আকাশছোঁয়া দাম নিত্যপণ্যের

চরম বিপাকে সাধারণ মানুষ বেশি বেড়েছে চিনিতে
আকাশছোঁয়া দাম নিত্যপণ্যের

বন্যার প্রভাব, ডলার ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দামের কারণে চরম বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষ। খুচরা ব্যবসায়ীরাও স্বস্তিতে নেই। পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় খরিদ্দারের সঙ্গেও অনেক সময় বাহাসে জড়াতে হচ্ছে তাদের। খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মিলাররাই চাল মজুত করে সংকট সৃষ্টি করছেন। আর তাতেই দাম বাড়ছে।

নিত্যপণ্যের বাজারে এক সপ্তাহের মধ্যে কেজিপ্রতি চালের দাম বেড়েছে ৫ টাকা থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত। মোটা চাল ৫ থেকে ৬ টাকা এবং চিকন চালের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা পর্যন্ত। চালের আগেই বেড়েছে সয়াবিন তেল, ডিম ও সবজির দাম।

শনিবার রাজধানীর খুচরা বাজারে সবচেয়ে মোটা চাল বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৫২ টাকা এবং মাঝারি মানের মোটা পাইজাম কিংবা স্বর্ণা চাল বিক্রি হয়েছে ৫৭ থেকে ৫৮ টাকা কেজিতে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির আগের দিনও এই চাল কেজিপ্রতি বিক্রি হয়েছে ৪৬-৪৮ টাকা ও ৫২ টাকায়।

বিআর ২৮ ও ২৯ চাল বিক্রি হয়েছে ৬০ থেকে ৬২ টাকা, মিনিকেট ৭০ থেকে ৭৪ এবং নাজিরশাইল কেজিপ্রতি ৭৫ থেকে ৯০ টাকা দরে। অথচ এক সপ্তাহ আগে বিআর-২৮ জাতীয় চাল ৫২ থেকে ৫৫ টাকা, মিনিকেট ৬৮ থেকে ৭২ এবং নাজিরশাইল ৭০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। এসব চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ১৫ টাকা করে। এ ছাড়া সব ধরনের পোলাও চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, চালের দাম বস্তায় বেড়েছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। মোটা পাইজাম চাল আগে কেনা ছিল ২৪০০ টাকা বস্তা (৫০ কেজি ওজন), সেই বস্তা আজ কেনা পড়েছে ২৬৫০ টাকা। যাতায়াত খরচসহ কেজিপ্রতি খবর ৫৫ টাকার বেশি। এ জন্য তারা ৫৭-৫৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন।

কারওয়ান বাজারের চাটখিল রাইস এজেন্সির কর্মকর্তা সুলতান আহমেদ বলেন, 'লোডশেডিং ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে চাল উৎপাদন খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি যাতায়াত ভাড়া বেড়েছে। এ কারণে এখন চালের দাম বাড়ছে। মিলাররা চালের দাম বাড়িয়েছে। তাই আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।'

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির

সঙ্গে পালস্না দিয়ে বেড়েছে পেঁয়াজের দামও। এক সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজি প্রতি ১০ টাকা করে বেড়েছে। দেশি পেঁয়াজ গত সপ্তাহে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। শনিবার বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকা। ভারতীয় পেঁয়াজ গত সপ্তাহে কেজি ছিল ৩০ টাকা। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা কেজিতে। একই সঙ্গে, সব ধরনের মাছ-মাংস ও কাঁচা মরিচের দামও আকাশছোঁয়া। ডিমের দাম হালিতে ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়।

খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, ভারতীয় পেঁয়াজের আমদানি কম। এছাড়া জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহণ খরচ বেড়েছে। এ কারণে পেঁয়াজের দাম বাড়তি। পাইকারি বাজার থেকে কেজিপ্রতি পেঁয়াজ নিয়ে আসতে খরচ পড়ে ৪৪/৪৫ টাকা। ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি না করলে তাদের কোনো লাভ থাকে না।

এদিকে, সপ্তাহের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি চিনির দাম বেড়েছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। এদিকে খোলাবাজারে চিনি বিক্রি হচ্ছে সর্বনিম্ন ৯০ টাকা কেজি দরে। চিনির দামই সবচেয়ে বেশি বেড়েছে, এমন দাবি করেছেন ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আগে কখনো চিনির দাম এতটা বাড়েনি। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে চিনির দাম বাড়লে কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ২০ থেকে ২৫ পয়সা বাড়ার কথা। কিন্তু চিনির দামের ঊর্ধ্বগতিতে ক্রেতাদের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও অবাক হয়েছেন।

গত সপ্তাহে এক বস্তা চিনির দাম ছিল ৩ হাজার ৮০০ টাকা। আর এখন বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ২৪০ টাকা। রাজধানীর মহম্মদপুরের সিটি এন্টারপ্রাইজের বিক্রেতা সজিব বলেন, 'দুই মাস আগের কথা বলতে পারব না। এখন বাজারে চিনির দাম ৪ হাজার ২৫০ থেকে ৬০ টাকা। গত সপ্তাহে ৩ হাজার ৮৫০ থেকে ৩ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি করতে পেরেছি। হঠাৎ করে চিনির দাম এত বেড়ে যাবে এটা ভাবিনি।'

একই মার্কেটের খুচরা বিক্রেতা ওয়াসিম বলেন, বাজারে খোলা চিনির দাম ৯০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। আর ৯৫ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে প্যাকেটজাত চিনি।

সরকারের ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ, টিসিবির শুক্রবারের নির্ধারিত বাজার দর অনুযায়ী দেখা গেছে, খোলা চিনির দাম ৮২ টাকা এবং প্যাকেটজাত চিনির দাম ৯০ টাকা। এক সপ্তাহ আগে এই চিনির দাম ছিল ৮০ ও ৮২ টাকা এবং এক মাস আগে এই চিনির দাম ছিল ৭৮ ও ৮২ টাকা। আর এক বছর আগে দাম ছিল ৭০ ও ৭৫ টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ১৮.৬২ শতাংশ এবং এক মাসে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ৭.৫ শতাংশ।

এদিকে দেশের বাজারে চিনির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করে ১০ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে রিফাইনারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশন। একই সঙ্গে আমদানি শুল্ক মওকুফ এবং ব্যাংক রেটে ডলার চেয়েছে সংগঠনটি। ডলারের দাম বেশি হওয়ায় চিনি আমদানিতে বাড়তি অর্থ ব্যয় হচ্ছে ওই চিঠিতে বলা হয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, আগে টনপ্রতি চিনি আমদানিতে শুল্ক দিতে হতো ২২ হাজার থেকে ২৩ হাজার টাকা। ডলারের দাম বাড়ায় এখন শুল্ক দিতে হচ্ছে টনপ্রতি ২৮ হাজার থেকে ২৯ হাজার টাকা। এতে পরিশোধন শেষে প্রতি মণ চিনির মিলগেটে দাম দাঁড়াচ্ছে ৩ হাজার ৭০৩ থেকে ৩ হাজার ৮৮৮ টাকা। কিন্তু চিনি বিক্রি করতে হচ্ছে ২ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৯২০ টাকায়। এ পরিস্থিতিতে চিনির দাম বাড়াতে না পারলে লোকসান বেড়ে কারখানাগুলো দেউলিয়ায় পরিণত হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে