শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
walton1

বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু

ড. আশরাফ পিন্টু
  ২৯ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
জগদীশচন্দ্র বসু ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। বিক্রমপুরের রাঢ়িখাল গ্রামে তার পরিবারের প্রকৃত বাসস্থান ছিল। তার পিতা ভগবানচন্দ্র বসু ফরিদপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। ইংরেজ সরকারের অধীনে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও ভগবানচন্দ্র নিজের ছেলেকে ইংরেজি স্কুলে ভর্তি করাননি। জগদীশচন্দ্রের প্রাথমিক শিক্ষার সূত্রপাত হয় ফরিদপুর জেলার একটি গ্রাম্য বিদ্যালয়ে। জগদীশের যখন এগারো বছর বয়স তখন তার পরিবার কলকাতায় চলে যায়। তার পিতা ভগবানচন্দ্র মনে করতেন ইংরেজি শেখার আগে এদেশীয় ছেলেমেয়েদের মাতৃভাষা আয়ত্ত করা উচিত। বাংলা স্কুলে পড়ার ব্যাপারটি জগদীশচন্দ্রের জীবনে যেমন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেছে, তেমনি বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করতেও সাহায্য করেছে। এর প্রমাণ বাংলা ভাষায় রচিত জগদীশের বিজ্ঞান প্রবন্ধগুলো। জগদীশ কলকাতার হেয়ার স্কুল থেকে পড়াশোনা করেন। এই কলেজে ইউজিন ল্যাফন্ট নামক একজন খ্রিষ্টান যাজক প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ওপর তার আগ্রহ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জগদীশচন্দ্র প্রাকৃতি বিজ্ঞান সম্বন্ধে শিক্ষালাভের উদ্দেশে কেমব্রিজের ক্রাইস্ট কলেজে ভর্তি হন। এখান থেকে ট্রাইপস পাস করেন। ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি সম্পন্ন করেন। কেম্ব্রিজে জন উইলিয়াম স্ট্রাট, ৩য় ব্যারন রেলি, মাইকেল ফস্টার, জেমস ডেওয়ার, ফ্রান্সিস ডারউইন, ফ্রান্সিস মেটল্যান্ড বালফুর, সিডনি ভাইনসের মতো বিখ্যাত বিজ্ঞানসাধকরা তার শিক্ষক ছিলেন। জগদীশচন্দ্র বসু ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ভারতে ফিরে আসেন। তৎকালীন ভারতের গভর্নর জেনারেল জর্জ রবিনসন, প্রথম মার্কুইস অব রিপনের অনুরোধে স্যার অ্যালফ্রেড ক্রফট বসুকে প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক নিযুক্ত করেন। কলেজের অধ্যক্ষ চার্লস হেনরি টনি এই নিয়োগের বিপক্ষে ছিলেন। শুধু যে তাকে গবেষণার জন্য কোনোরকম সুবিধা দেওয়া হতো না শুধু তাই নয়, তিনি ইউরোপীয় অধ্যাপকদের অর্ধেক বেতনেরও কম অর্থ পেতেন। এর প্রতিবাদে বসু বেতন নেওয়া বন্ধ করে দেন এবং তিন বছর অবৈতনিকভাবেই অধ্যাপনা চালিয়ে যান। দীর্ঘকাল ধরে এই প্রতিবাদের ফলে তার বেতন ইউরোপীয়দের সমতুল্য করা হয়। প্রেসিডেন্সি কলেজে গবেষণার কোনোরকম উলেস্নখযোগ্য ব্যবস্থা না থাকায় ২৪ বর্গফুট একটি ছোট ঘরে তাকে গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতে হতো। প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার প্রথম আঠারো মাসে জগদীশ যে সব গবেষণা কাজ সম্পন্ন করেছিলেন তা লন্ডনের রয়েল সোস্যাইটির জার্নালে প্রকাশিত হয়। এই গবেষণাপত্রগুলোর সূত্র ধরেই লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে তাকে ডিএসসি ডিগ্রি প্রদান করে। পদে পদে প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তার বিজ্ঞান সাধনার প্রতি আগ্রহ তখন অনেককেই বিস্মিত করেছিল। কলেজে যোগ দেওয়ার এক দশকের মধ্যে তিনি বেতার গবেষণার একজন দিকপাল হয়ে ওঠেন। জগদীশচন্দ্র বসু বাংলার বিজ্ঞানীদের অগ্রদূত। তিনিই বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন আমরাও বিজ্ঞানী হতে পারি। 'অতিক্ষুদ্র তরঙ্গ সৃষ্টি ও প্রেরণ' তার ছিল অন্যতম গবেষণা। ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি অতিক্ষুদ্র তরঙ্গ সৃষ্টি এবং কোনো তার ছাড়াই একস্থান থেকে অন্যস্থানে তা প্রেরণে সফলতা পান। ১৮৮৭-এ বিজ্ঞনী হেরৎস প্রত্যক্ষভাবে বৈদু্যতিক তরঙ্গের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। এ নিয়ে আরও গবেষণা করার জন্য তিনি চেষ্টা করছিলেন যদিও শেষ করার আগেই তিনি মারা যান। জগদীশচন্দ্র তার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করে সর্বপ্রথম প্রায় ৫ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট তরঙ্গ তৈরি করেন। এ ধরনের তরঙ্গকেই বলা হয় অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গ বা মাইক্রোওয়েভ। আধুনিক রাডার, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন এবং মহাকাশ যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই তরঙ্গের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মূলত এসব যন্ত্রের মূল ভিত্তিই হলো জগদীশচন্দ্র বসুর বেতার যন্ত্র এবং এর মাধ্যমেই বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ তথ্যের আদান-প্রদান ঘটে থাকে। বিজ্ঞানী মার্কনি রেডিও আবিষ্কারের আগেই বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু বিনা তারে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে তথ্যসংকেত বিনিময়ে সক্ষম হয়েছিলেন এবং প্রদর্শনও করেছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম ২ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত বিনা তারে বার্তা পাঠাতে সক্ষম হন। ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে জগদীশচন্দ্র বসু কলকাতার টাউন হল মাঠে এক জনসভায় বক্তৃতা করেন। সেই বক্তৃতায় তিনি বিদু্যৎচুম্বকীয় তরঙ্গকে বিনা তারে দেয়াল ভেদ করে কীভাবে পাঠানো যায় তার প্রমাণ দিলেন। সমগ্র ভারতে তার নাম ছড়িয়ে পড়ল। নাম ছড়ালো ইউরোপেও। ওই বছরই তার কাজ নিয়ে একটা ফিচার ছাপা হলো ইংল্যান্ডের ইলেকট্রিশিয়ান পত্রিকায়। সেই ফিচারে লেখা হয়েছিল : 'এ পর্যন্ত যতগুলো বেতার যন্ত্র আবিষ্কার হয়েছে, সবকটাকে হারিয়ে দিয়েছে জগদীশচন্দ্র বসুর বেতার যন্ত্র।' এই খ্যাতির ফলে নয় মাসের জন্য ইউরোপ ভ্রমণের সুযোগ পান জগদীশ। ১৮৯৬ সালে ইংল্যান্ডের রয়্যাল সোসাইটি এক সভায় যোগ দেন। সেই সভায় বেতারে বার্তা প্রেরণ করে তার কাজের প্রমাণ দেখান। সেখানে সভায় উপস্থিত ছিলেন লর্ডর্ যালেসহ আরও অনেক বিখ্যাত বিজ্ঞানী। এর এক বছর পর পর ইতালিয়ান বিজ্ঞানী মার্কনি তার বেতার যন্ত্র উদ্ভাবন করেন। অথচ বেতার যন্ত্রের আবিষ্কার হিসেবে মার্কনির কথা সারাবিশ্বে প্রচার হয়ে গেল। এর কারণও ছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের ভারতীয়দের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ ও আর্থিক সাহায্যের অভাবে জগদীশ তার এই আবিষ্কারকে যথাসময়ে বিশ্বজনসমক্ষে তুলে ধরতে সক্ষম হতে পারলেন না। এছাড়া সে সময় ইউরোপের এক বিখ্যাত ইলেকট্রনিকস কোম্পানি জগদীশচন্দ্র বসুর বেতার যন্ত্রের নকশাটা কিনতে চায়। কিন্তু তিনি সেটা বিক্রি করতে রাজি হননি। এর কিছুদিন পরেই মার্কনিও বেতার যন্ত্র উদ্ভাবন করেন। তখন সেই ইলেকট্রনিকস কোম্পানি মার্কনির যন্ত্রের নকশটা কিনে নেয়। ফলে মার্কনির তৈরি বেতার যন্ত্রই ছড়িয়ে পড়ে সারাবিশ্বে। তাই 'বেতার বার্তা' আবিষ্কারকের রাজমুকুট মার্কনিই পেয়ে যান। এ নিয়ে অবশ্য জগদীশচন্দ্র বসুর মনে কোনো দুঃখ ছিল না। তিনি মনে করতেন, বিজ্ঞান হলো সাধনা, ব্যবসার বস্তু নয়। ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে মার্কনিকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হলো। আর বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বেতার তরঙ্গের সৃষ্টির আবিষ্কারক হিসেবে অজ্ঞই থেকে গেলেন। বিংশ শতকের শুরুতে পদার্থ বিজ্ঞান গবেষণায় বিপস্নব ঘটে। আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব আর ম্যাক্স পস্ন্যাঙ্কের কোয়াণ্টাম তত্ত্ব তখন বিশ্বব্যাপী ঝড় তুলেছে। ঠিক তখন জগদীশচন্দ্র বসু কোনো এক অজানা কারণে পদার্থবিজ্ঞান গবেষণা ছেড়ে উদ্ভিদ বিজ্ঞানে গবেষণা শুরু করলেন। জগদীশচন্দ্র বিশ্বকে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে। এ নিয়ে প্রথমে অনেক কথা শুনতে তাকে। অনেক লড়াইয়ের পর এই আবিষ্কারটা তার কাছে থেকে আর কেউ ছিনিয়ে নিতে পারেনি। জগদীশচন্দ্র বসু তার আবিষ্কৃত ক্ষুদ্র তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের বিকিরণ ব্যবহার করেন জৈব ও অজৈব বিকিরণ শোষণ প্রক্রিয়ার ওপর। ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশ করলেন এই বিষয়ে লেখা একটা বই। বইটির নাম 'জীব ও জড়ের সাড়া'। তিনি মূলত চেষ্টা করছিলেন বিদু্যৎ প্রবাহের ফলে উদ্ভিদ কোনো উত্তেজনা অনুভব করে কিনা। এজন্য তিনি বেশ কিছু যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন। তার মধ্যে একটির নাম- 'জবংড়হধহঃ জবপড়ৎফবৎ্থ। এই যন্ত্রে উদ্ভিদের বিবিধ স্পন্দন লিপিবদ্ধ হয় এবং উদ্ভিদের বৃদ্ধির পরিমাণ মুহূর্তও নির্ষয় করা যায়। জগদীশচন্দ্র বসু প্রমাণ করেন- উদ্ভিদেরও মানুষের মতো অনুভূতি আছে। জগদীশচন্দ্র বসুই আমাদের বিজ্ঞান চর্চা করতে শিখিয়েছেন। বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন বাঙালিরাও বিজ্ঞান গবেষণায় ইউরোপীয়দের সমান হতে পারে। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত পত্রিকা ডেইলি মেইল তাকে নিউটন গ্যালিওদের সমকক্ষ বিজ্ঞানী বলে আখ্যায়িত করেছিল। আর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছিলেন, 'জগদীশচন্দ্রের প্রতিটি আবিষ্কার বিজ্ঞান জগতের এক একটি বিজয়স্তম্ভ।' মনীষী রোঁমা রোলার ভাষায়, 'জবাবধষবৎ ড়ভ ধ হবি ডড়ৎষফ'. এই মহান বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ নভেম্বর ভারতের ঝাড়খন্ডের গিরিডিতে মৃতু্যবরণ করেন। ড. আশরাফ পিন্টু : বিভাগীয় প্রধান, বাংলা মনজুর কাদের মহিলা ডিগ্রি কলেজ বেড়া, পাবনা
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে