বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

৮ মাসে ২৩০১ জন বাল্যবিয়ের শিকার

কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের প্রতিবেদন
ম যাযাদি রিপোর্ট
  ০১ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০
দেশের ২৮টি জেলায় চলতি বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ২ হাজার ৩০১ জন কন্যাশিশু বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে। সে হিসাবে প্রতি মাসে ২৮৮ কন্যাশিশুর বাল্যবিবাহ হয়েছে। এ সময় ৫৮৯টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা হয়েছে। শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম এসব তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটি জাতীয় কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে 'কন্যাশিশু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন-২০২২' উপস্থাপন করেছে। অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্যে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সাধারণ সম্পাদক নাছিমা আক্তার বলেন, চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসে ৭৬ কন্যাশিশু যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়। এর বেশিরভাগই রাস্তায়, নিজ বাসায় ও স্বজনদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার। এ সময় পর্নোগ্রাফির শিকার ১৫, অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার ৩, অপহরণ ও পাচারের শিকার ১৩৬, হত্যার শিকার ১৮৬, যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার ১৩ এবং হত্যা করা হয়েছে ৫ জনকে, আত্মহত্যা করেছে ১৮১ ও ৮ কন্যাশিশুকে বিভিন্ন স্থানে ফেলে যাওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৫৭৪ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এর মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ৮৪ ও ৪৩ জন প্রতিবন্ধী কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার। জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম বলেছে, ধর্ষণের ঘটনার পর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অনেকেই জামিনে মুক্ত হয়ে ভুক্তভোগীর পরিবারকে ভয়ভীতি দেখায়। চূড়ান্ত শাস্তির কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। প্রতিবেদনে গৃহশ্রমিক নির্যাতনের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, প্রথম ৮ মাসে ১৫টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটে এবং ২ হত্যার শিকার ও ১ জন আত্মহত্যা করে। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সিদের ফোকাসড গ্রম্নপ আলোচনার তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, দিনে ৩০ থেকে ৩৫ জন নারী সাইবার বুলিংয়ের শিকার। অনুষ্ঠানে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ আর এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এগিয়ে যাওয়ার এ সময়টিতে এসেও কন্যাশিশুর জন্মকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয় না। ছেলেসন্তান জন্ম দেওয়াকে সামাজিকভাবে গৌরবের বিষয় ভাবা হয়। এটি কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণই শুধু নয়, তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণও বটে। তিনি আরও বলেন, কন্যাশিশুদের প্রতি সহিংস আচরণ শুরু হয় একেবারে জন্মলগ্ন থেকে। কিছু ক্ষেত্রে ভ্রম্নণ অবস্থা থেকেই। কন্যাশিশু ও নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ ও বঞ্চনা প্রতিরোধে কর্মকৌশল নির্ধারণের পাশাপাশি অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কন্যাশিশুদের সার্বিক চিত্র জানা প্রয়োজন। এ বিষয়ে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে আসছে। অনুষ্ঠানে কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের পক্ষ থেকে কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সেগুলো হলো- ১. শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার সব ঘটনাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দ্রম্নততম সময়ের মধ্যে বিচারিক কার্যক্রম শেষ করতে হবে। ২. 'যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন' নামে একটি আইন জরুরিভিত্তিতে প্রণয়ন করতে হবে। ৩. ঘটনার শিকার কন্যাশিশু ও নারীর পরিবর্তে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হবে ও আইনের আওতায় আনতে হবে। এ সম্পর্কিত প্রচলিত আইনের বিধান সংশোধন করতে হবে। ৪. উচ্চ পর্যায়ের আইসিটি বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় সব ধরনের পর্নোগ্রাফি সাইট বন্ধসহ পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। ৫. কন্যাশিশু নির্যাতনকারীদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে। ৬. শিশু সুরক্ষায় শিশুদের জন্য একটি পৃথক অধিদপ্তর গঠন করতে হবে। ৭. বাল্যবিয়ে বন্ধের লক্ষ্যে সামাজিক সুরক্ষার বাজেট বাড়িয়ে অগ্রাধিকারভিত্তিতে কন্যাশিশু ও তাদের অভিভাবকদের এর আওতায় আনতে হবে। বাল্যবিয়ে বন্ধে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। ৮. সাইবার সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা, জাতীয় বাজেটে সাইবার সচেতনতায় গুরুত্ব দেওয়া, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিএসআরে সাইবার সচেতনতা বাধ্যতামূলক করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাইবার পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। ৯. নির্যাতন বন্ধে বিদ্যমান আইনসমূহের সঠিক ও কঠোর প্রয়োগ বাস্তবায়ন করতে হবে। ১০. কন্যাশিশুর প্রতি সমাজের মনোভাব বদলাতে নারী-পুরুষ, সরকার, প্রশাসন, নাগরিক সমাজ, মিডিয়া এবং পরিবার সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন- চাইল্ড রাইটস অ্যান্ড প্রোটেকশন এডুকোর স্পেশালিস্ট মো. শহীদুল ইসলাম, গুডনেইবারস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মাইনুদ্দিন মাইনুল, হেলেন মনীষা সরকার প্রমুখ। প্রসঙ্গত, এ ফোরাম ২০২২ সালের প্রথম ৮ মাসে দেশের ২৪টি জাতীয়, স্থানীয় ও অনলাইন সংবাদমাধ্যম থেকে বাল্যবিবাহের তথ্য সংগ্রহ করেছে। এ ছাড়া বাল্যবিবাহ- সংক্রান্ত তথ্য তারা মাঠপর্যায় থেকে নিয়েছে।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে