বুধবার, ২৪ জুলাই ২০২৪, ৮ শ্রাবণ ১৪৩১

রাজধানীতে গরুর চড়া দাম, হাটে বিক্রি কম

চাহিদা বেশি ছোট-মাঝারির
যাযাদি রিপোর্ট
  ১৫ জুন ২০২৪, ০০:০০
রাজধানীর খিলক্ষেত ৩০০ ফিট রোড এলাকার একটি হাট থেকে গরু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন ক্রেতা -যাযাদি

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকায় কোরবানির পশুর হাটগুলোতে শুক্রবার সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বেচাকেনা সেভাবে জমে ওঠেনি। এ দিন অনেক ক্রেতাই হাটে ঘুরে গরু, ছাগল ও মহিষসহ বিভিন্ন পশু দেখে দাম যাচাই করেছেন। তাদের কেউ কেউ দাম শুনে কোনো কথা না বলেই চলে যাচ্ছেন। আবার কেউবা 'ব্যাটে-বলে' দাম মিলে যাওয়ায় গরু কিনে বাড়ি ফিরেছেন। তবে আজ থেকে হাট পুরোপুরি জমজমাট হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুক্রবার ঢাকার গাবতলী হাটে আসা সালমান রহমান নামের এক ক্রেতা বলেন, 'দাম শুনলে মনে হয় তারা বিক্রির জন্য দাম চাচ্ছে না। এত বেশি দাম চাচ্ছেন যে পাল্টা দামও বলা যাচ্ছে না।' যেই গরুর দাম ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছে, তা বড়জোর ১ লাখ ২০ হাজার টাকা হতে পারে বলে ধারণা এই ক্রেতার।

একই হাটে গরু বিক্রেতা আবদুলস্নাহ সাদ অবশ্য বলেন, তিনি বেশি দাম চাননি। অল্প লাভ হলেই ছেড়ে দিচ্ছেন। এই হাটে আসা ক্রেতাদের মনোভব এবার কেমন যেন হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শুক্রবার বিকেলে ওই হাটে দেখা যায়, দাম শুনে পালটা দাম না বলে চলে যাওয়া ক্রেতার সংখ্যা বেশি। বেলা তিনটা পর্যন্ত ক্রেতার সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। বিকেল চারটা থেকে হাটে ক্রেতা আসতে শুরু করে। তবে দাম বেশি হওয়ার কারণে বিক্রি হচ্ছে কম।

এদিকে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাটগুলোতে কোরবানির পশু নিয়ে এসেছেন ব্যাপারীরা। হাটে ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেশি। অন্যদিকে ঢাকার অধিকাংশ বাসিন্দাদের কোরবানির পশু রাখার জায়গা নেই। সেইসঙ্গে পশুটির যত্ন করার লোকের অভাবের কারণে অনেকেই ইচ্ছা থাকলেও আগে পশু কিনতে পারছেন না। তারা ঈদের দু'দিন বা আগের দিন পশু কিনবেন বলে জানিয়েছেন।

শুক্রবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে ঢাকার গাবতলী পশুর হাটে দেখা গেছে, বিক্রেতারা পশুকে ভালো করে পছন্দের খাবার খাওয়াচ্ছেন। সাবান-শ্যাম্পু আর পানি দিয়ে ধুয়েমুছে পরিষ্কার করছেন পশুর শরীর। আবার কোন কোন বিক্রেতাকে কোরবানির পশুকে নানা সাজে সাজাতে দেখা গেছে।

এমনই এক বিক্রেতা ইসমাইল হোসেন বলেন, আজ শুক্রবার, আশা করছি, বিকালের

মধ্যেই হাট জমবে। তাই বিক্রির জন্য আনা পশুগুলোকে ধুয়েমুছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে সাজিয়ে রাখছি। যাতে সহজেই ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়।

মাঝারি সাইজের তিনটি গরু নিয়ে এসেছেন ঝিনাইদহ থেকে। তিনি বলেন, 'হাটে এসেছি দুই দিন ধরে। দুই দিনে তেমন কোনো দরদাম হয়নি। যা হয়েছে, সেই দামে বিক্রি করলে পোষাবে না। যে কারণে 'বেখাপ্পা' দাম চাইছি না। কারণ বেশি দাম চাইলে, ক্রেতা দাম বলা তো দূরের কথা, শুনেই সোজা হাঁটা দেন। যে কারণে কোন কোন গরু ভেদে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতে রাখছি। তবে আমার গরু যেহেতু মাঝারি সাইজের তাই দাম বাড়তি হাতে রেখেছি ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। বৃহস্পতিবার থেকেই অধিকাংশ অফিস আদালত ছুটি হয়ে গেছে। তাই শুক্রবার বা শনিবার অবশ্যই কোরবানির পশু বেশি বিক্রি হবে বলে আশা করছি।'

পাশেই একটি মাঝারি আকারের গরু বিক্রি হলো। গরুটিকে ছোট পিকআপে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ক্রেতা রুমেল আহমেদ বলেন, ভাই গরুটি ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় কিনেছি। পশুর দাম সহনীয় পর্যায়ে এসেছে।

তিনি বলেন, গরুটি দুই দিন আগে বাজারে এসেছে। গরুটি পছন্দ হয় আমাদের। কিন্তু দামে মিলছিল না। বিক্রেতা দেশীয় জাতের গরুটি আড়াই লাখ টাকায় বিক্রি করবেন বলে ঠিক করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত আশাতীত ক্রেতা না পেয়ে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। আমরাও আনন্দের সঙ্গে বাজেটের মধ্যে পেয়ে গেছি। তাই এখন খুশি মনে বাড়ি ফিরছি। বাড়িতে গরু রাখার জায়গা আছে। তাই আগাম কিনলাম। বাচ্চারা দেখে খুশি হবে।

গরুটির বিক্রেতা সবুর বলেন, এর চেয়ে বেশি দাম আর হয়নি। এছাড়া গরু বিক্রি করে দেওয়ার আরও কিছু কারণের কথাও জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিদিন গরুটির পেছনে এক থেকে দেড় হাজার টাকা খরচ আছে। আমাদের থাকা খাওয়া আছে। এছাড়া হাটে গরু তোলার পর থেকেই প্রতিদিন শুধু গরু নয় প্রায় প্রতিটি কোরবানির পশুরই ওজন কমতে থাকে। হাটে তোলার পর কোরবানির পশুকে যতটা সতেজ দেখা যায়, দিন যত যেতে থাকে, পশুর সতেজতা তত নষ্ট হতে থাকে। প্রতিটি গরুর ওজন কম করে হলেও দেড় থেকে দুই কেজি করে কমতে থাকে। এছাড়া ভ্যাপসা গরমে অনেক পশুই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। অনেকেই সঙ্গে করে টেবিল ফ্যান এনেছেন। অনেকে আবার হাত পাখা দিয়ে বাতাস করছেন।

তিনি আরও বলেন, হাটে গরু তোলার পর থেকে পশু আর ঘুমাতে পারে না। কারণ ক্রেতা রাত দিন চব্বিশ ঘণ্টা এসে দরদাম করতে থাকেন। আর ক্রেতাকে কোরবানির পশু না দেখিয়ে কোনো উপায় থাকে না।

গাবতলী হাটে প্রবেশের পর দ্বিতীয় সারিতেই চোখে পড়বে তিনটি বিশাল আকারের গরু। কাছে গিয়ে পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলে গরুর মালিক আওলাদ হোসেন জানান, গরু তিনটি লালন পালন করা হয়েছে সাভারের তামান্না ডেইরি ফার্মে। দুই দিন ধরে হাটে তুলেছেন। একজন ক্রেতাও একটি গরুরও দাম করেননি। আকারে ছোট গরুটির দাম চাওয়া হচ্ছে ১৫ লাখ টাকা। আরেকটি ২০ লাখ টাকা। বড় সাইজের গরুটির দাম চাওয়া হচ্ছে ২৫ লাখ টাকা।

তিনি বলছিলেন, দাম শুনেই ক্রেতারা সোজা অন্যদিকে চলে যাচ্ছেন। নূ্যনতম দাম পর্যন্ত করছেন না। যে কারণে খানিকটা বিপাকেই রয়েছেন তিনি। এসব গরু কোনোভাবেই আর লালন পালন করা সম্ভব না। তিনটি গরুর জন্য চারজন লোক এসেছেন। গরুসহ তাদের প্রতিদিন প্রায় ৭ হাজার টাকা করে খরচ হচ্ছে। শুক্রবার ও শনিবারের মধ্যেই দরদাম যাই হোক গরু বিক্রি হয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

গাবতলী হাটে ঢুকতেই ডান দিকের দ্বিতীয় অংশের প্রথম সারিতেই চোখে পড়ল বিশাল আকারের একটি কালো গরু। দেখা গেল গরুটিকে গোসল করানো হচ্ছে। তারা সারা শরীর ধুয়েমুছে দিচ্ছেন দু'জন। গরুটি দেখভাল করার জন্য সঙ্গে এসেছেন তিনজন। কোরবানির ওই গরুটির মালিক রাকিব হোসেন সুমন। নিজের পরিচয় দিয়ে গরু সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুক্রবার ভোরে গরুটি হাটে তোলা হয়েছে। তাদের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানাধীন ধানখোলা গ্রামে। গরুটি ফ্রিজিয়াম জাতের। দাম চাচ্ছেন ৩০ লাখ টাকা। ভালোবেসে গরুটির নাম দিয়েছেন 'কালো মানিক'। তিনি বলেন, হাট আসলে সেই অর্থে জমেনি। আশা করছি, শুক্রবার বিকাল থেকে শনিবার দিবাগত রাত পর্যন্ত পুরোপুরি হাট জমে যাবে।

গাবতলী পশুর হাটের হাসিল আদায়কারী শাকিল আহমেদ বলছিলেন, গত দুই ঘণ্টায় তিনি ১২টি কোরবানির পশুর হাসিল কেটেছেন। এর মধ্যে সাতটি গরু, বাকিগুলো খাসি। প্রতিটি পশুর দাম ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে। এবার ছোট ও মাঝারি সাইজের গরুর চাহিদা বেশি। সব সময়ই এমন সাইজের গরুর চাহিদা একটু বেশিই থাকে। তবে এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় এ ধরনের গরুর চাহিদা অনেক বেশি।

তিনি বলছিলেন, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। সেই অনুযায়ী আয় বাড়েনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। যে কারণেই হয়তো এবার ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা অনেক বেশি। ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দামের গরুও কিনছেন এক বা একাধিক ব্যক্তি মিলে।

শাকিল আরও বলেন, হাসিলের হার শতকরা ৫ টাকা। হাসিলের টাকা ক্রেতাকে দিতে হয়। এবার হাসিলের টাকা নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে বেশ পীড়াপীড়ি করতে দেখা যাচ্ছে। অধিকাংশ ক্রেতাকেই বলতে শোনা যায়, ভাই আপনার কোরবানির পশুটি ন্যায্য দামে কিনেছি। তাই আপনি দয়া করে হাসিলে টাকা দিয়ে দেন। আবার অনেকেই হাসিলের টাকা কে দেবেন তা আগ থেকেই ঠিক করে আসেন। কোনো সময় বিক্রেতার লাভ কিছুটা বেশি হলে বিক্রেতা হাসিলের টাকা দেন। তবে নিয়মানুযায়ী ক্রেতাকে হাসিলের টাকা পরিশোধ করতে হয়।

অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলছিলেন, গাবতলী হাটে কমবেশি প্রায় ৫ লাখের মতো কোরবানির পশু ওঠে। যদিও এটি সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না। কারণ এসব পশুর অধিকাংশই আবার বিভিন্ন হাটে হাটে যাতায়াত করছে বা তোলা হচ্ছে। তাই প্রকৃত সংখ্যা জানা অসম্ভব। এবার হাটে ক্রেতার বেশ সংকট আছে। বিশেষ করে বড় বড় কোরবানির পশুর ক্রেতার সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম।

শুধু গাবতলী নয়, ঢাকার আরও ১৯টি হাটের চিত্র এমনই। বিভিন্ন হাটের ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুক্রবার, শনিবার ও রোববার পর্যন্ত পুরোপুরি ব্যাপকহারে জমে যাবে কোরবানির পশুর হাট। আবার ঈদের দিন বিকালে ও পরদিনও কিছু কিছু কোরবানির পশু হাটগুলোতে বিক্রি হয়। কারণ ঈদে যেহেতু তিন দিন পর্যন্ত কোরবানি দেওয়ার নিয়ম আছে, সেদিক বিবেচনা করে অনেকেই ঈদের পরে নির্ধারিত দিন পর্যন্ত কোরবানির পশু কিনে থাকেন। তবে সেই সংখ্যা খুবই কম।

পশু বিক্রেতা ও হাটের হাসিল আদায়কারীরা জানান, ঢাকায় বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষের বাসাবাড়িতে কোরবানির পশু রাখা বা দেখভাল করার তেমন কোনো লোক নেই। যে কারণে ঢাকার অধিকাংশ বাসিন্দারা ঈদের এক দিন আগে বা ঈদের আগের দিন বা রাতে কোরবানির পশু কিনে থাকেন। এতে করে পশু এক বা দুই দিন লালন পালন করার ঝামেলা থাকে না।

এবার ঢাকায় পশুর হাট বসেছে ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি কলেজ সংলগ্ন উন্মুক্ত এলাকা, পোস্তগোলা শ্মশান ঘাটসংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, খিলগাঁও মেরাদিয়া বাজারসংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, যাত্রাবাড়ী দনিয়া কলেজসংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনালসংলগ্ন উন্মুক্ত এলাকা, লালবাগের রহমতগঞ্জ ক্লাবসংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, আমুলিয়া মডেল টাউনের আশপাশের খালি জায়গা, খিলগাঁও রেলগেট বাজারের মৈত্রী ক্লাবসংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, লিটল ফ্রেন্ডস ক্লাবসংলগ্ন খালি জায়গা ও কমলাপুর স্টেডিয়ামসংলগ্ন বিশ্বরোডের আশপাশের খালি জায়গা, বাড্ডা ইস্টার্ন হাউজিং আফতাব নগরের ই বস্নক থেকে এফ, জি, এইচ পর্যন্ত অংশের খালি জায়গা, দক্ষিণখানের কাওলা শিয়াল ডাঙ্গাসংলগ্ন খালি জায়গা, উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টরের বৃন্দাবন থেকে উত্তর দিকে বিজিএমইএ পর্যন্ত খালি জায়গা, ভাটারার সাঈদনগর, মোহাম্মদপুর বছিলা এলাকার ৪০ ফুট সড়কসংলগ্ন রাজধানী হাউজিং ও বছিলা গার্ডেন সিটির খালি জায়গা, গাবতলী গবাদিপশুর স্থায়ী হাট ও ঢাকার তেজগাঁও ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের খেলার মাঠের খালি জায়গা এবং খিলক্ষেত খাঁপাড়া উত্তর পাশের জামালপুর প্রপার্টিজের খালি জায়গায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি হাটে বসানো হয়েছে পুলিশ ওর্ যাবের অস্থায়ী ক্যাম্প। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বসানো হয়েছে টাকা লেনদেনের ডিজিটাল বুথ। বসানো হয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। অজ্ঞানপার্টি মলম পার্টি দৌরাত্ম্য ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্থায়ীভাবে বসানো হয়েছে চিকিৎসক টিম। যাতে করে যেকোনো মানুষ বা পশু অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে