রোববার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১৪ মাঘ ১৪২৯
রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদু্যৎ কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ

৯০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির তথ্য চেয়েছে আইএমএফ

এলডিসি থেকে উত্তরণে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি তুলে ধরল সরকার
যাযাদি রিপোর্ট
  ০৩ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
গত ১১ বছরে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদু্যৎ কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জের ৯০ হাজার কোটি টাকা সরকারের ভর্তুকির তথ্য চেয়েছে আইএমএফ। একইসঙ্গে আগামীতে এ প্রকল্পগুলো নিয়ে সরকারের কি পরিকল্পনা রয়েছে তাও জানতে চেয়েছে সংস্থাটি। অন্যদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে ২০২৬ সালের পর স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ পরবর্তী বাংলাদেশকে যে ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে, তা মোকাবিলায় গৃহীত রূপরেখা বা কর্মকৌশল জানতে চেয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির এশীয় ও প্যাসিফিক বিভাগের প্রধান রাহুল আনন্দের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদল গত ২৬ অক্টোবর থেকে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করছে। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার সচিবালয়ে বিদু্যৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে বিদু্যৎ বিভাগের সচিব মো. হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে এসব বিষয়ে জানতে চায় আইএমএফ। একইদিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও বৈঠক করে প্রতিনিধিদলটি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে নেতৃত্ব দেন। অতিরিক্ত সচিব ডবিস্নউটিও সেলের (মহাপরিচালক) মো. হাফিজুর রহমান বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বিদু্যৎ বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। বিদু্যৎ বিভাগ সূত্র জানায়, বর্তমানে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদু্যৎ কেন্দ্রগুলো দেশের অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে, এ বিষয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চেয়েছে আইএমএফ প্রতিনিধিদল। একই সঙ্গে এ খাতে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে বিদু্যৎ বিভাগের পক্ষে বলা হয়, যেসব রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদু্যৎ কেন্দ্রের সঙ্গে সরকার চুক্তি করেছিল সেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। এখন 'নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট' পদ্ধতিতে কিছু বিদু্যৎ কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। ফলে নতুন করে আর ক্যাপাসিটি চার্জের প্রয়োজন হবে না। বৈঠকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিকল্পনার বিষয়ে প্রতিনিধিদল জানতে চাইলে বিদু্যৎ বিভাগের পক্ষে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন গ্রহণযোগ্য নয়। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে পরিবেশের দূষণ কম হয় সে জন্য এ জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহীত করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বৈঠকের বিষয়ে বিদু্যৎ বিভাগ সচিব মো. হাবিবুর রহমান বলেন, 'বৈঠকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে আইএমএফ জানতে চেয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা তাদের জানানো হয়েছে। এছাড়াও বিদু্যতের সার্বিক পরিস্থিতি বিষয়েও তাদের সার্বিক ধারণা দেওয়া হয়েছে।' বিদু্যৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর বিদু্যৎ সংকট সমাধানের লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি ভাড়া ও দ্রম্নত ভাড়াভিত্তিক বিদু্যৎ কেন্দ্রের অনুমোদন দেয়। এ প্রক্রিয়ার জন্য ২০১০ সালে প্রণয়ন করা হয় 'বিদু্যৎ ও জ্বালানির দ্রম্নত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন'। শুরুতে দুই বছরের জন্য এ আইন করা হলেও পরে কয়েক দফায় সময় বাড়ানো হয়। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদু্যৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য টান পড়ছে দেশের রিজার্ভে। এতে করে ধ্বংস হচ্ছে অর্থনীতি। সমালোচিত এসব ভাড়াভিত্তিক বিদু্যৎ কেন্দ্র অনেক আগে বন্ধ করার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত বন্ধ করা যাচ্ছে না। অর্থনীতির ওপর বোঝা তৈরি করার পরও বারবার বাড়ানো হচ্ছে স্বল্পমেয়াদি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদু্যৎ কেন্দ্রের মেয়াদ। এসব বিদু্যৎ কেন্দ্রের কারণে দেশ আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট ১৮টি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদু্যৎ কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি কেন্দ্র 'নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট' নীতিতে চলছে। বাকি আটটি আগের নিয়মেই পরিচালিত হচ্ছে। অর্থাৎ এদের ক্যাপাসিটি চার্জসহ যাবতীয় খরচ দিতে হচ্ছে। এসব কেন্দ্র থেকে সরকার বিদু্যৎ না কিনলেও ভাড়াবাবদ অর্থ দিতে হয় সরকারকে। এ অর্থই হচ্ছে ক্যাপাটিসটি চার্জ। কোনো বিদু্যৎ না নিয়েই গত ১১ বছরে সরকার বিদু্যৎ কোম্পানিগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। এছাড়া সাধারণ বিদু্যৎ কেন্দ্রের গড়ে প্রতি ইউনিট বিদু্যৎ উৎপাদনে সরকারের খরচ হয় ৭ টাকা। আর ভাড়াভিত্তিক এসব কেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদু্যৎ উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ১৭ টাকা। অর্থাৎ ১০ টাকা বেশি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আইএমএফের বৈঠক আইএমএফ মিশন প্রতিনিধিরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চেয়েছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে বৈশ্বিক বাস্তবতায় নানারকম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আগে থেকেই এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করা না হলে উন্নয়নশীলে বাংলাদেশের অবস্থান টেকসই হবে না। আইএমএফ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা দেখতে চায়। এর জন্য সরকারের কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে তা জানার চেষ্টা করেছে মিশন প্রতিনিধিরা। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানি সুবিধা অব্যাহত রাখতে বিশেষ করে জিএসপি পস্নাস পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ কি পদক্ষেপ নিচ্ছে, সে বিষয়েও আলোচনা তোলেছে আইএমএফ। এছাড়া বাংলাদেশ কোন কোন দেশ ও অঞ্চলের সঙ্গে কোন ধরনের চুক্তি করতে যাচ্ছে এবং তার আলোচনা ও সম্ভাব্য অগ্রগতি কতটকু সেটিও জানতে চেয়েছে আইএমএফ। অন্যদিকে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ উৎপাদকদের সুরক্ষা দিতে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে ডবিস্নউটিওর বাউন্ড রেটের অতিরিক্ত ট্যারিফ আরোপ করেছে। এই ট্যারিফ রেট ডবিস্নউটিওর বাউন্ড রেট অনুযায়ী নামিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনাও সংস্থাটি জানতে চেয়েছে। বৈঠকে সংস্থাটির প্রতিনিধিরা পর্যবেক্ষণ দিয়ে আরও বলেছে, বৈশ্বিক সংকটে মানুষের ভোগ ও ব্যবহার চাহিদা দুটোই কমতে শুরু করেছে। এটা দীর্ঘায়িত হতে পারে। আইএমএফ মনে করে একক রপ্তানি পণ্য হিসেবে তৈরি পোশাকের উপর রপ্তানি আয়ের অতি নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। এ অবস্থায় রপ্তানি ঝুঁকি কমাতে তৈরি পোশাকের উপর নির্ভরতা কমিয়ে পণ্যের বহুমুখীকরণে সুনির্দিষ্ট পণ্যভিত্তিক কী ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে সেটিও জানতে চেয়েছে। একই ইসু্যতে আগামী তিন অর্থবছরে সরকার তৈরি পোশাক ও তৈরি পোশাক বহির্ভূত খাত থেকে কী পরিমাণ রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, সে তথ্য জানতে চেয়েছে আইএমএফ মিশন। এছাড়া বাংলাদেশে ব্যবসা করার খরচ বেশি। এই খরচ কমিয়ে আনতে অবকামাঠামোগত উন্নয়ন ও আইনি জটিলতা কাটাতে সরকারের পদক্ষেপও জানতে চায় আইএমএফ। জবাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এলডিসি উত্তরণে সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে আগামী তিন বছরমেয়াদি রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রার পরিকল্পনা শিগগিরই জানাবেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়া তৈরি পোশাকের উপর একক নির্ভরতা কাটিয়ে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং ট্যারিফ নামিয়ে আনা এবং ২০২৪ সালের মধ্যে ব্যবসা করার খরচ কমিয়ে আনতে ২৯ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পদক্ষেপ ও কর্মপরিকল্পনাও আইএমএফ মিশনকে জানায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে