রোববার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১৪ মাঘ ১৪২৯

৬ জঙ্গির ছবি প্রকাশের পরই দু'জনকে ছিনতাই!

ঘটনা দু'টির মধ্যে যোগসূত্রের আভাস হ আট জঙ্গির কেউ গ্রেপ্তার হয়নি হ আরও এক পুলিশ সদস্য বরখাস্ত
গাফফার খান চৌধুরী
  ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০
৬ জঙ্গির ছবি প্রকাশ করে তাদের ধরিয়ে দেওয়ার ঘোষণার তিন দিন পরেই ঢাকার সিএমএম আদালত চত্বর থেকে দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। দুইটি ঘটনার মধ্যে গভীর যোগসূত্র থাকতে পারে। জঙ্গিরা তাদের নেটওয়ার্ক ও শক্তিমত্তার জানান দিতেই ঘটনাটি ঘটিয়েছে বলে তদন্তকারীদের ধারণা। এদিকে, ৬ জঙ্গিকে ধরিয়ে দিতে পুলিশের পক্ষ থেকে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। আর ছিনিয়ে নেওয়া দুই জঙ্গিকে ধরিয়ে দিতে বিশ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ। অন্যদিকে, জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনায় আরও এক পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এই নিয়ে ৮ জন পুলিশ সদস্য বরখাস্ত হলেন। বুধবার এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৮ জঙ্গির কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। পুলিশের এন্টি টেররিজম (এটিইউ) সূত্র বলছে, গত ১৬ নভেম্বর ৬ জঙ্গির রঙিন ছবিসহ নাম প্রকাশ করা হয়। তাদের ধরিয়ে দিতে এবং তাদের সম্পর্কে তথ্য দিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এ সংক্রান্ত একটি হটলাইন নম্বর খোলা হয়। এছাড়া ফেসবুক পেজ ও ইমেল নম্বরও দেওয়া হয়। তথ্যদাতার সব তথ্য গোপন রাখা হবে বলেও ঘোষণায় বলা হয়। প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি মোতাবেক, ওই ছয় জঙ্গি হলেন- মো. আবু জায়িদ (৪০), শিবলি আহম্মেদ (৪৫), মো. ইমাদুল আমিন (৪৩), মো. ফয়সাল (২৬). আব্দুর রহমান (৩০) ও হাফিজ আল রাজি (৩৫)। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, তারা ঢাকার গুলশান মডেল থানায় ২০২০ সালের ১৯ অক্টোবর সন্ত্রাস বিরোধী ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়েরকৃত ২৪ নম্বর মামলার পলাতক আসামি। পলাতক জঙ্গিদের সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা থাকলে এটিইউকে জানাতে বিশেষ অনুরোধ করা হয় দেশবাসীর প্রতি। এছাড়া নিজের নাম পরিচয় গোপন রেখেও পলাতক জঙ্গিদের সম্পর্কে ইনফর্ম টু এটিইউ মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে তথ্য জানানো যাবে। এটিইউ-এর মিডিয়া অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস উইংয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আসলাম খান জানান, ছয়জনই নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সদস্য। সংগঠনটিকে ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার। জঙ্গি সংগঠনটি দেশে ভীতি ও অস্থিরতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে। তারা দেশ ও জনগণের শত্রম্ন বলে আখ্যায়িত করা হয় বিজ্ঞপ্তিতে। জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করা গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, হুজি, জেএমজেবি ও জেএমবির কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে পড়লে দেশে নব্য জেএমবি ও হিযবুত তাহরীরের আত্মপ্রকাশ ঘটে। নব্য জেএমবি ও হিযবুত তাহরীর নিষিদ্ধ হওয়ার পর দলটির সদস্যরা আনসারুলস্নাহ বাংলা টিম নামে সংগঠিত হয়। তারা দেশে বস্নগার, লেখক, প্রকাশকসহ প্রগতিশীল ব্যক্তিদের হত্যা করা শুরু করে। পরবর্তীতে এসব জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা আনসার আল ইসলাম নামে অপতৎপরতা শুরু করে। সূত্রটি বলছে, হিযবুত তাহরীরের ছয় জঙ্গির ছবি প্রকাশ করে তাদের ধরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। যা তাদের তৎপরতায় প্রকাশ পায়। তারা অনলাইনে একের পর এক সম্মেলন করতে থাকে। জঙ্গিরা নিজেদের নেটওয়ার্ক ও শক্তিমত্তার জানান দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। যদিও জঙ্গিরা আগ থেকেই সক্রিয় ছিল। কারণ ২০১৪ সালের ২৬ ফেব্রম্নয়ারি ফিল্মিস্টাইলে জঙ্গিরা গাজীপুরের কাশিমপুর কারগার থেকে ময়মনসিংহের ত্রিশালে নেওয়ার পথে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বোমারু মিজানসহ তিন জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয়। এরপর আবারও আলোচনায় আসে জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক ও শক্তিমত্তার বিষয়টি। দায়িত্বশীল একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যায়যায়দিনকে জানান, ছয় জঙ্গির ছবি প্রকাশের তিন দিন পরেই খোদ ঢাকার সিএমএম আদালত চত্বর থেকে দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয় তাদের সহযোগীরা। ছিনিয়ে নেওয়া দুই জঙ্গি হলেন- মো. মইনুল হাসান শামীম ওরফে সিফাত ওরফে সামির ওরফে ইমরান (২৪) ও আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে শাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে শাহাব (৩৩)। তাদের ধরিয়ে দিতে প্রত্যেককে ১০ লাখ করে ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। দায়িত্বশীল ওই কর্মকর্তা বলেন, এতে করে জঙ্গিদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ও শক্তিমত্তা থাকার বিষয়টি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে। দুইটি ঘটনার মধ্যে গভীর যোগসূত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের নেটওয়ার্ক শক্তিশালী থাকার কারণেই বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা নাগাদ ৮ জঙ্গির কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনায় ঘটনার দিন রাতেই ঢাকার কোতোয়ালি থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলায় আদালতে হাজির করা ১২ জঙ্গিকে আসামি করা হয়। আসামিদের মধ্যে ছিনিয়ে নেওয়া দুই জঙ্গিও আছেন। অপর ১০ জনকে দশ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) বিভাগ। সিটিটিসি সূত্রে জানা গেছে, মামলাটির তদন্তের ধারাবাহিকতায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে মাহমুদ আলম নামে আরও এক পুলিশ সদস্যকে বুধবার সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এই নিয়ে আট পুলিশ সদস্য বরখাস্ত হলেন। তারা হলেন- সিএসএম আদালতের হাজতখানার কোর্ট ইন্সপেক্টর মতিউর রহমান, হাজতখানার ইনচার্জ পুলিশের এসআই নাহিদুর রহমান ভুইয়া, আসামিদের আদালতে নেওয়ার দায়িত্বরত পুলিশের এটিএসআই মহিউদ্দিন, কনস্টেবল শরিফ হাসান ও আব্দুস সাত্তার, জয়নাল, মাহমুদ আলম ও ঘটনার সময় আহত চিকিৎসাধীন পুলিশ কনস্টেবল আজাদ।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে