ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ

পরীমনির মামলায় নাসিরসহ গ্রেপ্তার ৫

পরীমনির মামলায় নাসিরসহ গ্রেপ্তার ৫

ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে চিত্রনায়িকা পরীমনির করা মামলার প্রধান আসামি আবাসন ব্যবসায়ী নাসির ইউ মাহমুদ ও তার বন্ধু অমিসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। সোমবার দুপুরে রাজধানীর উত্তরা-১ নম্বর সেক্টরের-১২ নম্বর রোডে নাসির ইউ মাহমুদের বাসায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

গোয়েন্দা বিভাগ (উত্তর তেজগাঁও, গুলশান, মিরপুর ও উত্তরা) এবং সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের যুগ্ম-পুলিশ কমিশনার হারুন-অর-রশীদ সোমবার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, জনপ্রিয় নায়িকা পরীমনির মামলার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। নাসির ইউ মাহমুদের বাসায় অভিযানকালে বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়।

এর আগে সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সাভার মডেল থানায় ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে উত্তরা ক্লাবের সাবেক

সভাপতি ও আবাসন ব্যবসায়ী নাসির ইউ মাহমুদসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। মামলায় আসামি হিসেবে ঢাকা বোট ক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও আবাসন ব্যবসায়ী নাসির ইউ মাহমুদ ও তার বন্ধু অমির নাম উলেস্নখ করে আরও চারজনের নাম অজ্ঞাত রাখা হয়েছে। সোমবার সকালেই রূপনগর থানার মাধ্যমে লিখিত অভিযোগ করেন পরীমনি।

মামলার এজাহারে পরীমনি লিখেছেন, 'নাসির ইউ মাহমুদ (৫০), অমিসহ (৪১) আরও চারজনের বিরুদ্ধে এ মর্মে এজাহার দায়ের করছি যে, ৯ জুন রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টায় আমার বর্তমান ঠিকানার বাসা থেকে আমার কস্টিউম ডিজাইনার জিমি, অমি ও বনিসহ দুটি গাড়িযোগে উত্তরার উদ্দেশ্যে রওনা হই। পথে অমি বলে, বেড়িবাঁধের ঢাকা বোট ক্লাব লিমিটেডে তার দুই মিনিটের কাজ আছে। অমির কথামতো আমরা ঢাকা বোট ক্লাবের সামনে গাড়ি দাঁড় করাই। কিন্তু বোট ক্লাব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অমি কোনো এক ব্যক্তির সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে। তখন ঢাকা বোট ক্লাবের সিকিউরিটি গার্ডরা গেট খুলে দেয়। তখন অমি অনুরোধ করে, এখানে পরিবেশ সুন্দর, তোমরা নামলে নামতে পারো। আমরা ঢাকা বোট ক্লাবে ঢুকে টয়লেট ব্যবহার করি। টয়লেট থেকে বের হওয়ার পর ১ নম্বর বিবাদী নাসির উদ্দিন মাহমুদ আমাদের ডেকে বারের ভেতরে বসার অনুরোধ করেন এবং কফি খাওয়ার প্রস্তাব দেন। আমরা বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইলে অমিসহ ১ নম্বর আসামি মদ্যপান করার জন্য জোর করেন।'

পরীমনি এজাহারে আরও লিখেছেন, 'মদ্যপান করতে না চাইলে ১ নম্বর আসামি জোর করে আমার মুখের মধ্যে মদের বোতল ঢুকিয়ে মদ খাওয়ানোর চেষ্টা করে। এতে আমি সামনের দাঁত ও ঠোঁটে আঘাত পাই। ১ নম্বর আসামি আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। আমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ করে এবং আমাকে জোর করে ধর্ষণের চেষ্টা করে। ১ নম্বর আসামি উত্তেজিত হয়ে টেবিলে রাখা গস্নাস ও মদের বোতল ভাঙচুর করে আমার গায়ে ছুড়ে মারে। তখন আমার কস্টিউম ডিজাইনার জিমি ১ নম্বর আসামিকে বাধা দিতে চাইলে তাকেও মারধর করে। এ সময় আমি ৯৯৯-এ কল করতে গেলে আমার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি টান মেরে ফেলে দেওয়া হয়। ২ নম্বর আসামিসহ অজ্ঞাত পরিচয় চারজন ১ নম্বর আসামিকে ঘটনা ঘটাতে সহায়তা করে।'

পরীমনি আরও লিখেছেন, 'আমি অজ্ঞাত আসামিদের দেখলে শনাক্ত করতে পারব। প্রকাশ থাকে যে, ২ নম্বর আসামি অমি পূর্বপরিকল্পিতভাবে আমাকে আমার বর্তমান বাসা থেকে ঢাকা বোট ক্লাবে নিয়ে যায় এবং ২ নম্বর আসামি অমিসহ অজ্ঞাত চারজন আসামির সহায়তায় ১ নম্বর আসামি নাসির উদ্দিন মাহমুদ আমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ করে এবং জোরপূর্বক আমাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। আমার সঙ্গীদের সহায়তায় ধর্ষকের হাত থেকে রক্ষা পাই। আনুমানিক রাত ৩টার দিকে আমি আমার গাড়িযোগে প্রায় অচেতন অবস্থায় আমার সঙ্গীদের সঙ্গে ফিরে আসি। আসামিরা বিভিন্ন মাধ্যমে আমাকে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করছে। ওই বিষয়ে আমি আমার পরিবার, শিল্পী সমিতি ও অন্যদের সঙ্গে আলোচনা করায় এজাহার দায়ের করতে বিলম্ব হলো।'

এর আগে রোববার সন্ধ্যায় প্রথম ধর্ষণ ও হত্যা চেষ্টার অভিযোগ করে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে স্ট্যাটাসের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চান এ অভিনেত্রী। পরে রাত ৯টার দিকে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলন চলাকালীন তিনি বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরীমনি বারবারই বলছিলেন, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তিনি। তার আশঙ্কা, তাকে মেরে ফেলা হতে পারে। এসব বলেই হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনের পুরোটা সময় পরীমনির বাসায় ছিলেন বনানী থানার ওসি মোহাম্মদ নূরে আজম মিয়া। সোমবার সকালে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, 'তিনি যেহেতু নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, আমাদের দায়িত্ব প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাকে আমরা বিশেষ প্রহরায় রাখছি। তার বাসা ও আশপাশে পুলিশ আছে। তার নিরাপত্তার জন্য যা যা করণীয়, তা-ই করা হচ্ছে।'

এদিকে পরীমনির আনা অভিযোগ অস্বীকার করে নাসির উদ্দিন নিজেকে নির্দোষ দাবি করে সাংবাদিকদের বলেন, 'আমি বুধবার (৯ জুন) রাতে যখন ক্লাব থেকে বের হই, তখন ক্লাবে ঢোকে তারা (পরীমনি ও তার বন্ধু)। এ সময় তারা মদ্যপ অবস্থায় ছিল। তাদের মধ্যে একটা ছেলে উচ্ছৃঙ্খল ছিল। ক্লাবে ঢোকার পর আমাদের বারের কাউন্টার থেকে বড় বড় ও দামি ড্রিংকসের বোতল জোর করে নেওয়ার চেষ্টা করে তারা। তখন আমি তাদের কাছে গিয়ে বলি, আপনারা ড্রিংকসগুলো নিতে পারেন না। আমি তাদের বাধা দিই। আমি বলি, এটা শুধু ক্লাবের মেম্বারদের জন্য। এখান থেকে মদ নিতে হলে তোমাদের কোনো সদস্যের অ্যাকাউন্টের বিপরীতে নিতে হবে। তারপর আমি আমার সিকিউরিটিদের ডাক দিই। নিরাপত্তারক্ষীরা এসে তাদের নিয়ে যায়।'

পরীমনি কেন ওই ক্লাবে গিয়েছিলেন, তা জানতে চাইলে হারুন-অর-রশীদ বলেন, এ বিষয়ে মামলা হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসব বিষয় নজরে এনে সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।

তবে এ মামলার প্রধান আসামিসহ পাঁচজন গ্রেপ্তার হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন পরীমনি। তিনি বলেন, 'এখন ভরসা পাচ্ছি। স্বস্তিতে নিঃশ্বাস নিতে পারছি। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর দ্রম্নত আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিশ্চিন্ত হলাম যে বিচার পাব।'

অন্যদিকে পরীমনির সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছেন শোবিজের মানুষ। নানা অঙ্গনের তারকারাও মুখ খুলছেন এই ইসু্যতে। তারা পরীকে সাহস দিচ্ছেন সমর্থন জুগিয়ে। কেউ কেউ প্রশংসাও করছেন ন্যায় পাওয়ার প্রত্যাশায় সাহসী হয়ে ওঠার জন্য।

জড়িতদের শাস্তি দাবি বিএনপি এমপির

চলচ্চিত্র অভিনেত্রী পরীমনিকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দাবি করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ। সোমবার জাতীয় সংসদে আয়োডিনযুক্ত লবণ বিল-২০২১ আইনটি পাসের সময় জনমত যাচাই-বাছাইয়ের প্রস্তাব ও সংশোধনীর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ দাবি তোলেন।

তিনি বলেন, 'পরীমনি বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত শিল্পী। তিনি এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছেন। চার দিন ধরে তিনি বিচারপ্রার্থী। কিন্তু বিচার পাচ্ছেন না। এটি কি অসত্য? মুনিয়ার ঘটনা ঘটল। এগুলো যারা ঘটাচ্ছে তারা মাফিয়া।'

সত্যিকার অর্থে যে বিষয়গুলো আজকে বিরাট আকারে সরকারকে নাড়া দিয়েছে সেই বিষয়গুলোকে আমলে নিতে হারুন প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

ঢাকা বোট ক্লাব থেকে তিনজনকে বহিষ্কার

চিত্রনায়িকা পরীমনিকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর তিন সদস্যকে বহিষ্কার করেছে ঢাকা বোট ক্লাব। বহিষ্কৃতরা হলেন- নাসির উদ্দিন মাহমুদ, তুহিন সিদ্দিকী অমি ও শাহ এস আলম। পরীমনি মামলা করার পর এদের মধ্যে ব্যবসায়ী নাসির ও অমিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।

পরীমনি অভিযোগ তোলার পর তুমুল আলোচনার মধ্যে সোমবার রাতে ঢাকা বোট ক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটি জরুরি বৈঠকে বসে। ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ক্লাবের সভাপতি, পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদ।

তিনি ক্লাব থেকে তিনজনকে বহিষ্কারের কথা নিশ্চিত করেছেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে