রোববার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১৪ মাঘ ১৪২৯
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন

বাংলাদেশের কিছু এলাকা অধিকতর বিপদের মধ্যে

ষ হুমকিতে দেশের সোয়া কোটি মানুষ ষ ২০৫০ সাল নাগাদ কৃষি জিডিপি কমতে পারে এক-তৃতীয়াংশ
যাযাদি ডেস্ক
  ০১ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
আপডেট  : ০১ নভেম্বর ২০২২, ০০:১৪
অভিযোজন এবং দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় অগ্রণী ভূমিকা থাকলেও ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের কিছু এলাকা অধিকতর বিপদের মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক। এমনকি ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের কৃষি জিডিপির এক-তৃতীয়াংশ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে জলবায়ু অভিবাসী হতে পারে। অন্যদিকে, বড় বন্যা হলে দেশের জিডিপি ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। সোমবার বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিস থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব আশঙ্কার কথা জানানো হয়। এদিন ঢাকায় গুলশানের হোটেল রেনেসাঁয় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের জন্য বিশ্ব ব্যাংক গ্রম্নপের 'কান্ট্রি ক্লাইমেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট' নামক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এমন প্রেক্ষাপটে অধিকতর অভিযোজন এবং অভিঘাত-সহিষ্ণু পদক্ষেপসহ জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করার তাগিদ দেওয়া হয়। এ উদ্যোগ গ্রহণ না করলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাটি। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অনুষ্ঠানে বিশ্ব ব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টিন রেইসার বলেন, 'অভিযোজন এবং দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। গত ৫০ বছরে দেশটি ঘূর্ণিঝড়ে মৃতু্যর সংখ্যা ১০০ ভাগ কমিয়েছে, অন্যান্য দেশ যা থেকে শিখতে পারে। কিন্তু জলবায়ু ঝুঁকি বাড়তে থাকায় অভিযোজন প্রচেষ্টা জোরদার করা অত্যাবশ্যক এবং নিম্ন-কার্বন উন্নয়ন গতিপথ বাংলাদেশের অভিঘাত-সহিষ্ণু ভবিষ্যতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।' বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের কিছু এলাকা জলবায়ু পরিবর্তনের অধিকতর ঝুঁঁকিতে রয়েছে। বরেন্দ্র এলাকা, উপকূলীয় এলাকা, হাওড় অঞ্চল, পার্বত্য অঞ্চল এবং যেসব এলাকায় দরিদ্রহার বেশি সেখানে বিনিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বাংলাদেশ উন্নত কৃষি উৎপাদনশীলতা এবং জ্বালানি ও পরিবহণ দক্ষতার ওপর জোর দিয়ে কার্যক্রম হাতে নিলে, বায়ু, মাটি এবং পানির গুণগতমান বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে পারে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়। এতে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনে দরিদ্র এবং ঝুঁকিতে থাকা মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গ্রীষ্মমন্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের কারণে গড়ে প্রতিবছরে বাংলাদেশের এক বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিক গ্রিন হাউস গ্যাস (জিএইচজি) নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান নগণ্য এবং মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। তবে বিপুল জনসংখ্যা এবং দ্রম্নত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে দেশটির উন্নয়ন পথ পরিক্রম যদি গতানুগতিকভাবে চলতে থাকে তাহলে জিএইচজি নিঃসরণ উলেস্নখযোগ্যভাবে বাড়বে। অপরদিকে বাংলাদেশ উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণের মুখেও রয়েছে, যার ফলে বছরে ক্ষতি হচ্ছে জিডিপির প্রায় ৯ শতাংশ। বিভিন্ন খাতে উন্নত বায়ুমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবে এবং জলবায়ু সহিষ্ণুতা বাড়াবে বলে প্রতিবেদনে উলেস্নখ করা হয়। অনুষ্ঠানে আইএফসির এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক ভাইস প্রেসিডেন্ট জন এফ. গ্যানডলফো বলেন, 'জলবায়ু পরিবর্তনের নানা গুরুতর ঝুঁঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জরুরিভিত্তিতে বেসরকারি খাতের অধিকতর সম্পৃক্ততা প্রয়োজন যা শুধু জলবায়ু কার্যক্রমের জন্য দরকারি বিলিয়ন ডলার জোগানের জন্যই নয়, বরং উদ্ভাবন ও দক্ষতাকে এগিয়ে নিয়ে জনসাধারণকে উপকৃত করবে ও সুরক্ষা দেবে।' তার মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি সঞ্চালন, আবাসন, পরিবহণ এবং জলবায়ুবান্ধব কৃষিতে বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা বাড়ানো জরুরি এবং তা সম্ভব। এজন্য সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা দূর করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ত্বরান্বিত করতে হবে এবং সবুজ প্রকল্পগুলোয় অর্থায়ন সহজলভ্য করতে আর্থিক খাত সবুজায়ন করার পরামর্শ দেন তিনি। বাংলাদেশের জলবায়ুবান্ধব প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য এই রিপোর্ট তিনটি অগ্রাধিকার এলাকা চিহ্নিত করেছে : জলবায়ুবান্ধব উন্নয়ন : একটি উন্নয়ন কৌশল যা জলবায়ু প্রভাবের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভিন্নতাকে বিবেচনায় রেখে স্থানীয়ভাবে পরিচালিত অভিযোজনে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এবং ক্ষুদ্র পর্যায়ের সমাধানকে অতি গুরুত্বপূর্ণ করে। সরকারি পরিষেবা, প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান ও সাশ্রয়ী আবাসন, অভিঘাত সহনশীল পরিবহণ সংযোগ এবং পানি ও পানি ব্যবস্থাপনাসহ নগর এলাকায় অবকাঠামোতে বিনিয়োগ, নগরগুলোকে জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করবে। কার্বন নিঃসরণ কমানোর মাধ্যমে উন্নয়ন সুবিধা পৌঁছানো : তুলনামূলক কম খরচে জ্বালানি, পরিবহণ, শিল্প এবং কৃষি থেকে কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব এবং এর মাধ্যমে বায়ুদূষণ, স্বাস্থ্য ব্যয় এবং কর্মসংস্থানসহ সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। বায়ুদূষণ এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ বায়ুদূষণে মৃতু্যর সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে পারে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। শিল্পগুলোকে অধিকতর টেকসই পথে রূপান্তর করলে তাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে। দ্রম্নত নগরায়ণ, আয় প্রবৃদ্ধি এবং আয় বাড়ানোর পাশাপাশি খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। সহায়ক পরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্বিন্যাস : আইনগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিদ্যমান নীতি ও কার্যক্রমের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে পারে। অভিযোজন কর্মসূচিগুলোর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন গুরুত্বপূর্ণ। আর্থিক খাতের ঝুঁঁকি মোকাবিলাসহ এ খাতের সবুজায়নের জন্য নীতিমালা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ুবান্ধব কৃষি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বেসরকারি স্থানীয় ও বিদেশি খাতের সম্পৃক্ততা বাড়ানো জরুরি। বাংলাদেশের কিছু এলাকা জলবায়ু পরিবর্তনের অধিকতর ঝুঁকিতে রয়েছে। এজন্য অধিকতর জলবায়ু ঝুঁঁকিতে থাকা এলাকাগুলো যেমন, বরেন্দ্র এলাকা, উপকূলীয় এলাকা, হাওড় অঞ্চল, পার্বত্য অঞ্চল এবং যেসব এলাকায় দারিদ্র্যের হার ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁঁকি বেশি, যেমন- ময়মনসিংহের পশ্চিম ও রংপুরের পূর্বের উপজেলাগুলো এবং খুলনা বিভাগের দক্ষিণ অংশে বিনিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংক 'আইডিয়াবাজ' চ্যাম্পিয়নশিপের বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। এটি জলবায়ুবান্ধব সমাধানের মাধ্যমে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে তরুণদের জন্য একটি প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেন। এতে গাজীপুরের ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি প্রথম, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি দ্বিতীয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিসস্ট্রেশন তৃতীয় পুরস্কার পেয়েছে।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে