বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯
walton1
এসএসসির ফল প্রকাশ

স্বপ্নজয়ের উচ্ছ্বাসে মাতোয়ারা

সারা দেশে পাসের হার ৮৭.৪৪ শতাংশ জিপিএ-৫ পেয়েছে ২,৬৯,৬০২ জন ১১ বোর্ডে মোট পাস করেছে ১৭,৪৩,৬১৯
যাযাদি রিপোর্ট
  ২৯ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের বাঁধভাঙা উলস্নাস। ছবিটি সোমবার ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে তোলা -যাযাদি
অপেক্ষা শেষে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। সোমবার ফল প্রকাশের পর বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে ভেসেছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে অভিভাবক, শিক্ষক ও স্কুল কর্তৃপক্ষও আনন্দে মেতে ওঠে। রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা গেছে, ফল ঘোষণার পর শিক্ষার্থীরা বোর্ডে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত ফল দেখে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার আনন্দ প্রকাশ করে তারা। এ সময় সন্তানের কাঙ্ক্ষিত ফল দেখে অভিভাবকরা আনন্দে কেঁদে ফেলেন। দলবেঁধে শিক্ষার্থীদের উলস্নাস ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো স্কুল ক্যাম্পাস। দীর্ঘ সাধনা-পরিশ্রমের পর কাঙ্ক্ষিত ফল পেয়ে আনন্দ উদযাপনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তারা। বিজয় চিহ্ন দেখিয়ে, ছবি আর সেলফি তুলে আনন্দ প্রকাশে ব্যস্ত ছিল তারা। এদিকে, নানা দুর্বিপাকে বিলম্বিত এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করেছে ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী, যা গতবারের চেয়ে কম। দীর্ঘ অপেক্ষার পর স্কুলের গন্ডি অতিক্রম করা এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে, যা উত্তীর্ণের মোট সংখ্যার ১৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এই হিসাবে এবার পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ পয়েন্ট। আর পূর্ণাঙ্গ জিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৮৬ হাজার ২৬২ জন। গত বছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেছিল রেকর্ড ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৮৩ হাজার ৩৪০ জন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোমবার সকালে তার কার্যালয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা সারেন। দুপুর ১টায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে সংবাদ সম্মেলন করে এবারের ফলের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। ২০২২ সালে ১১টি শিক্ষা বোর্ডে ১৯ লাখ ৯৪ হাজার ১৩৭ জন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক ও সমমানের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেয়, তাদের মধ্যে ১৭ লাখ ৪৩ হাজার ৬১৯ জন পাস করেছে। এর মধ্যে নয়টি সাধারণ বোর্ডে ৮৮ দশমিক ১০ শতাংশ পাস করেছে। মাদ্রাসা বোর্ডে ৮২ দশমিক ২২ শতাংশ পাস করেছে। এ বছর মাদ্রাসা বোর্ডে থেকে ২ লাখ ৬০ হাজার ১৩২ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ২ লাখ ১৩ হাজার ৮৮৩ জন পরীক্ষায় পাস করেছে। আর জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৫ হাজার ৪৫৭ জন। তাদের মধ্যে ছেলে শিক্ষার্থী ৭ হাজার ১৮৪ জন ও মেয়ে শিক্ষার্থী ৮ হাজার ২৭৩ জন। আর কারিগরি বোর্ডে ৮৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। এই বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৪৮ জন। উত্তীর্ণ হন ১ লাখ ৩০ হাজার ১৬৫ জন। ছেলেদের পাসের হার ৮৮.৮৪ শতাংশ আর মেয়েদের পাসের হার ৯১.৮০ শতাংশ। মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৮ হাজার ৬৫৫ জন। এদিকে, এবারও পাসের হার এবং জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা- দু'দিক দিয়েই সংখ্যায় এগিয়ে আছে মেয়েরা। ছাত্রদের পাসের হার যেখানে ৮৭ দশমিক ১৬ শতাংশ, সেখানে ছাত্রীদের মধ্যে ৮৭ দশমিক ৭১ শতাংশ পাস করেছে। মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় এবার ৯ লাখ ৯৮ হাজার ১৯৩ জন ছাত্র পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৮ লাখ ৭০ হাজার ৪৬ জন। আর ৯ লাখ ৯৫ হাজার ৯৪৪ জন ছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল, তাদের মধ্যে পাস করেছে ৮ লাখ ৭৩ হাজার ৫৭৩ জন। আর পূর্ণাঙ্গ জিপিএ, অর্থাৎ পাঁচে পাঁচ পাওয়া ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪৪৬ জন ছাত্রী এবং ১ লাখ ২১ হাজার ১৫৬ জন ছাত্র। চলতি বছর ৯টি সাধারণ বোর্ডে বিজ্ঞান বিভাগে ৯৭ দশমিক ০৯ শতাংশ ছাত্র ও ৯৭ দশমিক ০৮ শতাংশ ছাত্রী পাস করেছে। মানবিকে ৭৮ দশমিক ৪০ শতাংশ ছাত্র ও ৮২ দশমিক ৫৫ শতাংশ ছাত্রী এবং ব্যবসায় শিক্ষায় ৯১ দশমিক ০৫ শতাংশ ছাত্র ও ৯২ দশমিক ৯২ শতাংশ ছাত্রী উত্তীর্ণ হয়েছে। জানা গেছে, এ বছর ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৯০.০৩ শতাংশ। এই বোর্ডে পাসের হার গত বছরের চেয়ে কমেছে। গত বছর এ হার ছিল ৯৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। আর ময়মনসিংহে পাসের হার ৮৬.০৭ শতাংশ, রাজশাহীতে ৮৫.৮৮ শতাংশ, কুমিলস্নায় ৯১.২৮ শতাংশ, যশোরে ৯৫.০৩ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৮৭.৫৩ শতাংশ, বরিশালে ৮৯.৬১ শতাংশ, দিনাজপুরে ৮১.১৪ শতাংশ ও সিলেটে ৭৮.৮২ শতাংশ। দেশের বাইরের ৮টি কেন্দ্র থেকে মোট ৩৬৩ জন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৩৪৮ জন। সে হিসাবে কেন্দ্রগুলোতে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৯৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ। গতবার এই পাসের হার ছিল ৯৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অন্যদিকে, বিদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে এমন প্রতিষ্ঠান রয়েছে দুটি। বিদেশের ৮টি কেন্দ্র হলো- সৌদি আরবের জেদ্দায় বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, রিয়াদের বাংলাদেশ অ্যাম্বেসি স্কুল, ত্রিপোলির বাংলাদেশ কমিউনিটি স্কুল, কাতারের দোহায় বাংলাদেশ মাসহুর-উল-হক মেমোরিয়াল হাইস্কুল, দুবাইয়ের শেখ খালিফা বিন জায়েদ বাংলাদেশ ইসলামিয়া স্কুল, বাংলাদেশ ইসলামিয়া স্কুল, মানামার বাহরাইনে বাংলাদেশ স্কুল ও ওমানের বাংলাদেশ স্কুল। এদিকে, এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভেসেছে রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। পরীক্ষার ফল জানতে সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার পর থেকে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে বাড়তে থাকে ফলপ্রত্যাশী ও অভিভাবকদের উপস্থিতি। দুপুর ১টায় বিদ্যালয়টির নোটিশ বোর্ডে পরীক্ষার ফলের শিট টানিয়ে দেওয়া হয়। সেটি দেখে সঙ্গে সঙ্গেই উচ্ছ্বাস, আনন্দ আর হইহুলেস্নাড়ে মাতে পুরো আইডিয়াল প্রাঙ্গণ। ছেলেমেয়েদের ফলাফলে খুশি পরিবারের সদস্যরাও। দুপুর দেড়টা বাজতেই পুরো মাঠ ভরে যায় শিক্ষার্থী-অভিভাবকের উপস্থিতিতে। আশানুরূপ ভালো ফলে আনন্দের বন্যায় মেতে ওঠে আইডিয়ালের শিক্ষার্থীরা। দলবেঁধে উলস্নাস ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। সোমবার দুপুরে নিজ অফিসকক্ষে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কামরুন নাহার বলেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা অনেক পরিশ্রমের ফলে আবারও স্বাভাবিক পড়াশোনার জীবনে ফিরে এসেছে। আর তাদের ফিরে আসার প্রমাণ এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল। ভিকারুননিসা সূত্রে জানা গেছে, এবার প্রতিষ্ঠানটি থেকে মোট এসএসসি পরীক্ষার্থী সংখ্যা ২ হাজার ৩০৬ জন। এদের মধ্যে মোট পাস করেছে ২ হাজার ৩০১ জন। এছাড়া ফেল করেছে ৫ জন ও অনুপস্থিত ছিল ১৬ জন শিক্ষার্থী। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ হাজার ২৫ জন শিক্ষার্থী। শতকরা হিসাবে ৮৮.০১ শতাংশ শিক্ষার্থী এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি থেকে। অধ্যক্ষ কামরুন নাহার বলেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে আমাদের মেয়েরা স্কুলে এসেছে এবং পড়াশোনা শুরু করেছে। এর মধ্যে আবার অনেক মেয়ে ফিরে আসতে পারেনি। করোনার সময় অনলাইন ক্লাসের কারণে পরবর্তীতে মেয়েদের ক্লাসে এসে লেকচার শুনে লেখার অভ্যাসটা ভুলে গিয়েছিল। সবকিছু মিলিয়ে শিক্ষকদের চেষ্টায় তাদের এই সমস্যাগুলো সমাধান হয়েছে। এই ফলাফলের মাধ্যমে মেয়েরা ফিরে এসেছে। তারা ভালো ফলাফল করেছে। এদিকে, সাধারণত ফেব্রম্নয়ারি মাসে মাধ্যমিক পরীক্ষা হয়ে এলেও মহামারিতে শিক্ষাসূচি পাল্টে যাওয়ায় এ বছর সাড়ে চার মাস পিছিয়ে গত ১৯ জুন এ পরীক্ষা শুরুর দিন ঠিক হয়েছিল। পরে বিভিন্ন জেলায় বন্যার কারণে স্থগিত হওয়া সে পরীক্ষা শুরু হয় আরও তিন মাস পর, ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে। দিনাজপুর বোর্ডে প্রশ্নফাঁসের কারণে চার বিষয়ে নতুন সূচিতে পরীক্ষা নেওয়া হয়। তাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশ নিয়ে সংশয় তৈরি হলেও তা উতরে গেছেন সংশ্লিষ্টরা। মহামারিতে প্রস্তুতিতে ঘাটতি থাকায় এ বছরও পুনর্বিন্যস্ত ও সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচিতে সময় কমিয়ে দুই ঘণ্টায় পরীক্ষা নেওয়া হয়। নম্বর কমিয়ে বাংলা দ্বিতীয় পত্র, ইংরেজি প্রথম ও দ্বিতীয় পত্রে পরীক্ষা হয় ৫০ নম্বরে। এছাড়া ব্যবহারিক আছে এমন বিষয়ে ৪৫ নম্বরে ও ব্যবহারিক নেই- এমন বিষয়ে ৫৫ নম্বরের পরীক্ষা হয়। ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং বিজ্ঞান- এসব বিষয়ে পরীক্ষা না নিয়ে সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে