তা তিনি বুঝতে পারছেন না, এটা একটা ধাঁধার মতো।

অনেক সরকার বিরোধী ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবেই সরকারি রাজনীতিবিদদের ম্যানশনগুলো আগুনে পুড়ে যাওয়া দেখে অন্তত কিছুটা রোমাঞ্চ অনুভব করতেন; বিশেষ করে যারা রাজনীতিবিদদের অন্তর্গত, যারা গত কয়েক মাসে জনগণের ভোগান্তির ফল হিসেবে এই আন্দোলন ন্যায্য বলে রায় দিয়েছেন। যাই হোক, অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো যদি লুটপাট বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রূপান্তরিত হয়, যেমন কিছু উপাদান তৈরি করার চেষ্টা করেছিল বলে জানা গেছে, সে ক্ষেত্রে কেউ আজ দেশের পরিস্থিতি কল্পনা করতে পারে না।

সরকার বা অন্তত প্রধানমন্ত্রী করুণাপূর্ণভাবে ভুলভাবে জনগণের ক্ষোভের পরিমাপ করেছেন যে, সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ জমা হচ্ছে তাদের মনে, তাদের যে অর্থনৈতিক অসুবিধার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, খুব স্পষ্টভাবে সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণে। তিনি মনে করেন, প্রতিবাদকারীরা আত্মসমর্পণ করবে এবং তাদের ওপর আক্রমণের সঙ্গে গল ফেস গ্রিন ছেড়ে চলে যাবে, যার ফলে সারাদেশে সরকার বিরোধী আন্দোলনকারীরাও বশ্যতা স্বীকার করবে।

২০০৫ এবং ২০১৪ সালের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার মেয়াদকালে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে এটিই হয়েছিল। কাতুনায়েকে, চিলাউ এবং রথুপাসওয়ালার ঘটনা যেখানে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর হাতে মানুষ নিহত হয়েছিল। সে ঘটনায় কেস হয়েছিল। কিন্তু এবার ছিল ভয়ানক ভুল হিসাব-নিকাশ। এমনকি গল ফেস বা 'গোটাগোগামা' নামের প্রতিবাদকারীদের আন্দোলন, সোমবারের মারপিটের আগে সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভের মাত্রা কত বেশি তারা জানতেন না।

৫০ বছর ধরে যা শান্তিপূর্ণভাবে চলছিল সেগুলো কয়েকদিনের মধ্যে অশান্ত হয়ে উঠেছে, যেমনটা লেনিন বলেছিলেন। ৩১ মার্চ মিরিহানায় প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত বাসভবনের সামনে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পরে, প্রেসিডেন্টকে তার মন্ত্রিসভাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল এবং বিরোধীদের মন্ত্রিসভায় যোগদানের আহ্বান জানাতে হয়েছিল। বিরোধীরা তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করায় পরবর্তী সময়ে তাকে অপেক্ষাকৃত তরুণ সদস্যদের নিয়ে একটি ছোট মন্ত্রিসভা নিয়োগ করতে হয়েছিল। অজিথ নিভার্ড ক্যাবরালকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল এবং প্রেসিডেন্টকে ডক্টর নন্দলাল বীরাসিংহেকে তার অবসরকালীন জীবনের অবসান ঘটিয়ে এই কাজে নিযুক্তির জন্য আমন্ত্রণ জানাতে হয়েছিল।

প্রেসিডেন্টকে তার ভাই মাহিন্দা রাজাপাকসেকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে সর্বদলীয় অন্তর্বর্তী সরকার নিয়োগ করতে সম্মত হতে হয়েছিল। সংবিধানের ২০তম সংশোধনীর মাধ্যমে তাকে প্রদত্ত ক্ষমতাগুলোও তাকে বাদ দিতে সম্মত হতে হয়েছিল- যা তার কাছে খুবই প্রিয় ছিল। তাকে একসময় অনেকে প্রতিরক্ষা বিষয়ক একজন নির্মম এবং কঠোর প্রশাসক হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন, সোমবার যখন জনগণ অনেক এলাকায় আইন তাদের হাতে তুলেছিল তখন তাকে একজন নিষ্ক্রিয় দর্শক হিসেবে দেখা যাচ্ছিল।

অন্যদিকে, বিরোধীদলীয় নেতা সাজিথ প্রেমাদাসা যিনি জোর দিয়েছিলেন যে প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ না করা পর্যন্ত এবং সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন না পাওয়া পর্যন্ত তিনি অন্তর্বতীকালীন সরকারের ধারণাটি গ্রহণ করবেন না, তিনি এখন সোমবারের ঘটনার পর দ্বিতীয় শর্তটি বাদ দিতে রাজি হয়েছেন। জনতা বিমুক্তি পেরামুনা একই কারণ দেখিয়ে অন্তর্বতী সরকারে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল, দ্বিতীয় শর্তটি তারাও একই কারণে বাদ দিয়েছে। তবে, তারা এখন অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সমর্থনের আশ্বাস চায়।

মঙ্গলবার বিরোধীদলীয় নেতা সাজিথ প্রেমাদাসার কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. বীরাসিংহে যে রিপোর্ট দিয়েছিলেন যে, দেশটির কাছে এক সপ্তাহের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আমদানির জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা রয়েছে। তিনি এও জানান যে, যদি প্রেসিডেন্টসহ জনপ্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রী এবং একটি মন্ত্রিসভার মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হন এবং যা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে সহায়তা পাওয়ার জন্য উপযুক্ত বিবেচিত না হয় তা হলে তিনি পদত্যাগ করবেন। ড. বীরাসিংহে বুধবারও একটি মিডিয়া ব্রিফিংয়ের সময় এই বিষয়গুলো পুর্নব্যক্ত করেছিলেন।

পরিস্থিতির কারণে প্রেসিডেন্টের প্রতি পদত্যাগের আহ্বান ক্রমশ ন্যায়সঙ্গত মনে হচ্ছিল। তিনি দ্রম্নতই তার ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার হারাচ্ছেন- যা সোমবারের ঘটনাও প্রমাণ করে। প্রথমত এবং প্রাথমিকভাবে তার সরকার জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। তারপর তিনি নিজেই তার সরকারের পক্ষ থেকে কিছু গুরুতর ভুল স্বীকার করেছেন- যা বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির দিকে নিয়ে গেছে। তিনি তার দলের সদস্যদের নিয়ে গঠিত মন্ত্রিসভাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন এবং অন্যান্য দলগুলোকে দেশের বিষয়গুলো হাতে নিতে অনুরোধ করেন। সবচেয়ে বড় কথা, সারাদেশে আন্দোলনের মূল স্স্নোগান ছিল 'গোটা, বাড়ি যাও'।

এ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন যে, যদি প্রেসিডেন্টও পদত্যাগ করেন তবে পরিস্থিতি আরও বিশৃঙ্খল হতে পারে; সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সংসদের স্পিকার তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার বিধান থাকলেও।

তার সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, অন্তত আইএমএফের বেইল আউট প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর যেমন উলেস্নখ করেছেন, এই মুহূর্তে কাউকে না কাউকে প্রধান পদটি গ্রহণ করতে হবে। তবুও, আবার যে কেউ প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করলে তার প্রধান প্রতিবন্ধকতা হবে তার প্রতি অপর্যাপ্ত সংসদীয় সমর্থন, কারণ হাউসে এখন কোনো দলেরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে বলে মনে হয় না।

অনুবাদ : আহমদ মতিউর রহমান

[এস এম এস আইউব শ্রীলঙ্কার বিশিষ্ট লেখক ও কলামিস্ট। দেশটির টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি সম্প্রতি শ্রীলংকার সংবাদপত্র 'ডেইলি মিরর'-এর অনলাইন এডিশনে ঈধহ :যব ঢ়ড়ষরঃরপরধহং ংধাব :যব পড়ঁহঃৎু :যরং :রসব? শিরোনামে এ কলামটি লেখেন। দেশটির বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব বিবেচনা করে এটির অনুবাদ ছাপা হলো।]

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে