মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯
walton1

গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে এগিয়ে এমবাপে

ম ক্রীড়া ডেস্ক
  ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০
মাত্র ১৮ বছর বয়সে বিশ্ব সেরার মঞ্চ রাঙিয়েছিলেন ফ্রান্সের ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপে। রাশিয়া বিশ্বকাপে পেয়েছিলেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ। মাঝের চার বছরে তিনি আরও পরিণত হয়েছেন। তাইতো কাতার বিশ্বকাপে তিনি আরও নিখুঁত এবং ভয়ংকর। চলতি ফুটবল বিশ্বকাপে দারুণ ছন্দে রয়েছেন এমবাপে। এবারের আসরে ইতোমধ্যে পাঁচ-পাঁচটি গোলও করেছেন ফরাসি এই তরাকা ফুটবলার। আর তাই গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন এমবাপে। গ্রম্নপ পর্বের প্রথম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দলের শেষ গোলটি করেন এমবাপে। ডেনমার্কের সঙ্গে পরের ম্যাচের সুর বেঁধে দেন জোড়া গোলে। আর তৃতীয় ম্যাচে বদলি নেমে অবশ্য তেমন কিছু করতে পারেননি। তবে শেষ ষোলোয় আবার ঝলক দেখান এমবাপে। গোল করে ও করিয়ে পোল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের নায়ক তিনিই। তাইতো কাতার বিশ্বকাপে যেন মহানায়ক হওয়ার পথে দুর্বার গতিতে ছুটছেন ২৩ বছর বয়সি ফরাসি এই ফরোয়ার্ড। এবারের আসরে পাঁচটি গোল করে গোলদাতার শীর্ষে আসনে বসেছেন এমবাপে। আর সেখানে ৩ গোল নিয়ে ফরাসি ফরোয়ার্ডের পর দ্বিতীয় স্থানে আছেন আটজন। স্পেনের আলভারো মোরাতা, ইংল্যান্ডের বুকায়ো সাকা ও মার্কসর্ যাশফোর্ড, আজেন্টিার অধিনায়ক লিওনেল মেসি, নেদারল্যান্ডসের কোডি গাগপো, ইকুয়েডরের এনার ভ্যালেন্সিয়া, ফ্রান্সের অলিভার জিরুদ এবং ব্রাজিলের রিচার্লিসন। তবে দ্বিতীয় পর্বে উঠতে না পারায় ইকুয়েডরের ভ্যালেন্সিয়ার আর খেলা হচ্ছে না। সেখানে এমবাপে স্পর্শ করার সুযোগ পাচ্ছেন মেসি, জিরুদ, রিচার্লিসন, গাকপো, সাকা ওর্ যাশফোর্ডরা। এবারের আসরে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৫টি গোল করার পাশাপাশি দু-দুটো গোলে দারুণ সহায়তা করেছেন ফরাসি ফরোয়ার্ড এমবাপে। রাশিয়া বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জেতা ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেন এবারের আসরে এখন পর্যন্ত একটি মাত্র গোল করেছেন। তবে গোলের সহায়তায় এগিয়ে আছেন ইংলিশ অধিনায়ক। কেন এখন পর্যন্ত তিনটি গোলে সহায়তা করেছেন। এদিকে পোল্যান্ডের বিপক্ষে গত রোববার জোড়া গোল করায় বিশ্বকাপে মোট ৯টি গোল হয়ে গেছে এমবাপের। তিনি আগের বিশ্বকাপে করেছিলেন চারটি গোল। এবার বাকিদের থেকে অন্তত দু'টি গোলে এখনই এগিয়ে রয়েছেন। বিশ্বকাপে সবচেয়ে কম বয়সে আট গোল করার নজির এত দিন ছিল পেলের। ১৯৬৬ সালে ২৬ বছর বয়সে অষ্টম গোলটি করেছিলেন তিনি। এমবাপে সেই কাজ করে ফেলেছেন ২৩ বছর বয়সেই। গতবারের বিশ্বকাপে তিনি সবচেয়ে কম বয়সে ফাইনালে গোল করার ক্ষেত্রে পেলের পরেই ছিলেন। এবার ব্রাজিলের কিংবদন্তিকেই পেরিয়ে গেলেন। ম্যারাডোনাকেও ছাড়িয়ে গেছেন এমবাপে। চারটি বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার মোট আটটি গোল রয়েছে। তার থেকে অনেক কম বয়সে সেই নজির পেরিয়ে গেছেন এমবাপে। চার বছর আগেই তিনি পেয়েছেন বিশ্বকাপ জয়ের অবিস্মরণীয় স্বাদ। রাশিয়া আসরে গোলের আনন্দে ডানা মেলেছিলেন চারবার। আর এবার চার ম্যাচেই জালের দেখা পেয়েছেন পাঁচবার। চলতি বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় সৌরভ ছড়ানো এই ফরাসি ফরোয়ার্ডের ধারেকাছে নেই কেউ। তিনটি করে গোল নিয়ে এই তালিকায় পরের সারিতে আছে মোট আটজন; এর মধ্যে আছেন তারই পিএসজি সতীর্থ লিওনেল মেসির মতো মহাতারকা। আছেন মার্কাশর্ যাশফোর্ড, অলিভার জিরুদ, আলভারো মোরাতা, বুকায়ো সাকো, কোডি গাকপো ও ব্রাজিলের রিচার্লিসন। তিন গোল আছে এনার ভালেন্সিয়ারও, কিন্তু ইকুয়েডর গ্রম্নপ পর্ব থেকে ছিটকে যাওয়ায় তার এগিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ। রাশিয়ার আসরে গ্রম্নপ পর্বে পেরুর বিপক্ষে গোল করে শুরু হয়েছিল কিলিয়ান এমবাপের পথচলা। পরে নকআউট পর্বের মহারণে করেন তিন গোল। শেষ ষোলোয় দুইবারের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার জালে বল পাঠান দু'বার। প্রথম শিরোপার স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকা ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে রাশিয়ার মস্কোর ফাইনালেও পান জালের দেখা। ফ্রান্সের ৪-২ ব্যবধানের জয়ে শেষ গোলটি করেন ফ্রান্সের 'কুখ্যাত' শহরতলি বঁদি থেকে উঠে আসা এই ফরোয়ার্ড। প্যারিসের উত্তর-পূর্বে ১০ কিলোমিটার দূরের পিছিয়ে থাকা জনপদ বঁদি একসময় পরিচিত ছিল দাঙ্গা আর কলহের কারণে। ২০০৫ সালের দাঙ্গায় ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল এমবাপের বেড়ে ওঠার আঙিনাও। তখন তার বয়স মাত্র সাত বছর। এই জনপদটি বদলে যায় এমবাপের জাদুতে। ২০১৮ বিশ্বকাপের পর ঘরের ছেলেকে উৎসব-উচ্ছ্বাসে বরণ করে নেয় তারা। দেয়ালে সাঁটানো হয় এমবাপের ঢাউস ছবিতে, তাতে লেখা থাকে বদলে যাওয়ার বার্তা 'সিটি অব পসিবিলিটিস', অর্থাৎ 'সম্ভাবনার শহর।' বঁদির দূষিত বাতাস থেকে ছেলেকে আগলে রেখেছিলেন বাবা-মা। এমবাপের মা ছিলেন সফল হ্যান্ডবল খেলোয়াড়। বাবা উইলফ্রেড ছিলেন ফুটবল কোচ, ফুটবলার হিসেবে নিজে যে উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেননি, ছেলেকে দিয়ে সে চূড়া ছুঁতে চেয়েছিলেন তিনি। ছেলেরও ছিল ফুটবলের প্রতি প্রেম। এতটাই যে, উইলফ্রেড ছেলের শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে বলেছিলেন, 'ফুটবল খেলতে তো বটেই, টানা চার-পাঁচটি ম্যাচও সমান মনোযোগ নিয়ে দেখত এমবাপে।' এখন তার ছেলের ম্যাচ দেখে সবাই! আর কাতারে এসেও দেখিয়ে চলেছে এমবাপে, জাত চেনাচ্ছেন প্রতি ম্যাচে। গতি, স্কিল, ড্রিবলিং এবং কার্যকারিতার মিশেলে নিজেকে মেলে ধরছেন। সবশেষ পোল্যান্ড ম্যাচে অলিভার জিরুদকে দিয়ে গোল করানোর পর নিজেও উপহার দিয়েছেন দারুণ দু'টি গোল। ওই দিনের ম্যাচের ৭৪তম মিনিটে ডান দিক থেকে উসমান ডেম্বেলের পাস ধরে বক্সের একটু ভেতরে ঢুকে জায়গা বানিয়ে ডান পায়ের নেওয়া শট ওপরের কোণা দিয়ে জাল খুঁজে নেন। আর যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে ব্যবধান আরও বাড়ান তিনি। মার্কাস থুরামের পাস বক্সের ভেতর কোনাকুনি জায়গায় পান। দুই খেলোয়াড়ের মাঝ দিয়ে ডান পায়ের শটে দূরের পোস্ট দিয়ে লক্ষ্যভেদ করেন। আর এই ম্যাচে দু'টি রেকর্ড নিজের করে নিলেন এমবাপ। বিশ্বকাপে নিয়ে তার গোল হলো ৯টি। বয়স ২৪ বছর হওয়ার আগে বিশ্ব সেরার মঞ্চে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ডের পাতায় কিংবদিন্ত পেলেকে (৭টি) ছাড়িয়ে এককভাবে চূড়ায় বসলেন তিনি। ভেঙে দিলেন পর্তুগিজ গ্রেট ইউজেবিওর সবচেয়ে কম বয়সে বিশ্বকাপের আট গোলের রেকর্ডও। ২৪ বছর ১৮২ দিন বয়সে ৮ গোল করেছিলেন ইউজেবিও। এমবাপে রেকর্ডটি নিজের করে নিলেন মাত্র ২৩ বছর ৩৪৯ দিন বয়সে। ব্যক্তিগত অর্জন ছাপিয়ে তার একমাত্র লক্ষ্য ফ্রান্সকে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতান। পোল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের পর বিশ্বকাপ নিয়ে নিজের স্বপ্নের কথা শোনান এমবাপে, 'আমি এই বিশ্বকাপে বুঁদ হয়ে আছি। এটি আমার স্বপ্নের প্রতিযোগিতা। আমি এই প্রতিযোগিতা ঘিরেই পুরো মৌসুমের পরিকল্পনা সাজিয়েছি। বিশ্বকাপ জেতার জন্য নিজেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে পুরোপুরিভাবে প্রস্তুত করেছি, নিজের জন্য আমি এটাকেই লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি, যদিও এটি এখনো অনেক দূরে। একমাত্র লক্ষ্য হলো বিশ্বকাপ জেতা, বাকি সব গৌণ।' বঁদির সেই ছোট্ট এমবাপে আগামী ১৮ ডিসেম্বর ফাইনালের দুই দিন পর ২৪ বছর পূর্ণ করবে। ছেলেবেলায় ফুটবল খেলা ছাড়া যার শখ ছিল গান গাওয়া, বাঁশি বাজানো। গান ও বাঁশি শেখার স্কুলে পড়তেও গিয়েছিলে তিনি। কিন্তু উইভেস মঁতাঁদ কিংবা জ্যাঁ-জাকুইস গোমাঁ মতো গায়ক হয়ে ওঠা হয়নি তার। ফুটবলারই হতে চেয়েছিলেন তিনি। আর বল পায়ে এমবাপেও তো মঁতাঁদ বা গোমাঁ! তার গোলে জড়িয়ে মঁতাঁদের মর্মস্পর্শী গানের হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া বাঁশির সুর, মাঠজুড়ো গতিময় ছুটে চলার পরতে পরতে যে বাজে গোঁমার পপ মিউজিকের ঝংকার। বল পায়ে গোলের ফুল ফুটিয়ে মরুভূমির বিশ্বকাপ এরই মধ্যে মাতিয়ে ফেলেছেন এমবাপে। আগামী ১৮ ডিসেম্বরের ফাইনাল পর্যন্ত ফ্রান্স ছুটলে, এই তরুণ বয়সেই তিনি কত উঁচুতে পৌঁছাবেন, কে জানে!
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে