শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
walton1

আরব আমিরাতে অবৈধ হুন্ডির কারবার

সহজলভ্যতায় বেশি ঝুঁকছেন প্রবাসীরা
যাযাদি ডেস্ক
  ৩১ অক্টোবর ২০২২, ১১:১৯

মহামারি করোনা সংক্রমণের রেশ কাটতে না কাটতেই রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে টালমাটাল বৈশ্বিক অর্থনীতি। সারা বিশ্বের মত বাংলাদেশকেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেশ বড়সড় ভূমিকা পালন করে আসছে পৃথিবীর ১৫৭টি দেশে অবস্থানরত প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। রেমিট্যান্স দেশের জাতীয় আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। জাতীয় বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশেরই জোগান আসে এই রেমিট্যান্স থেকে। রেমিট্যান্সই ফরেন কারেন্সি রিজার্ভের প্রধান অংশ। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই রেমিট্যান্সে থাবা বসিয়েছে অবৈধ হুন্ডি ব্যবসায়ীরা।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ১০ লাখের মত প্রবাসী বাংলাদেশীর বসবাস। বৃহত্তর এই প্রবাসী জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে মাকড়সার জালের মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অবৈধ ডিজিটাল হুন্ডি ব্যবস্থা। বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকায় চা'য়ের দোকান থেকে শুরু করে মুদির দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁ, সবজির দোকান সহ অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অনেকটাই ওপেন-সিক্রেটে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে তা অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে দেশে পাঠাচ্ছে। প্রবাসীর পাঠানো টাকা মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশ/রকেট/নগদ সহ অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে মুহূর্তেই তার পাঠানো গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে। দ্রুত এবং ঝামেলামুক্ত তাই প্রবাসীরাও ঝুঁকছেন এই পন্থায়। এতে বৈধ পথে প্রবাসী-আয়ের গতি কমেছে। সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। রিজার্ভ এযাবতকালের সর্বনিম্ন কোটায় পৌঁছেছে। দেশ ও জনগণ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

বৈধ চ্যানেলে দেশে টাকা পাঠাতে ও অবৈধ হুন্ডি বন্ধে সরকারের নেয়া বেশ কিছু পদক্ষেপ অবৈধ হুন্ডি ব্যবসায়ীদের সু-কৌশলের কাছে বার বার ধাক্কা খাচ্ছে। করোনাকালীন সময় রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে আড়াই শতাংশ প্রণোদনা, প্রবাসীদের বিভিন্নদাবির প্রতি গুরুত্ব দেয়া এবং দেশে-বিদেশে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ায় ২০২০-২০২১ অর্থবছরে দুই হাজার ৪৭৭ কোটি ৭৭ লাখ (২৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন) ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। কিন্তু ২০২১-২০২২ অর্থবছরে তা ১৫ দশমিক ১১ শতাংশ কমে গিয়ে ২ হাজার ১০৩ কোটি ১৭ লাখ (২১ দশমিক ৩ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠায় তারা। তার মধ্যে, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩২.৭৬ শতাংশ কম রেমিট্যান্স গিয়েছে। আগের অর্থবছরে যেখানে গিয়েছে ১.৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার,সেখানে পরের অর্থবছরে গিয়েছে ১.২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এমতাবস্থায় নড়েচড়ে বসেছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা।

ইতিমধ্যে সরকারের মন্ত্রী, সচিব থেকে শুরু করে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আলাদাভাবে কয়েকবার আরব আমিরাতে এসেছেন। বৈধ পথে দেশে রেমিটেন্স পাঠাতে এবং অবৈধ হুন্ডি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে দূতাবাস, কনস্যুলেটের কর্মকর্তাদের দিকনির্দেশনা সহ কমিউনিটি, সাংবাদিক ও সাধারণ প্রবাসীদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে গেছেন। আরব আমিরাতের বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানানো হয়েছে।বাংলাদেশ কনস্যুলেট দুবাইয়ের উদ্যোগে সচেতনতাবৃদ্ধির সভা-সেমিনার ও বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রেরণকারীদের "রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড" দেয়ার ঘোষণা সহ অবৈধ হুন্ডি ব্যবসায়ীদের তালিকা করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন।

আমিরাতে অবস্থানরত কয়েকজন প্রবাসীর সাথে কথা বললে তারা জানান, ব্যাংক বা এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে টাকা পাঠানোয় অনেক ঝামেলা এবং সময়-সাপেক্ষ ব্যাপার। ঠিক তেমনি দেশে টাকা উত্তোলন করতে গেলেও একই সমস্যায় পড়তে হয়। তাই দ্রুত এবং ঝামেলা মুক্তভাবে হুন্ডিতে টাকা পাঠান তারা। অনেক প্রবাসী কোনটা বৈধ আর কোনটা অবৈধ তাও জানেন না। কষ্টার্জিত টাকা ঝামেলামুক্তভাবে দেশে পরিবারের কাছে পৌঁছালেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। কয়েকজন জানান, অবৈধ জেনেও বাধ্য হয়ে টাকা পাঠাতে হয় সময় স্বল্পতার কারণে। ব্যাংক,একচেঞ্জ অনেক দূরে, দেশে টাকা পাঠাতে গেলে সেদিন আর চাকুরীতে যাওয়া সম্ভব হয় না। অন্যদিকে ব্যাংকের থেকে হুন্ডিতে রেটও বেশি দেয়, তাই তারা সহজে লাভের আশায় অবৈধ হুন্ডিতে টাকা পাঠান।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশি পেশাদার সাংবাদিকদের একমাত্র সংগঠন 'বাংলাদেশ প্রেসক্লাব, ইউএই'র আয়োজনে বেশ কয়েকবার সভা - সেমিনারে উঠে আসে এসকল সমস্যা ও উত্তরণের উপায়। বৈধ পথে রেমিটেন্স বাড়াতে অবৈধ হুন্ডি (বিকাশে'র) মত দ্রুতগামী ট্রানস্ফার পদ্ধতি প্রবাসীদের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে হবে। সেক্ষেত্রে মোবাইলের অ্যাপ তৈরি করা যেতে পারে। যাতে খুব সহজে, দ্রুত,ঝামেলামুক্তভাবে প্রবাসীরা বৈধ উপায়ে দেশে টাকা পাঠাতে পারেন। প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকায় ব্যাংক এবং এক্সচেঞ্জের শাখা-প্রশাখা বাড়াতে হবে। ব্যাংক এবং এক্সচেঞ্জের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে রেমিটেন্স ফি মওকুফ করা যেতে পারে। সরকার ঘোষিত আড়াই শতাংশ প্রণোদনা বাড়িয়ে 5% করা যেতে পারে, যাতে হুন্ডির রেট এর সাথে ব্যাংক এবং এক্সচেঞ্জের রেটে বেশি তারতম্য না হয়। দেশে এবং বিদেশে অবৈধ হুন্ডি ব্যবসায়ীদের তালিকা করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে পারলে রেমিট্যান্সের গতি স্বাভাবিক হবে বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।

যাযাদি/ সোহেল

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে