সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
walton

ছাত্রদের আন্দোলনের ঢেউ সাধারণ মানুষের মনেও লাগে

যাযাদি ডেস্ক
  ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০০:০০

মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলনে উত্তাল ফেব্রম্নয়ারিতে প্রদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। পতাকা দিবস সফল করে তুলতে ইতোমধ্যে ছাত্রদের আন্দোলনের ঢেউ পৌঁছে যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। পূর্ববঙ্গের সব রাস্তা তখন ঢাকায় এসে এক বিন্দুতে মিশেছে। জেলা শহর, মহকুমা শহর থেকে বিস্তারিত খবর জানতে লোক আসছে, লোক যাচ্ছে। এক কথায় সাংগঠনিক তৎপরতা চলছে দেশজুড়ে।

এদিকে পতাকা দিবস সফল করে তুলতে যুবলীগ এবং ছাত্রাবাসের তরুণ কর্মীরা বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ শহর এ কাজের মধ্যমণি। নারায়ণগঞ্জ একুশ নিয়ে তখনও একপা এগিয়ে। শামসুজ্জোহা, সফি হোসেন, মমতাজ বেগম ও অনুরূপ কয়েকজনের নেতৃত্বে উত্তাল। ঢাকার মতোই স্কুলের কম বয়সি ছাত্রছাত্রীরাও পিছিয়ে নেই। তারা স্কুল ছেড়ে পথে, মাঠ-ময়দানের জনসভায় হাজির। ঢাকার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক যোগাযোগ বরাবরই গভীর। সেখানকার পোস্টার-দেয়াললিপি একুশের জন্য ডাক পাঠাচ্ছে ছাত্রছাত্রী, তরুণ ও সর্বজনতার দিকে। শ্রমিক অঞ্চল নারায়ণগঞ্জের প্রত্যাশা শ্রমজীবী মানুষও এ আন্দোলনের পক্ষে সাড়া দেবেন, ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়াবেন। ভাষার প্রশ্নটা তাদের জন্যও তো কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

পতাকা দিবসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঢাকায় পোস্টার লেখার ধুম পড়ে গিয়েছিল। শুধু চারুকলার ছাত্র, ইমদাদ বা আমিনুলই নয়, তাদের সঙ্গী বেশ কয়েকজন এ কাজে যেমন ব্যস্ততা দেখিয়েছেন তেমনি মেডিকেল কলেজের ছাত্র বদরুল, জিয়া হাসান, নুরুল ইসলামসহ কারও কারও আঙুলে চেপে বসে রয়েছে লালকালির ছোপ, লাল বর্ণমালার বিজয় নিশ্চিত করতে। এ কাজে তৎপর হয়ে ওঠে ঢাকা

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রছাত্রীও। ঢাকার সিদ্ধান্ত, বেলতলার আহ্বান আর সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সমর্থনে প্রদেশজুড়ে একুশের প্রস্তুতি, যত দিন যাচ্ছে ততই চলছে জোর কদমে।

সুদূর উত্তরাঞ্চলের রংপুর, নীলফামারী, ডোমার, রাজশাহী, দিনাজপুর থেকে সর্বদক্ষিণে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল, ফরিদপুর, মাগুরা আর উত্তর-পূর্বে সিলেট, ময়মনসিংহ এবং মধ্যখানে কুমিলস্না, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-আন্দোলিত এক বিশাল ক্যানভাস। বাদ যায়নি উত্তপ্ত পাবনা, বগুড়া, যশোর বা খুলনা। এ ছাড়াও মহকুমা শহর থেকে থানা-সব শিক্ষায়তনে এ আহ্বানে সাড়া পড়ে। দেশের সব কয়টা সাপ্তাহিক তাদের প্রতিবেদনে দেশব্যাপী বিক্ষোভ চেতনার চিত্র তুলে ধরে রিপোর্ট প্রকাশ করে।

মূলত একুশের আগেই একুশের চেতনার আত্মপ্রকাশ হয় বাংলা ভাষাভাষীদের হৃদয়ের উপলব্ধি থেকে। এই উপলব্ধি যেমন মাতৃভাষা নিয়ে মমতার, তেমনি মাতৃভূমিকে ঘিরে ভালোবাসার। কোথায় পাহাড়ি সাতকানিয়া আর কোথায় মাদারীপুর বা মেঘনা পারের চাঁদপুর- সর্বত্র অস্থিরতা। এ সময়ের দু'টি ঘটনা একুশের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। প্রথমত, মওলানা ভাসানীর সাংগঠনিক সফর এবং তা জেলা থেকে মহকুমায়, এমনকি তার রাজনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে থানা বা দূর প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সরকারবিরোধী এ প্রচার জনমানসে প্রভাব ফেলেছে। স্বভাবতই একুশের আহ্বানে মানুষের পক্ষে সাড়া দেওয়া সহজ হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত, বন্দি মুক্তি নিয়ে, সরকারি অন্যায় ও জুলুম নিয়ে প্রতিবাদও জনচিত্তে দাগ কাটে। মুসলিম লীগের দুঃশাসন সম্বন্ধে মানুষ ক্রমশ সচেতন হতে থাকে। ভাসানীর ওই সাংগঠনিক সফর পুরো একুশের কর্মসূচি পালনের ভিত তৈরি করে। ছাত্রদের ভাষাবিষয়ক আন্দোলনের দিকে জনসাধারণেরও নজর পড়ে। ছাত্র-যুব নেতাদের সাংগঠনিক ঘাটতি এভাবে পূরণ হতে থাকে। এভাবে ২১ ফেব্রম্নয়ারির কর্মসূচি ঘিরে একটি পরিপূর্ণ প্রতিবাদী দিন হিসেবে ফুটে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হতে থাকে।

সূত্র : আবদুল হক, ভাষা-আন্দোলনের আদি পর্ব, ঢাকা, ১৯৭৬; বদরুদ্দীন উমর, পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, ১ম খন্ড, ঢাকা, ১৯৭৯।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে