রোববার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১৫ মাঘ ১৪২৯

চার নেতার আত্মত্যাগ জাতি চিরকাল শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে

জেলহত্যার নেপথ্যে সংঘটিত ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটন এখন জাতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। কারা ষড়যন্ত্রকারী, কারা প্ররোচনাদানকারী সে সব তদন্ত জরুরি। কলঙ্ক মোচনে সরকার এ ব্যাপারে সক্রিয় হবেন দেশবাসীর সেটাই প্রত্যাশা।
আর কে চৌধুরী
  ০৩ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
৩ নভেম্বর শোকাবহ জেলহত্যা দিবস। স্বাধীনতাপ্রাপ্তির সাড়ে তিন বছরের মাথায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয় সপরিবারে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে। এর আড়াই মাস পর আজকের এই দিনে কারাগারে আটক রাখা জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। মূলত যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তারা স্বাধীনতার স্থপতিকেও গলা টিপে হত্যা করতে চেয়েছিল স্বাধীনতার সময়েই। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় হায়েনাদের পক্ষে যা সম্ভব হয়নি, তা-ই তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রাপ্তির চার বছরের মাথায় জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করে। তারপরও তাদের রক্তপিপাসা মেটেনি। তারা ভালো করেই জানতো, বঙ্গবন্ধু চলে গেলেও তার আদর্শের বাহক রয়ে গেছে অনেক। সেই অনেকের চারজনকে যখন একসঙ্গে জেলখানায় পাওয়া গেল, তখন হায়েনারা আর সময় নষ্ট করেনি। চার নেতাকে তারা জেলখানায় ঢুকে হত্যা করে পাকিস্তান বিভক্তির প্রতিশোধ নিয়ে বুঝিয়ে দেয়, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকার করে না। পৃথিবীর ইতিহাসে জেলহত্যা দিবস এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনে এক শোকাবহ দিন। কারাগারের অভ্যন্তরে এ ধরনের বর্বর হত্যাকান্ড পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে জাতীয় চার নেতার হত্যাকান্ড ছিল জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার ধারাবাহিকতা। এর মাধ্যমে ষড়যন্ত্রকারীরা বাংলার মাটি থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নাম চিরতরে মুছে ফেলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস ও বাঙালি জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করার অপচেষ্টা চালিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সবচাইতে ঘৃণিত বিশ্বাসঘাতক সদস্য হিসেবে পরিচিত এবং তৎকালীন স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ এবং বঙ্গবন্ধুর দুই খুনি কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান এবং লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার আব্দুর রশীদ জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যার এ পরিকল্পনা করেন। এ কাজের জন্য তারা আগে ভাগে একটি ঘাতক দলও গঠন করে। এ দলের প্রধান ছিলেন রিসালদার মুসলেহ উদ্দিন। তিনি ছিলেন ফারুকের সবচেয়ে আস্থাভাজন অফিসার। ১৫ আগস্ট শেখ মনির বাসভবনে যে ঘাতক দলটি হত্যাযজ্ঞ চালায় সেই দলটির নেতৃত্ব দিয়েছিল মুসলেহ উদ্দিন। দক্ষিণ এশিয়ার প্রখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার 'বাংলাদেশ লিগ্যাসি অব বস্নাড' গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পরপরেই জেল খানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনাটি এমনভাবে নেওয়া হয়েছিল পাল্টা অভু্যত্থান ঘটার সঙ্গে সঙ্গে যাতে আপনা আপনি এটি কার্যকর হয়। আর এ কাজের জন্য পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি ঘাতক দলও গঠন করা হয়। এই ঘাতক দলের প্রতি নির্দেশ ছিল পাল্টা অভু্যত্থান ঘটার সঙ্গে সঙ্গে কোনো নির্দেশের অপেক্ষায় না থেকে কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে তারা জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করবে। পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ পাল্টা অভু্যত্থান ঘটানোর পরেই কেন্দ্রীয় কারাগারে এই জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার পর পরই পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে জাতির জনককে তার ঐতিহাসিক ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে। পরে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময় সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের সমধিক পরিচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ একটি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় কোটি কোটি বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করে। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। তাজউদ্দীনের ভাষায়, 'আমি সেদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তা হলো : একটি স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনার জন্য কাজ শুরু করা।' প্রথমে আত্মরক্ষা তারপর প্রস্তুতি এবং সর্বশেষে পাল্টা আক্রমণ এই নীতিকে সাংগঠনিক পথে পরিচালনার জন্য তিনি সরকার গঠনের চিন্তা করতে থাকেন। তাই তাজউদ্দীন আহমদ আত্মগোপন করেন এবং যুদ্ধকে সংগঠিত করার জন্য সীমান্তের দিকে যাত্রা করেন। এরই মধ্যে ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় তিনি ফরিদপুর কুষ্টিয়া পথে পশ্চিম বাংলার সীমান্তে পৌঁছান। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ৩১ মার্চ মেহেরপুর সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পদার্পণ করেন। সীমান্ত অতিক্রম করার বিষয়ে মেহেরপুরের মহকুমা শাসক তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী তাদের সার্বিক সহায়তা প্রদান করেন। তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠতম সহকর্মী। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের আগে ভারত সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের কয়েক দফা বৈঠক হয় এবং তিনি তাদের বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনার জন্য যেসব সাহায্য ও সহযোগিতার প্রয়োজন তা বুঝিয়ে বলেন। দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে এলে তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তিনি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বাজেট পেশ করেন, প্রথম পাঁচশালা পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের মর্মান্তিক মৃতু্যর পর বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাক আহমদকে প্রেসিডেন্ট করে তৈরি করা সরকার নির্যাতন চালায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর ওপর। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে দুইটা পথ রাখা হয়- মোশতাক সরকারকে সমর্থন দান নতুবা জেলে যাওয়া। বেশির ভাগ নেতারা জেলে চলে যায়। এর মধ্যে এই চার নেতাও ছিলেন। জেলে বন্দি রেখে বিভিন্নভাবে তাদের সমর্থন আদায়েরও চেষ্টা করা হয়। এই চার নেতার সমর্থন আদায় করতে না পেরে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে তাদের খুন করা হয়। পৃথিবীর যে কোনো আইনে জেলের ভেতর হত্যা করা একটা জঘন্য অপরাধ। সেই অপরাধের বিচার বন্ধ করা আরো বড় অপরাধ। কিন্তু লজ্জাজনক হলেও সত্য এই বিচার নিষিদ্ধ করে একটা সংশোধনী সংবিধানে সংযোজন করে হত্যাকারীদের নিরাপদে দেশ ত্যাগ করার সুযোগ করা হয়। পরে তাদের পররাষ্ট্র বিভাগের অধীনে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃৃত করা হয়। শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধু ও জেল হত্যার বিচার কার্যক্রম শুরু করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী কয়েকজনের সাজা হলেও বাকিরা পলাতক। এই হত্যাকারীরাই জেল হত্যায়ও জড়িত ছিল। এই হত্যার আগে গুজব ছড়ানো হয়েছিল যে, ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশ করে কারাগার থেকে চার নেতাকে মুক্ত করে নতুন সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। এই গুজবে বিভ্রান্ত হয়েছিল দেশবাসীও। পরদিন লালবাগ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছিল জেল কর্তৃপক্ষ। ক্ষমতা দখলকারী জিয়া তিন বিচারপতির সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের ক'দিন পর তা বাতিল করে দেন। আর খুনিদের নিরাপত্তার জন্য দেশের বাইরে পাঠানো হয়। অনেককে দূতাবাসে চাকরি দেওয়া হয় পুরস্কারস্বরূপ। এ ঘটনায় ১৯৮৮ সালে নতুন করে দায়ের করা মামলার চার্জশিট দেওয়া হয় ২৩ জনকে অভিযুক্ত করে। ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ প্রদত্ত রায়ে পলাতক চারজনকে মৃতু্যদন্ডাদেশ ও ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। আপিলে মৃতু্যদন্ডপ্রাপ্ত ২ জনকে ও যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত ৪ জনকে খালাস দেওয়া হয়। ২০১৩ সালে আপিলের পুনরায় শুনানির পর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। জেলহত্যার নেপথ্যে সংঘটিত ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটন এখন জাতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। কারা ষড়যন্ত্রকারী, কারা প্ররোচনাদানকারী সে সব তদন্ত জরুরি। কলঙ্ক মোচনে সরকার এ ব্যাপারে সক্রিয় হবেন দেশবাসীর সেটাই প্রত্যাশা। আর কে চৌধুরী : মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ, সাবেক চেয়ারম্যান রাজউক, উপদেষ্টা, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি আর কে চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে