বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

ইতালিতে কট্টর ডানপন্থিদের জয়ে উদ্বেগে বাংলাদেশিরা

যাযাদি ডেস্ক
  ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:২২

ইউরোপের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ইতালিতে বসবাসকারী অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যাই বেশি। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী বর্তমানে ইতালিতে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে বসবাসরত বাংলাদেশির সংখ্যা দেড় লাখের বেশি। সম্প্রতি দেশটির জাতীয় নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থি জর্জিয়া মেলোনি জয় পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন। এর ফলে তিনি এখন দেশটির ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। তার এই বিজয়ে অবশ্য উদ্বেগে আছেন সেখানে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা। মঙ্গলবার বিবিসি প্রকাশিত এক রিপোর্টে ইতালিতে বসবাসরত বেশ কয়েকজন বাংলাদেশির সাক্ষাৎকার তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশিরা খোলাখুলিভাবে কথা বলেছেন মেলোনির জয়ের বিষয়ে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মেলোনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির সবচেয়ে কট্টর সরকারের নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু তার জয়ে ইতালির সম্ভাব্য যে পরিবর্তনের প্রভাব তা হয়তো দেখা যাবে গোটা ইউরোপের ওপরেই। যদিও নির্বাচনের পর মোলোনি বলেছেন, তার দল ব্রাদার্স অব ইতালি সবার জন্য কাজ করবে এবং মানুষের ভরসার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। কিন্তু নির্বাচনে দলটির প্রধান ইস্যু ছিল অভিবাসন এবং অবৈধ অভিবাসন ঠেকানোর জন্য তার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি। আবার মেলোনির জোটের অন্য শরিক দলগুলোরও দাবি অভিবাসন কমানো এবং দেশটির ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রভাব দুর্বল করা।

ইউরোপে ঢোকার জন্য প্রতিবছর ভূমধ্যসাগর হয়ে এবং স্থলপথে প্রচুর মানুষ ইতালি যান। এদের মধ্যে প্রচুর বাংলাদেশিও রয়েছেন। ইতালিতে অভিবাসী বাংলাদেশিরা বলছেন, এই মুহূর্তে দেশটিতে বৈধভাবে কাজ করছেন এক লাখের বেশি বাংলাদেশি। এছাড়া এখনো কাজ এবং চাকরির বৈধ কাগজপত্র নেই কিংবা হওয়ার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, এমন বাংলাদেশির সংখ্যাও ৫০ হাজারের বেশি। রাজধানী রোম এবং ভেনিসে কাজ করছেন এমন কয়েকজন বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলে দেখা যাচ্ছে, ব্রাদার্স অব ইতালির জয়ে তাদের মধ্যে এক ধরনের চাপা উদ্বেগ কাজ করছে। তবে যারা ইতোমধ্যে কাজ ও বসবাসের বৈধ কাগজপত্র পেয়েছেন তাদের মধ্যে উদ্বেগ কিছুটা কম। কিন্তু যারা এখনো স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাননি তাদের আশঙ্কা যে, নতুন সরকার অভিবাসন নীতি কঠোর করলে তাদের বৈধতা পেতে সমস্যা হবে। এছাড়া মুসলমানবিরোধী মনোভাবের শিকার হতে পারেন এমন আশঙ্কাও রয়েছে অনেকের মনে।

ইতালির বাংলাদেশ সমিতির সাবেক সভাপতি নূর আলম সিদ্দিকী বাচ্চু অবশ্য মনে করেন, অভিবাসীদের প্রতি যত কঠোরই হোক হয়তো তাদের সরাসরি দেশে ফেরত পাঠাবে না মেলোনির সরকার। কিন্তু নানা নিয়মকানুন করে হয়তো তাদের চাপে রাখা হবে। নূর আলমের আশঙ্কা, নতুন সরকার হয়তো অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আইন করবে এবং তাদের অভিবাসীবিরোধী প্রচারণা যেভাবে চালাবে তাতে সমাজে বিদেশি বনাম ইতালিয়ান একটি দূরত্ব তৈরি হবে। যেহেতু দেশটিতে বেকারত্ব এবং অপরাধের পেছনে অভিবাসীরাই জড়িত বলে মনে করা হয়, সে কারণে নতুন সরকার এসে অনিয়মিত অভিবাসী শ্রমিক এবং অপরাধ ঠেকাতে বিধিনিষেধ দেবে। এরপর টার্গেট দেবে যে বিদেশি ১০ বছর ১৫ বছর কাজ করছে, তাকে ফেরত পাঠাও।

অভিবাসীরা নানা হয়রানির শিকার হবেন এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে নূর আলম বলেন, রাজনৈতিকভাবে আমাদের (অভিবাসীদের) নিয়ে প্রচার চালিয়ে রেখে হয়তো কোণঠাসা করে রাখা হবে। যাতে বেতনের ব্যাপারে আমরা মাথাচাড়া না দেই। আমাদের কায়িক শ্রমকে অল্প পয়সায় নেওয়ার জন্য আমাদের মানসিক চাপে রাখা হবে। হয়তো দেখা যাবে ডকুমেন্ট রিনিউ হচ্ছে না, এরকম নানা কিছু। এসব চাপের কারণে নতুন অভিবাসীদের ইতালিতে নিরুৎসাহিত করা হবে। সমুদ্রপথে ইতালিতে ঢোকার প্রবেশ মুখগুলোতে যেহেতু কড়াকড়ি হবে, সে কারণে ওখানে যখন রেডক্রসের মতো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কাজ করে তাদের কর্মকা-ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে। ফলে সমুদ্রপথে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে অভিবাসনেচ্ছু মানুষেরা দুর্ঘটনায় পড়লে তাদের প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়বে।

ভেনিসের একটি আবাসিক হোটেলে কাজ করেন সাইমুন শরীফ জেসি। দুই বছর আগে ফ্যামিলি ভিসায় স্বামীর সঙ্গে দেশটিতে গেছেন তিনি। তবে কাজ করার জন্য ‘টেম্পোরারি রেসিডেন্সি’ পেয়েছেন কয়েক মাস আগে, যার মেয়াদ শেষ হবে ডিসেম্বরে। তিনি বলছেন, ফ্যামিলি ভিসায় আসার কারণে ইতালিতে তার অবস্থান নিয়ে হয়তো সরাসরি কোনো সমস্যা হবে না। তার পরও এক ধরনের চাপা উদ্বেগ রয়েছে মনে।

ভেনিসের একটি আবাসিক হোটেলের মালিক আবেগ আল মামুন জানান, টেম্পোরারি রেসিডেন্সিতে সাধারণত প্রথমে ছয় মাসের অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর নিয়মিত বিরতিতে ওই অনুমতিপত্র নবায়ন করতে হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নবায়নের সময় কর্তৃপক্ষ চাইলে সেটি অনুমতি নাও দিতে পারে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হয়তো স্থায়ীভাবে বসবাস এবং নাগরিকত্ব পাবেন না একজন অভিবাসী।

বৈধ কাগজপত্র যাদের নেই তাদের শঙ্কা বেশি। গত ১৩ মাস ধরে রোমে রয়েছেন সামিউল ইসলাম (ছদ্ম নাম)। ইতালি পৌঁছে প্রায় সাত মাস বেকার থাকার পর এপ্রিল মাসে তিনি অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ ও বসবাসের অনুমতিপত্র নিয়ে রোমে কাজ করছেন। স্থায়ী পারমিট নেই বলে খুবই অল্প বেতনে কাজ করছেন তিনি। সামিউল বলেন, টেম্পোরারি রেসিডেন্সির কারণে মনে একটা আশা সৃষ্টি হয়েছে যে ঠিকমতো কাজ করলে এক সময় বৈধভাবে এখানে স্থায়ীভাবে থাকতে পারব। কিন্তু এখন কী হবে বুঝছি না। নতুন সরকারের নীতির কারণে তার কাজের অনুমতিপত্র নবায়নে সমস্যা হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন। পাশাপাশি সামিউল ইসলামের আরেকটি ভীতি হচ্ছে মুসলমান হওয়ার কারণে তিনি কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজনও হতে পারেন।

যাযাদি/ এস

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে