শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
walton1

জনসাধারণের সত্যকে ধারণ করতে হবে

অন্যায় এগিয়ে গেলে ন্যায় আড়ালে থেকে যায়। ফলে অন্যায়কে এগিয়ে দিয়ে সুনাগরিক ও আদর্শ সমাজ বিনির্মাণ অলীক থেকে যাবে চিরকাল। জনতার সক্রিয়তার সৌন্দর্য অসুন্দর-বর্বরতার চিত্র পাল্টে দেয়।
রিয়াজ মাহমুদ
  ০১ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
জ্যামাইকান সংগীতশিল্পী বব মার্লেকে কনসার্টের দু'দিন আগে নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। মার্লের জীবনের ওপর দিয়ে ভয়াবহ ঝড় বয়ে যাচ্ছে। কনসার্ট আয়োজক কমিটি কনসার্ট বাতিল করার কথা ভাবছে। কিন্তু বাদ সাধল মার্লে স্বয়ং। কনসার্ট তিনি করবেনই। মার্লের অনড় অবস্থান কনসার্ট আয়োজক কমিটিকে বাধ্য করল আয়োজন নিশ্চিত করতে। দুর্বল শরীর নিয়ে মঞ্চে উঠলেন মার্লে। আশি হাজারেরও বেশি মানুষের উপচে পড়া ভিড় জমলো মার্লের কনসার্টে। অসুস্থ শরীর নিয়ে একে একে গাইলেন জনপ্রিয় সব গান। কনসার্ট আয়োজক কমিটি বিস্মিত ও হতবাক হলেন। সাংবাদিকরা মার্লের কাছে জানতে চাইলেন- কেন তিনি এই রকম ঝুঁকিপূর্ণ শরীরিক অবস্থায় কনসার্টে গান গাইলেন। জবাবে মার্লে বললেন, ঞযব ঢ়বড়ঢ়ষব, যিড় বিৎব :ৎুরহম :ড় সধশব :যরং ড়িৎষফ ড়িৎংব..... ধৎব হড়ঃ :ধশরহম ধ ফধু ড়ভভ. ঐড়ি পধহৃ! (যারা পৃথিবীকে অশান্ত করে রেখেছে তারা একদিনও ছুটি নিচ্ছে না। আমি কীভাবে ছুটি নিতে পারি।) অর্থাৎ যারা দুষ্টলোক তারা একমুহূর্ত বিরতি নিচ্ছে না। খারাপ লোকরা চাইছে মার্লে যাতে কনসার্ট বাতিল করে। যদি কনসার্ট বাতিল হয়ে যায় তাহলে তারা জিতে যাবে। খারাপ লোককে তো জিততে দেওয়া উচিত নয়। তাই মার্লে দুর্বল শরীর নিয়ে একে একে জনপ্রিয় গানগুলো গাইলেন। দেশে দেশে উপনিবেশ স্থাপনের বিরুদ্ধে, পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আমৃতু্য লড়াই করেছিলেন মার্লে। এক মুহূর্তে লড়াই থামালে খারাপ মানুষের খারাপি বাধা বিপত্তিহীন হবে। তাই মার্লে থামেননি। শেষ পর্যন্ত লড়ে গিয়েছিলেন। সন্ত্রাসীদের প্যারিস হামলার পর মানুষ ভয়ে চুপ করে থাকেননি। সন্ত্রাসীরা থিয়েটারে ঢুকেছিল। কিন্তু থিয়েটার কর্মীরা চুপ করে থাকেননি। তাদের সহযোগিতায় দলে দলে লোকজন রাস্তায় বের হয়েছে। সন্ত্রাসীরা চেয়েছে ভয় দেখিয়ে জনস্রোত আটকিয়ে রাখতে। জনস্রোত তাদের হারিয়ে দিয়েছে। শত-সহস্র মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। দুষ্টলোকের ভয়ে ভালো মানুষরা নিশ্চুপ থাকলে পৃথিবীটা খারাপ লোকের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে। কিন্তু মানুষের ধর্ম তো খারাপকে প্রতিরোধ করা। বাংলাদেশের অবিসংবাদিত চলচিত্র পরিচালক জহির রায়হান নির্মিত 'জীবন থেকে নেওয়া' সিনেমা মুক্তির প্রথম দিনে-ই তার সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে তৎকালীন আইয়ুব সরকার। জনগণ এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। প্রতিবাদ, প্রতিরোধের জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠে চলচ্চিত্র। পরিশেষে স্বৈরাচারী শাসক সিনেমা সম্প্রচারের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। একইভাবে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করার ঘোষণা জনগণ মেনে নেয়নি। শাসকদের পিছু হটতে বাধ্য করেছে। বাঙালির সর্বজনীন উৎসব- পহেলা বৈশাখে বোমা হামলা করেছে। পরের বছর কয়েকগুণ বেশি মানুষ রমনার বটমূলে হাজির হয়েছে। ভয় জয় করেছে। দুষ্টলোকদের পরাজিত করেছে। ভেঙে দিয়েছে অপরাধের দম্ভ। সমাজে দুষ্ট লোকের দৌরাত্ম্য দেখে নিজেকে গুটিয়ে রাখাটা মানব জীবনের ধর্ম নয়। অন্যায়কে মোকাবিলা করে সত্য প্রকাশ করাই মানবজীবনের সার্থকতা। অবক্ষয়ের এ সময়ে দুষ্ট লোকরা জনসাধারণকে বঞ্চিত করছে মৌলিক মানবিক অধিকার থেকে। মানুষ স্ব-ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না। তারুণ্যের বাঁধভাঙা জোয়ার ম্স্নান করে দিচ্ছে- বেকারত্ব। ভেতর থেকে ক্ষয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রকাশ করার ক্ষমতা শূন্য। যার ফলাফল নিজের হাতে নিজেকে হত্যা করা। গত নয় মাসে আত্মহত্যা করেছে চারশত চারজন শিক্ষার্থী। যে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান চর্চা করবে। দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ যারা গড়ে তুলবে তারা ঝরে পড়ছে অকালে। উদগ্র ভোগের মদমত্ততায় ভালো মানুষ হয়ে গড়ে উঠার স্বপ্ন হারিয়ে যাচ্ছে। সবাই চিৎকার করছে আর বলছে এত অন্ধকার আর সহ্য হচ্ছে না। কিন্তু চিৎকার দিলেই কি অন্ধকার কাটবে? অন্ধকার কাটবে আলো জ্বালালে। দেশের সামগ্রিক সংকটটা তৈরি হয়েছে রাজনীতি থেকে। রাজনীতিতে এত এত দুষ্ট লোক প্রবেশ করেছে যে, ভালো মানুষ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। আর চর্তুদিকে ছড়িয়ে দিয়েছে এক অসুস্থ মন্ত্র- আর যাই কর, রাজনীতি করো না। চা'য়ের দোকানে লেখা থাকে রাজনৈতিক আলাপ নিষিদ্ধ। অথচ দোকানে যা কিছু পণ্য বিক্রি হয় তার দামের ঊর্ধ্বমুখিতা ও নিম্নমুখিতার সিদ্ধান্ত আসছে রাজনীতি থেকেই। টেলিভিশনে সম্প্রচারিত কর্মসূচি প্রজন্মকে শিখাবে, না-কি হাতাশ করবে, সে সিদ্ধান্ত আসে রাজনীতি থেকে। রাজনীতি থেকে তরুণ-যুবকদের দূরে রাখতে চালু রেখেছে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে কিছু লোক হাতে অস্ত্র তুলে নেয়। সন্ত্রাসের কালিমা পড়ে অপ্রতিরোধ্য তারুণ্যে। মস্তিষ্ককে গ্রাস করতে থাকে জীবনগ্রাসী দানব। যুক্তি ও বিবেচনা বোধ বধির হয়ে পড়ে। ভালো মনটা চাপা পড়ে অন্ধ আনুগত্যের ধামার নিচে। তারুণ্যের অপমৃতু্য ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে। অভিভাবকদের উদ্বিগ্নতা বাড়ে। রাজনীতির মরণগ্রাসী ছবি দৃশ্যপটে ভাসতে থাকে। মহান ও মহানুভব হওয়ার পথটা গভীর অন্তরালে হারিয়ে যায়। ফলে রাজনীতিতে তরুণ্যের অংশগ্রহণ বাড়ুক অভিভাকরা স্বয়ং সে পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। যা ক্রমে এক প্রতিবাদহীন নির্লিপ্ত জাতিতে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যায়। মানুষের মাঝে লুকিয়ে থাকা পবিত্র মনটা সত্য সন্ধানে নিরন্তন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। দেশ ও দশকে ভালোবেসে মহান কর্তব্য সম্পাদন করার আগ্রহ তরুণ্যের মাঝে সুপ্ত থাকে। কিন্তু তা দমন করার জন্য সংস্কৃতিগত নিপীড়ন অব্যাহত। টেলিভিশন ও সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অচ্ছুত, স্থূল বিষয়ের প্রচারণা ও আলোচনায় সয়লাব। এনজিও তৎপরতা ও ব্যক্তি অবস্থান থেকে কিছু সাহায্য সহযোগিতার জয়ধ্বনি চলতে থাকে। অন্যদিকে, নাগরিকের রাষ্ট্রীয় অধিকার প্রতিষ্ঠায় সঙ্গবদ্ধ হওয়াকে নিরুৎসাহিত করে। নাগরিকের প্রশ্নের শক্তি সমাজকে ভেতর থেকে দেখতে শেখায়। প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা যাতে প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সে জন্য তৎপরতা চালায় সুশীল এনজিওভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। এই সমস্ত প্রতিষ্ঠান সমন্বয় করে বাঁচার স্স্নোগান ছড়িয়ে দিচ্ছে সর্বত্র। সংকটের সমগ্র পরিপ্রেক্ষিতটা জনসাধারণের সামনে উন্মোচন করবে বুদ্বিজীবীরা। নব্য উদারবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তারাও জনসাধারণকে রাজনীতি থেকে বিরত থাকতে উৎসাহ দিচ্ছে। ফলে দুষ্ট লোকের দৌরাত্ম্য রাজনীতিতে অদম্য গতিতে বেড়েছে। সংকট দেখা দিলে সর্বপ্রথমে তার কার্যকারণ বুঝার চেষ্টা এবং সমাধানের পথ অন্বেষণই সুনাগরিকের কর্তব্য। সংকটের যথপোযুক্ত কারণ চিহ্নিতকরণ ও তার সমাধানের চেষ্টা মানবজীবনের বৈশিষ্ট্য। সংকট তৈরি হলে নিজেকে গুটিয়ে ফেলা বা পথ ছেড়ে দেওয়া কাপুরুষচিত আচরণ। রাজনীতিতে সন্ত্রাসের দৌরাত্ম্য যদি জনসাধারণকে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা কমিয়ে দেয় তাহলে তা ইতিহাসের অপলাপ হবে। ইতিহাস তৈরি হয়েছে রাজনীতির পথ ধরে। সত্য ও সুন্দরের সাধনা এবং কুৎসিত অন্ধ আনুগত্য- রাজনীতির অন্যতম দু'টি ধারা অতীত সমাজেও বিদ্যমান ছিল। জনসাধারণ সত্যকে ধারণ করেছে। যার ফলে, জন্ম নিয়েছে '৫২, '৬২ ও '৭১-এর অগ্নিঝরা দিনগুলো। সন্ত্রাসের পথ বর্জিত হয়েছে- আদর্শের পথে শত-সহস্র মানুষের অংশগ্রহণে। কাজেই আজকের দিনে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট রাজনীতি থেকে দূরে সরে গিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেলে দুষ্টদের সক্রিয়তা বাড়বে। কারণ ভালো-মন্দ কখনো হাত ধরাধরি করে চলে না। ন্যায় এগিয়ে গেলে অন্যায় পরাস্থ হয়। অন্যায় এগিয়ে গেলে ন্যায় আড়ালে থেকে যায়। ফলে অন্যায়কে এগিয়ে দিয়ে সুনাগরিক ও আদর্শ সমাজ বিনির্মাণ অলীক থেকে যাবে চিরকাল। জনতার সক্রিয়তার সৌন্দর্য অসুন্দর-বর্বরতার চিত্র পাল্টে দেয়। \হ রিয়াজ মাহমুদ : কবি ও প্রাবন্ধিক
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে