বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষার পদক্ষেপে এগিয়ে বাংলাদেশ 

যাযাদি ডেস্ক
  ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১৫:৩২
উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষার পদক্ষেপে এগিয়ে বাংলাদেশ 

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলস্বরূপ বিশ্বব্যাপী জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির সম্মুখে। তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তথা আগামী প্রজন্মের জন্য একটা বসবাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়ার জন্য সারাবিশ্বের দেশগুলো নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। বৈশ্বিক মন্দা পরিস্থিতিতেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের গৃহীত বাস্তবমুখী নানা পদক্ষেপের কারণে দারিদ্র বিমোচন এবং টেকসই উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলদেশ। আর টেকসই উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যে অর্জনের জন্য সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে উপকূলীয় তথা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষার দিকে যার প্রমাণ মিলে সরকার কর্তৃক গৃহীত নানা পদক্ষেপের মধ্যে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধের নিস্পত্তির পর সুনীল অর্থনীতির উন্নয়নের পাশাপাশি সরকার সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য বিভিন্ন বাস্তবমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করে। বাংলাদেশ সরকার মাছ, বিশেষ করে জাতীয় মাছ ইলিশ সংরক্ষণ এবং উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বেশ কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ১৯৫০ সালের মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন অনুসারে, ছয়টি নদী ও মোহনা অঞ্চলে ৪৩২ কিলোমিটারেরও বেশি দৈর্ঘ্য জুড়ে ইলিশের আবাসস্থলগুলিকে ইলিশের অভয়ারণ্য হিসাবে ঘোষণা করেছে।

এছাড়াও সব অভয়ারণ্যে অক্টোবর মাসে ইলিশ প্রজনন রক্ষার জন্য জাতীয়ভাবে ২২ দিনের জন্য মাছ ধরা, পরিবহন এবং বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে। তাছাড়া, ২০১৫ সালে সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ সহ অন্যান্য জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য সামুদ্রিক মৎস্য অধ্যাদেশ ১৯৮৩ (বর্তমানে সামুদ্রিক মৎস্য আইন ২০২০) দ্বারা বাংলাদেশের সামুদ্রিক জলসীমায় বাণিজ্যিক ট্রলারসহ সকলপ্রকার নৌযানদ্বারা ৬৫ দিনের জন্য মৎস্যআহরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০০০ সালে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ৬৯৮ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে মেরিন রিজার্ভ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ সরকার মেগাফনা সংরক্ষনের জন্য সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের ১৬৩৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকা, ২০১৯ সালে ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ সহ অন্যান্য সামুদ্রিক জীববৈচিত্র সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নিঝুম দ্বীপ সংলগ্ন ৩১৮৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকা এবং ২০২২ সালে প্রবালদ্বীপের জববৈচিত্র সংরক্ষনের জন্য সেইন্ট মার্টিন দ্বীপের পার্শবর্তী জলসীমার ১৭৪৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা হিসাবে ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকার পরিমান ৭৩৬৭ বর্গ কিলোমিটার যা দেশের সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রায় ৬.২০ শতাংশ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা অনন্যা দেশের তুলনায় সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কেমন করছি? উদাহরণ হিসাবে আমরা আমাদের দুটি পার্শবর্তী দেশ ভারত এবং মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের চিত্র তুলনা করতে পারি। ভারতে বর্তমানে তাদের মোট সমুদ্র এলাকার ০.২৪ শতাংশ সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা হিসাবে আছে যা মিয়ানমারে ০.৫ শতাংশ। আয়তনের দিক দিয়ে পার্শবর্তী দুটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশ ছোট হলেও দেশের সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রায় ৬.২০ শতাংশকে সংরক্ষিত এলাকা হিসাবে ঘোষণা করা সরকারের সাহসিকতা এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ঐকান্তিক প্রচেষ্টার পরিচয় বহন করে।

জীববৈচিত্র্য রক্ষার নানামুখী পদক্ষেপের কারণে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, যে এলাকায় পদক্ষেপ গুলো নেয়া হয়েছে সে এলাকার উপর নির্ভরশীল জেলে সম্প্রদায়ের জীবিকার কি হবে? জেলেদের জীবিকার কথা চিন্তা করে সরকারের রয়েছে নানা বাস্তব মুখী কর্মসূচি। উদাহরণ হিসাবে বলাযেতে পারে সরকার কতৃক গৃহীত ভি জি এফ মৎস্য, বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য উপকরণ প্রদান এবং মৎস্য চাষ প্রদর্শনী প্রকল্পের কথা। আমাদের দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জেলেপরিবারের মাছ-আহরণ ব্যতিত বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ খুব কম। তাই উপকূলীয় জেলেদের মাছ ধরার নিষিদ্ধকালীন সময়ে পরিবারের খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য সরকার হাতে নিয়েছে ভি জি এফ মৎস্য প্রকল্প।

এই প্রকল্পের আওতায় ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে জাটকা ইলিশ ধরার নিষিদ্ধকালীন সময়ে ২০টি উপকূলীয় জেলার ৯৭টি উপজেলার প্রায় ৩৬০৮৬৯ টি জেলে পরিবারকে ফেব্রুয়ারী থেকে মে ২০২৩ পর্যন্ত প্রত্যেক পরিবারকে প্রতিমাসে ৪০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেয়া হয় যা নিঃসন্দেহে এক প্রশংসনীয় উদ্যোগ। একই অর্থবছরে প্রায় ৫৬০০ জেলে পরিবারকে, পরিবারপ্রতি ২৫০০০ টাকা মূল্যের বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য উপকরণ প্রদান করা হয় যা মৎস্য আহরণের নিষিদ্ধকালীন সময়ে জেলেদের জীবিকা নির্বাহকে অনেকটাই নিরাপদ করেছে। এছাড়া, আপদকালীন সময়ে জেলেদের মৎস্য চাষ প্রদর্শনী প্রকল্পের মাধ্যমে জেলেদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করেছে সরকার।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে সরকার কতৃক গৃহীত পদক্ষেপ গুলো আসলে মৎস্য সম্পদ উন্নয়নে আদো কোনো প্রভাব ফেলছে কিনা বা এই জেলেদের জীবন ও জীবিকায় কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলছে কিনা। মৎস্য সম্পদের উপর বিভিন্ন পদক্ষেপ গুলোর প্রভাব আমরা দেখতে পারি ইলিশের উৎপাদন থেকে। ইলিশের উৎপাদন গত এক দশকের কিছু বেশি সময়ে প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার কতৃক গৃহীত নানা পদক্ষেপ সফলতা পেয়েছে। জেলেদের জন্য সরকারের খাদ্য সহায়তা সহ বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরির প্রকল্প গুলো জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার কতৃক গৃহীত পদক্ষেপ গুলোকে করেছে টেকসই। আর এই ধারা অব্যাহত রাখাগেলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বাংলাদেশ খুব দ্রুতই বিশ্বে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। ড. সুব্রত সরকার, সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

যাযাদি/ এসএম

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে