পিকে হালদারকান্ড

ভারতে অঢেল সম্পদের খোঁজ পেয়েছে ইডি

১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হ দেশে ফেরানো প্রশ্নে রুলের শুনানি ১২ জুন হ আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে পাঠাবে ভারত : রাষ্ট্রদূত
ভারতে অঢেল সম্পদের খোঁজ পেয়েছে ইডি

হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও অর্থ পাচার করে ভারতে পালিয়ে থাকা অবস্থায় গ্রেপ্তার প্রশান্ত কুমার হালদারের (পিকে হালদার) এ পর্যন্ত ১৫০ কোটি রুপির সম্পদের খোঁজ মিলেছে। আরও সম্পদ অনুসন্ধান করছে ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এদিকে, পিকে হালদারকে ফের ১০ দিনের রিমান্ডে দিয়েছেন কলকাতার একটি আদালত। মঙ্গলবার প্রিভেনশন অব মানি লন্ডারিং অ্যাক্টের অধীনে কলকাতা নগর দায়রা আদালতে তাকে হাজির করে আরও ১৪ দিনের রিমান্ড চায় ভারতের এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। সিবিআই স্পেশাল কোর্টের বিচারক মাসুক হোসেইন খান পিকে হালদারের ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এর আগে গত শনিবার দুপুরের দিকে প্রদেশের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলা থেকে পিকে হালদারকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে তুলে রিমান্ডের আবেদন করা হয়। পরে আদালত সেই সময় তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

মঙ্গলবার পিকে হালদারের মামলার অগ্রগতির বিষয়ে আদালতকে অবগত করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্তকারী সংস্থা ইনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) আইনজীবীরা। এ সময় তারা আদালতকে বলেছেন, ভারতে অবৈধভাবে বসবাস ও ব্যবসা পরিচালনাকারী বাংলাদেশি নাগরিক পিকে হালদারকে জিজ্ঞাসাবাদে বিপুল সম্পত্তির খোঁজ মিলেছে। প্রাথমিক ইডি ভারতে তার ১৫০ কোটি টাকার সম্পত্তির সন্ধান পেয়েছে।

মঙ্গলবার সকালের দিকে ইডির কার্যালয়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে পিকে হালদারসহ

পাঁচজনকে আদালতে হাজির করে রিমান্ডের আবেদন করা হয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তাকে আদালতে নেওয়া হয়। শুনানির পর আদালত রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেন। তবে তার স্ত্রীকে ১০ দিনের জন্য বিচারিক হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। সেখানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অরিজিৎ চক্রবর্তী সাংবাদিকদের বলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের মামলা করা হয়েছে। সেই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড দেওয়া হয়েছে। ইডির কর্মকর্তারা বলেছেন, অবৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে ভারতে অর্থ পাচারের সঙ্গে প্রদেশের কোনো রাজনীতিক জড়িত আছেন কি না, সে বিষয়ে পিকে হালদার এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য দেননি।

ইডি বলেছে, ব্যক্তিগত আইনজীবী সুকুমার মৃধার সহায়তায় পিকে হালদার পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের একাধিক রাজ্যে বিপুল সম্পদ করেছেন। বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থ পাচারের মাধ্যমে ভারতে একাধিক অভিজাত বাড়িসহ বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে খোঁজ পেয়েছে ইডি। দেশটির কেন্দ্রীয় এই তদন্ত সংস্থা বলছে, তারা ইতোমধ্যে পিকে হালদারের কাছ থেকে বেশ কিছু নথি উদ্ধার করেছেন। এসব নথিতে প্রাথমিকভাবে ভারতে তার ২০ থেকে ২৫টির মতো বাড়ির মালিকানার তথ্য মিলেছে।

এদিকে, পিকে হালদারকে জিজ্ঞাসাবাদে তিনটি বিষয়ে অনুমতি চেয়েছে ইডি। সেগুলো হলো- চার্জশিট ছাড়া হেফাজতে রেখে দেওয়ার অনুমতি, দেশ ও দেশের বাইরে তদন্তের স্বার্থে যেখানে খুশি অভিযুক্তদের নিয়ে যাওয়ার অনুমতি এবং ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত জড়িতদের জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি।

দেশে ফেরানো প্রশ্নে রুলের শুনানি ১২ জুন

এদিকে, পিকে হালদারকে দেশে ফেরানো প্রশ্নে রুলের ওপর ১২ জুন শুনানির তারিখ ধার্য করেছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ মঙ্গলবার শুনানির এই তারিখ ধার্য করেন।

পিকে হালদার ইসু্যতে হাইকোর্ট বলেছেন, আমাদের বিভিন্ন আদেশের কারণেই পিকে হালদার আজ সারাবিশ্বে অন্যভাবে আলোচিত। অর্থ পাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত। আমরা এমন আদেশ দেব, পিকে হালদার ও অন্যান্য অর্থ পাচারকারীরা পৃথিবীর কোথাও শান্তিতে থাকতে পারবে না।

আদালত রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদকের আইনজীবীর উদ্দেশে বলেন, আপনারা শুধু নির্দিষ্ট করে দিন অর্থ পাচারকারীরা কোথায় আছেন, আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আদেশ দেব।

পরে আদালত পিকে হালদারকে গ্রেপ্তার ও দেশে ফিরিয়ে আনতে জারি করা রুল শুনানির জন্য আগামী ১২ জুন দিন ঠিক করেন। একইসঙ্গে এই সময়ের মধ্যে পিকে হালদারের বিরুদ্ধে থাকা সব মামলার তথ্য জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে গতকাল ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক পিকে হালদার ভারতে গ্রেপ্তার হওয়ার বিষয়টি আদালতকে জানান। একইসঙ্গে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পূর্বে জারি করা রুল শুনানির আবেদন জানান।

২০২০ সালের ১৮ নভেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকের 'পিকে হালদারকে ধরতে ইন্টারপোলের সহায়তা চাইবে দুদক' শীর্ষক প্রকাশিত প্রতিবেদন নজরে নিয়ে রুল জারি করে আদেশ দেন বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদারের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ।

রুলে পিকে হালদারকে গ্রেপ্তার ও দেশে ফিরিয়ে আনতে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ হবে না এবং এক্ষেত্রে দায়ী ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা কেন গ্রহণ করা হবে না তা জানতে চাওয়া হয়।

আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে পাঠাবে ভারত

এদিকে, পিকে হালদারকে ভারত থেকে ফেরত আনতে সময় লাগতে পারে। তাকে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ফেরত পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত বিক্রম দোরাইস্বামী।

মঙ্গলবার দুপুরে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে বৈঠকের পর ভারতের রাষ্ট্রদূত বলেন, 'পিকে হালদারের বিষয়ে কথা হয়েছে। এটি দুই দেশের নিয়মিত সহযোগিতার একটি অংশ।

হালদারকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশ অনুরোধ করেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'দেখুন, এটি একটি আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়। গত সপ্তাহে ছুটির দিনে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমাদের কাছে যা তথ্য আছে, তার ভিত্তিতে একটা সময় বাংলাদেশকে জানানো হবে। বুঝতে হবে, এটি কিন্তু বড়দিনের কার্ড বিনিময় নয়। আমি মনে করি, এ ধরনের বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।? সেটি আস্তে আস্তে হতে দিন। এ নিয়ে আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করছি।'

দোরাইস্বামী বলেন, 'দুই দেশের মধ্যে অপরাধমূলক তৎপরতা দমনের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা রয়েছে।? বাংলাদেশ সরকার ভারতের সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে তথ্য দিয়েছে। আমরা তা যাচাই করছি। এ ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। বাংলাদেশ ও ভারতের সংঘবদ্ধ অপরাধ ও অপরাধীদের দমনের জন্য সহযোগিতা রয়েছে।'

সহযোগীর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

এদিকে, পিকে হালদারের অন্যতম সহযোগী রতন কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রতন আনান কেমিক্যাল লিমিটেডের পরিচালক ও আরবি এন্টারপ্রাইজের মালিক। মামলায় তার বিরুদ্ধে প্রায় ৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

মঙ্গলবার দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে ঢাকা-১ এ সংস্থাটির উপ-পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। দুদকের জনসংযোগ দপ্তর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, রতন কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অসৎ উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেও সম্পদ বিবরণী দুদকে জমা না দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২১ সালের ৪ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সম্পদের হিসাব দাখিল করেননি। তবে দুদকের অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে ৫ কোটি ৮২ লাখ ৪৭ হাজার ২৬৪ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের প্রমাণ মিলেছে। নির্দিষ্ট সম্পদ বিবরণী ফরম দাখিল না করা ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদক আইন ২০০৪ এর ২৬ (২) ও ২৭ (১) ধারায় অভিযোগটি আনা হয়েছে। আলোচিত পিকে হালদার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এই মামলা নিয়ে মোট ৩৯টি মামলা দায়ের করেছে দুদক।

প্রসঙ্গত, শনিবার (১৪ মে) ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার অশোক নগরের একটি বাড়ি থেকে পিকে হালদার ও তার পাঁচ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে। দুদক পিকে হালদারকে ফেরাতে ভারতের ইন্টারপোল ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে।

হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারকারী পিকে হালদার নাম পাল্টে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করতেন। রাজ্যের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার অশোক নগরের একটি বাড়িতে আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। প্রশান্ত কুমার হালদার নিজেকে শিবশঙ্কর হালদার নামে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতেন।

বাংলাদেশি এই অর্থ পাচারকারী পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভারতীয় রেশন কার্ড, ভারতীয় ভোটার আইডি কার্ড, প্যান এবং আধার কার্ডও সংগ্রহ করেছিলেন। প্রশান্ত কুমার হালদারের অন্য সহযোগীরাও ভারতীয় এসব কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে সংগ্রহ করেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে