বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

তবুও 'কালো বিড়াল' আতঙ্ক কাটছে না শেয়ারবাজারে

কেউ সেকেন্ডারি বাজারে গ্যাম্বলিং বা জুয়া কারবারি করে, কিছু ব্রোকারেজ হাউস বিনিয়োগকারীদের শেয়ারসহ সব অর্থ নিয়ে পালায়, কেউ ভুঁইফোঁড় কোম্পানি তালিকাভুক্ত করে টাকা হাতিয়ে নেয় আবার কিছু কোম্পানি মিথ্যা আয় দেখিয়ে দাম বাড়িয়ে নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা তুলে নেয়
এম সাইফুল
  ০৬ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০
এক যুগেও কাটেনি দেশের শেয়ারবাজারের মন্দাভাব। ২০১০ সালে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সূচক ছিল আট হাজার ৯১৮ পয়েন্ট। ১২ বছর পর এখন ডিএসইর প্রধান সূচক ছয় হাজার ৫৪৪ পয়েন্ট। জুয়া কারবারি ও তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও ব্রোকারেজ হাউসের দুর্বৃত্তায়নের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেয়ারবাজারকে 'কালো বিড়াল'-এর থাবা থেকে মুক্ত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যখনই বাজারে চাঙ্গাভাব ফিরে আসে তখনই সক্রিয় হয়ে ওঠে কয়েকটি সংঘবদ্ধচক্র। কেউ সেকেন্ডারি বাজারে গ্যাম্বলিং বা জুয়া কারবারি করে, কিছু ব্রোকারেজ হাউস বিনিয়োগকারীদের শেয়ারসহ সব অর্থ নিয়ে পালায়, কেউ ভুঁইফোঁড় কোম্পানি তালিকাভুক্ত করে টাকা হাতিয়ে নেয় আবার কিছু কোম্পানি মিথ্যা আয় দেখিয়ে দাম বাড়িয়ে নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা তুলে নেয়। এভাবেই দিনের পর দিন জিম্মি হয়ে অধিকাংশ বিনিয়োগকারীকে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। উল্টো দিকে গুটি কয়েক ব্যক্তি ও কোম্পানি অস্বাভাবিক মুনাফা তুলে নিচ্ছে। দৈনন্দিন তদারকিতে নিষ্ক্রিয় স্টক এক্সচেঞ্জসহ খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বাজার পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, শেয়ারবাজারের মন্দাভাব কাটানোর জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু কোনো উদ্যোগই কাজ করেনি বাজারে। অব্যাহত পতনের ফলে গত ৩১ জুলাই করোনার পর দ্বিতীয় দফায় কোম্পানি ও মিউচু্যয়াল ফান্ডের শেয়ার-ইউনিটের সর্বনিম্ন দর বেঁধে দেয় (ফ্লোর প্রাইস)। অর্থাৎ বাজারে ফ্লোর প্রাইসের নিচে শেয়ারদর নামবে না, যেটি কোনো সুস্থ বাজারের লক্ষণ নয় দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে ৩২৭টি কোম্পানির মধ্যে অন্তত ২০০টি কোম্পানির শেয়ারদর ফ্লোর প্রাইসে রয়েছে। কয়েকটি কোম্পানির শেয়ার নিয়ে এখনো চলছে গ্যাম্বলিং। মৌলভিত্তি সম্পন্ন অনেক কোম্পানির শেয়ারের দর ফ্লোরে পড়ে আছে বলে জানিয়েছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, করোনার প্রভাব কাটিয়ে ২০২১ সালের ১০ অক্টোবর ডিএসইর প্রধান সূচক ৭ হাজার ৩৬৭ পয়েন্টের রেকর্ড করে। এরপর আবার পতন শুরু হয়ে ৫ হাজার ৯৮০ পয়েন্টে নেমে আসে। ১০ মাসে সূচক হারায় প্রায় দেড় হাজার পয়েন্ট। এরপরই পতন রোধে ফ্লোর প্রাইস দেওয়া হয়। সবশেষ সূচক সাড়ে ৬ হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি ওঠানামা করছে। গত বছরের তুলনায় এখনো সূচক প্রায় সাড়ে ৮শ' পয়েন্ট নিচে অবস্থান করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১২ বছরে উল্টো প্রায় আড়াই হাজার পয়েন্ট নেই। আজও ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বরের লেনদেনে রেকর্ড ভাঙতে পারেনি। সেদিন তিন হাজার ২৪৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছিল। এ সময়ে ডিএসই অন্তত ২০ হাজার অতিক্রম হওয়ার কথা ছিল। দৈনন্দিন লেনদেনও পাঁচ হাজার কোটি টাকা ছাড়াত। পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশের বাজার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের সেনসেক্স সূচক করোনা মহামারির সময় ৪১ হাজার থেকে ২৭ হাজার ৫০০ পয়েন্টে নেমে গিয়েছিল। এরপর আবার বাজার ঘুরে ৬১ হাজার পয়েন্টে উঠে যায়। বর্তমানে ৫৭ হাজার ৪২৬ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এমনকি শ্রীলংকার কলম্বো স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক ২০২০ সালে ৬ হাজার থেকে ২০২২ সালে ১৩ হাজার পয়েন্টে উঠে গিয়েছিল। যদিও শ্রীলংকার অর্থনৈতিক মন্দার পর ৬ হাজার ৫০০ পয়েন্টে নেমে গিয়েছিল। বর্তমানে আবারও বেড়ে প্রায় ১০ হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি। গ্যাম্বলিং বা জুয়া : একদিকে প্রতিদিনই কমছে শেয়ারবাজারের অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর। অন্যদিকে গুটিকয়েক শেয়ার নিয়ে চলছে জুয়া। গত দুই বছরজুড়েই ছিল বীমা খাত ও বেক্সিমকো গ্রম্নপের দুটি কোম্পানির শেয়ার নিয়ে জুয়া। দুই বছরে নিঃস্ব সাধারণ বিনিয়োগকারী। এবার ওরিয়ন গ্রম্নপের তিনটি শেয়ার নিয়ে চলছে জুয়া। বেক্সিমকো গ্রম্নপের দুটি শেয়ার নিয়ে এক দফায় গ্যাম্বলিং শেষ হয়ে আবারও গ্যাম্বলিংয়ের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। জানা গেছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একটি চক্র বাজারে অস্বাভাবিক হারে গ্যাম্বলিং শুরু করে। ১০ বছর শেয়ারবাজারের মন্দাভাব থাকার পর ২০২০ সালে ১৭ মার্চ অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বে কমিশন কার্যক্রম শুরুর পর বাজারে বিনিয়োগকারীরা যেভাবে নতুন তহবিল নিয়ে এসেছিল, এর পুরোটাই খুইয়েছে। গত দুই বছরের বীমা খাতের শেয়ার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এশিয়া ইন্সু্যরেন্সের শেয়ারদর ২০২০ সালের ২ জুলাই ছিল ১৭ টাকা। সেখান থেকে কোম্পানিটির শেয়ারদর ১৯ জানুয়ারি ২০২১ সালে ১২৯ টাকা ২০ পয়সায় ওঠে যায়। কমার পর আবার গতকাল মঙ্গলবার ৪৮ টাকা ৯০ পয়সায় নেমে আসে। এশিয়া প্যাসিফিক জেনারেল ইন্সু্যরেন্সের শেয়ারদর ২০২০ সালের ২ জুলাই ছিল ১৯ টাকা ১০ পয়সা। এরপর কয়েক দফা বেড়ে সবশেষ ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর শেয়ারটি ৮৭ টাকা ৪০ পয়সায় উঠে। সেটি কমে সবশেষ গতকাল মঙ্গলবার ৪৬ টাকা ২০ পয়সায় নেমে আসে। ২০২০ সালের ২ জুলাই অগ্রণী ইন্সু্যরেন্সের শেয়ারদর ছিল ১৭ টাকা ৬০ পয়সা। বেশ কয়েক দফায় দর বাড়ার পর সবশেষ ২০২১ সালের ১৫ জুন ৬৯ টাকা ১০ পয়সায় উঠে। সবশেষ গতকাল মঙ্গলবার কোম্পানিটির শেয়ারদর কমে ৩৮ টাকা ৬০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। গত একই বছরের ২৬ জুলাই বাংলাদেশ জেনারেল ইন্সু্যরেন্স কোম্পানির (বিজিআইসি) শেয়ারদর ছিল ২২ টাকা ৯০ পয়সা। সেখান থেকে কোম্পানিটির দর বাড়ার পর ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর ৩৯ টাকায় দাঁড়িয়েছে। সবশেষ গতকাল মঙ্গলবার তা আবার কমে ৩৮ টাকা ৬০ পয়সায় নেমে আসে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্সু্যরেন্সের শেয়ারদর গত বছরের ২ জুলাই ছিল ১৭ টাকা ১০ পয়সা। এরপর থেকে টানা কোম্পানিটির শেয়ারদর বাড়তে থাকে এবং দর বাড়ার পর ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর ১৬৩ টাকা ৮০ পয়সায় উঠে যায়। সবশেষ গতকাল মঙ্গলবার তা কমে আবার ৫৮ টাকা ৩০ পয়সায় নেমে আসে। সেন্ট্রাল ইন্সু্যরেন্সের শেয়ারদর ২০২০ সালের ১২ জুলাই ছিল ২২ টাকা ৮০ পয়সা। সেখান থেকে টানা বাড়তে বাড়তে ২০২১ সালের ২৭ জুলাই শেয়ারটির দর ৬৯ টাকা ৩০ পয়সায় উঠে যায়। সবশেষ গতকাল মঙ্গলবার শেয়ারটির দর ৩৭ টাকা ৪০ পয়সায় নেমে আসে। ২০২০ সালের ২ জুলাই সিটি জেনারেল ইন্সু্যরেন্সের শেয়ারদর ছিল ১৩ টাকা ১০ পয়সা। মাঝখানে কয়েক দফায় উত্থানের পর দর বাড়ার পর ২০২১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর কোম্পানিটির শেয়ার ৫০ টাকা ৪০ পয়সায় উঠে। সবশেষ গতকাল মঙ্গলবার তা আবার কমে ২৬ টাকা ৩০ পয়সায় নেমে আসে। গত দুই বছরে বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ার নিয়েও হয়েছে অস্বাভাকি গ্যাম্বলিং। ২০২১ সালে শুরুতে বেক্সিমকো লিমিটেডের ২০ টাকার শেয়ার রকেট গতিতে বাড়তে বাড়তে অক্টোবরে সর্বোচ্চ ১৮৫ টাকায় উঠে যায়। আবার সেটির দাম কমে ১৩১ টাকা ৭০ পয়সায় নেমে আসে। একই সময়ে ১২০ টাকার বেক্সিমকো ফার্মার শেয়ারের দাম ১০ মাসে আড়াইশ' টাকা ছাড়ায়। বর্তমানে ১৬৮ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। এভাবে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারে অস্বাভাবিক গ্যাম্বলিংয়ের মাধ্যমে মুনাফা তুলে নেয় বেশ কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্র। প্রতিটি বীমা কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের অর্ধেক পুঁজি নেই। আবার যারা মার্জিন লোন বা প্রান্তিক ঋণ নিয়ে শেয়ার কিনেছিলেন তারা সর্বস্ব হারিয়েছেন। অর্থাৎ ঋণের টাকা সমন্বয় করতে গিয়ে এখন অ্যাকাউন্ট শূন্য। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ ও রসায়ন খাতের ওরিয়ন ইনফিউশন লিমিটেডের শেয়ারদর সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মাত্র দেড় মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ৫শ' শতাংশের বেশি। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেনও বেড়েছে। তবে এ শেয়ারদর বৃদ্ধি ও অস্বাভাবিক লেনদেনের পেছনে অপ্রকাশিত কোনো মূল্যসংবেদনশীল তথ্য নেই বলে ডিএসইকে জানিয়েছে কোম্পানিটি। চলতি বছরের ২৮ জুলাইয়ের পর থেকেই ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে ওরিয়ন ইনফিউশনের শেয়ারদর। এ নিয়ে কোম্পানিটিকে গত মাসে তিনবার কারণ দর্শানো চিঠি দেয় ডিএসই। প্রতিবারই কোম্পানিটি জানিয়েছে, এর পেছনে অপ্রকাশিত কোনো মূল্যসংবেদনশীল তথ্য নেই। মঙ্গলবার ৫০ টাকার কাছাকাছি বেড়েছে শেয়ারটির দর। তিন মাসে ৮০ টাকার শেয়ারের দর এখন ৭০১ টাকা। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওরিয়ন গ্রম্নপের আরও দুটি কোম্পানির শেয়ারেও অস্বাভাবিক লেনদেন হচ্ছে। অন্য কোম্পানি ২টি হলো- বিকন ফার্মা এবং ওরিয়ন ফার্মা। এই তিন কোম্পানির মধ্যে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আইপিও থেকে অর্থ লোপাট ইউনাইটেড এয়ার, রিংশাইন, ফ্যামিটি টেক্স, এমারেল্ড অয়েল, সিএনএ টেক্সটাইলের মতো কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। কিছু মার্চেন্ট ব্যাংক, অডিট ফার্ম এবং একটি স্বার্থান্বেষী মহল এসব কোম্পানি তালিকাভুক্তির কাজে জড়িত। যাদের কাজই হলো, বাজারে কোম্পানি তালিকাভুক্ত করে অর্থ লোপাট। যদিও বর্তমান কমিশন বেশ কিছু লোকসানি ও বন্ধ কোম্পানি পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। এরপরেও বাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত অব্যাহত রয়েছে। পুঁজিবাজার থেকে গত দুই বছরে ৪৪টি কোম্পানি প্রায় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা মূলধন উত্তোলন করেছে। এসব কোম্পানি বুকবিল্ডিং, ফিক্সড প্রাইজ, রাইট ইসু্য, সুকুক ও বন্ডের মাধ্যমে এ অর্থ সংগ্রহ করেছে। ৪৪টি কোম্পানির মধ্যে বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে ৭টি, ফিক্সড প্রাইজ পদ্ধতিতে ১৭টি এবং ছোট মূলধনী ১০টি কোম্পানি এসএমই পস্ন্যাটফর্ম থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছে। এসব নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যেও নিম্নমানের কোম্পানি রয়েছে। বিশেষ করে এসএমই পস্ন্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন অনেকেরই। যেগুলো অদূর ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারীদের কান্নার কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভুয়া তথ্য দিয়ে শেয়ারদর বাড়ানো যখনই শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়ায় তখনই কিছু তালিকাভুক্ত কোম্পানি মিথ্যা তথ্য দিয়ে শেয়ারের দর বাড়ানোর চেষ্টা করে। লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা না থাকলেও অতিরিক্ত আয় দেখায়। কেউ কেউ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা দিয়েও বিনিয়োগকারীদের লাভের অংশ দিতে পারেনি। ফলে কোম্পানির পরিচালকদের নিয়েও অভিযোগ কম নয়। অতি সম্প্রতি বে-লিজিংয়ের আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর বিএসইসি তদন্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। বে-লিজিং কর্তৃপক্ষ ২০২১ সালের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর '২১) শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) দেখায় ২.৭৫ টাকা। তবে ১২ মাসে বা ২০২১ সালে এই মুনাফা তো দূরের কথা লোকসান দেখায় ৯৯ পয়সা। অর্থাৎ প্রথম ৯ মাসে ২.৭৫ টাকা মুনাফা হয়েছে শেষ ৩ মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর '২১) লোকসান হয়েছে ৩.৭৪ টাকা। বে-লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের ২০২১ সালের ব্যবসায় প্রান্তিকগুলোর আর্থিক হিসাবে অস্বাভাবিক উত্থান-পতনের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ লক্ষ্যে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ব্রোকারেজ হাউসের দুর্নীতি বাজার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে একটি গ্রম্নপ ব্রোকারেজ হাউস থেকে অর্থ লোপাটে নামে। গত এক বছরে তামহা সিকিউরিটিজ, বানকো সিকিউরিটিজ ও ফার্স্টলিড সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে এ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। এছাড়াও বেশ কিছু ব্রোকারেজ হাউসের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে। তামহা সিকিউরিটিজের মালিক ডুপিস্নকেট সফটওয়্যার ব্যবহার করে বিনিয়োগকারীদের সব শেয়ার বিক্রি করে দিলে ২০২১ সালের ২৯ নভেম্বর বিএসইসি সিকিউরিটিজ হাউসটির লেনদেন স্থগিত করে দেয়। পরে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডে যোগাযোগ করে জানা যায়, বিও হিসাবে কোনো শেয়ার নেই। একইভাবে বানকো সিকিউরিটিজের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে ডিএসই কর্তৃপক্ষ। বানকো সিকিউরিটিজে গ্রাহকদের সমন্বিত হিসাবে ৬৬ কোটি টাকার ঘাটতি পেয়েছে ডিএসই। যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রায় চলে গেছে। তাই ব্রোকারেজ হাউসটিকে বন্ধ ও তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। অন্যদিকে নকল সফটওয়্যার ব?্যবহার করে বিও হিসাবে থাকা সব শেয়ার বিক্রি করে ফার্স্টলিড সিকিউরিটিজ লিমিটেড ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বিনিয়োগকারীরা। অর্থ ফেরতের দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা। মুনাফা বেশি জরিমানা কম গত দুই বছরের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম মো. আবুল খায়ের হিরো। বাংলাদেশ ক্রিকেটের আরেক হিরো সাকিব আল হাসান। তারা যৌথভাবে সিরিয়াল ট্রেডিং করে শেয়ারের দর বাড়িয়েছেন এমন প্রমাণ পেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তারা মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ১১ কোটি টাকা জরিমানার মুখোমুখি হলেন। সঙ্গে হিরোর বাবা, স্ত্রী, বোন, শ্যালক এবং তার ব্যবসায়িক সহযোগীরাও পড়েছেন জরিমানার কবলে। বিএসইসি সূত্রে জানা যায়, বেশ কয়েক দিন ধরে শেয়ার কারসাজি করছেন অভিযুক্তরা। এদের মধ্যে পুঁজিবাজারের আলোচিত বিনিয়োগকারী মো. আবুল খায়ের হিরো এবং তার সহযোগীরা মিলে সাতটি কোম্পানির শেয়ারদর কারসাজির মাধ্যমে ৪৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা মুনাফা অর্জন করেছেন। কারসাজির ঘটনায় সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের দায়ে গত তিন মাসে তাদের জরিমানা মাত্র ১০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। গ্যাম্বলিং শনাক্ত হতে দেরি গ্যাম্বলিং যখন হয় ঠিক তখনই নিয়ন্ত্রক সংস্থা অনেকটা নীরব থাকে। যদিও তাদের কাছে দৈনন্দিন সার্ভিল্যান্সের সুযোগ রয়েছে। অস্বাভাবিক লেনদেন দেখে শাস্তি দিতে পারলে গ্যাম্বলিং বা জুয়া বন্ধ হতে পারে। কিন্তু বিএসইসি সেটি করতে পারছে না। বিষয়টি বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামও স্বীকার করেন, তিনি সম্প্রতি একটি সেমিনারে বলেন, যতক্ষণে না কারসাজি ধরা পড়ছে ততক্ষণে বিনিয়োগকারীদের সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে। নিষ্ক্রিয় স্টক এক্সচেঞ্জগুলো সাধারণত স্টক এক্সচেঞ্জকে বলা হয় দ্বিতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কিন্তু দেশের দুটি স্টক এক্সচেঞ্জ সেই কাজটি করতে ব্যর্থ হয়েছে। উভয় স্টক এক্সচেঞ্জের ব্রোকারেজ হাউসের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। একটি দুর্নীতিবাজ চক্রও কাজ করে স্টক এক্সচেঞ্জে। কিন্তু এ চক্রটি বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের কিছু পরিচালক ও কর্মকর্তাদের নাম আলোচনায় আসে। এ চক্রটির কারণে ডিএসইতে কোনো এমডি মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেন না। এছাড়াও দুর্নীতির অভিযোগে সিএসইর এমডিও চাকরি হারিয়েছেন। ফলে দুই স্টক এক্সচেঞ্জ চলছে এমডি ছাড়াই। প্রধান নির্বাহী না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। সংস্কার আর কুসংস্কার যাই বলা হোক না কেন, কালো বিড়ালকে অশুভ মনে করা হয়। তাই অনেকেই বলছেন, কালো বিড়াল তাড়াতে না পারলে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আসবে না। পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ যায়যায়দিনকে বলেন, বাজারে ওরিয়ন ইনফিউশনের শেয়ারের দর বাড়ছে বলে মনে করা হলেও আসলে কেউ না কেউ বাড়াচ্ছে। এটি অসুস্থ বাজারের লক্ষণ। যদি এখনই ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তাহলে আবারও বিনিয়োগকারীরা লোকসানে পড়বেন। ব্রোকারেজ হাউসের অনিয়মের বেশিরভাগই ঘটেছে সিডিবিএলকে পাশ কাটিয়ে ভুয়া সফটওয়্যার ব্যবহার করে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিডিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শুভ্র কান্তি চৌধুরী যায়যায়দিনকে বলেন, বিনিয়োগকারীদের মোবাইল ও ই-মেইলে সব ধরনের লেনদেনের তথ্য চলে যায়। যদি কোনো বিনিয়োগকারী মোবাইলে তথ্য না পান সঙ্গে সঙ্গে যদি সিডিবিএল বা স্টক এক্সচেঞ্জে যোগাযোগ করেন তাহলে আর কোনো সমস্যা হতো না। তাই বিনিয়োগকারীদের আরও সচেতন হতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আল আমিন যায়যায়দিনকে বলেন, বর্তমানে তালিকাভুক্ত ৩২৭টি কোম্পানির শেয়ারের মধ্যে ২০০টি কোম্পানির শেয়ারদর ফ্লোর প্রাইসে আছে। শুধু কিছু শেয়ার নিয়ে গ্যাম্বলিং হচ্ছে সেগুলোই বাড়ছে। এর মানে এই নয় এগুলো খুব ভালো শেয়ার। আবার অনেক ভালো শেয়ার ফ্লোর প্রাইসে পড়ে আছে। এ অবস্থায় চলতে থাকলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বীমা খাতের মতো আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যতদিনে বিএসইসি তদন্ত শেষ করে জরিমানা করবে ততদিনে বিনিয়োগকারীদের সর্বনাশ হয়ে যাবে। বাজার যখনই ঘুরে দাঁড়ায় তখনই কিছু স্মার্ট মানি নিয়ে বিনিয়োগকারী আসেন, তারা সাধারণ বিনিয়োগকারীকে ফাঁদে ফেলে টাকা নিয়ে যান। আল আমিন বলেন, '৮০ টাকার যে শেয়ারটি এখন ৭শ' টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে। গুজব ছড়ানো হচ্ছে, এর দাম এক হাজার টাকা হবে। এই গুজব দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে এই দামে শেয়ার বিক্রি করে চক্রটি বের হয়ে যাবে। তখন এই শেয়ার যদি আবার ৮০ টাকায় আসে। এই লোকসানের পুরোটাই সাধারণ বিনিয়োগকারীর মাথায় চাপবে। তাই কারসাজি চলাকালীন ব্যবস্থা না নিতে পারলে সাধারণ বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখনই এ ধরনের শেয়ার লেনদেন সাসপেন্ড করা উচিত।' বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম যায়যায়দিনকে বলেন, 'আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর ভালো কোম্পানি দেখে আইপিওর অনুমোদন দিয়েছি। অতীতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো যাতে ভালো লভ্যাংশ দেয় সেটিও মনিটর করা হচ্ছে। এমনকি বন্ধ কোম্পানিগুলোর উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য কাজ করছি। অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই বিনিয়োগকারীরা এর সুফল পাবেন।'
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে