বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

আহবায়ক কমিটিতেই বন্দি সাতক্ষীরা জেলা বিএনপি

শাকিলা ইসলাম জুই, সাতক্ষীরা
  ০১ নভেম্বর ২০২২, ১৫:০০

পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় কেন্দ্র ঘোষিত কোন আন্দোলনে মাঠে দাঁড়াতে পারছেনা সাতক্ষীরা জেলা বিএনপি। বিগত দিনের তুলনায় বর্তমানে জাতীয়  নির্বাচন, সরকার পতন ও দলটির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনে নেতা-কর্মীরা মাঠে থাকলেও অভ্যন্তরিন কোন্দলোনের কারনে অনেক ত্যাগী নেতা-কর্মীকে দলীয় কেন্দ্র কর্মসূচীতে দেখা মিলছে না। জেলা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায়ের তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা বলছে দুই ভাগে বিভক্ত জেলা বিএনপির অভ্যন্তরিন কোন্দল ও দীর্ঘ ৩৩ মাসে জেলা বিএনপি পূর্নাঙ্গ কমিটি করতে ব্যর্থ হওয়ায় দলীয় কার্যক্রমে প্রাণ-চাঞ্চ্যলতা হারিয়ে ফেলেছে দলটি। এখনও পর্যন্ত হয়নি জেলা বিএনপির ৭টি উপজেলা ও দুটি পৌরসভার পূূুর্নাঙ্গ কোন কমিটি। 

গত ৫ ফেব্রæয়ারী আহবায়ক কমিটির তিন জন যুগ্ন আহবায়কসহ অনান্যদের মতামত উপেক্ষা করে দলের আহবায়ক সৈয়দ ইফতেখার আলী ও সদস্য সচিব ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল আলিম যুক্ত স্বাক্ষর করে নিজেদের মত করে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সাতক্ষীরা সদর, সাতক্ষীরা পৌর, আশাশুনি, কালিগঞ্জ ও দেবহাটার উপজেলা আংশিক আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেন। পরদিন এই পকেট কমিটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ওই ৫টি সাংগঠনিক ইউনিটে বিএনপির পাল্টা কমিটি ঘোষণা করেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক তারিকুল হাসান, আব্দুর রউফ ও মৃণাল কান্তি রায়। পাল্টা পাল্টি কমিটি দেওয়ায় কোন কমিটিই বৈধ্যতা না পাওয়ায় উভয় কমিটি স্থগিত করে কেন্দ্রীয় কমিটি। ফলে কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশে কমিটি গঠনের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে চরম হতাশার মধ্যে পড়ে মাঠ পর্যায়ের উদিয়মান নেতারা। আহবায়ক সৈয়দ ইফতেখার আলী ও সদস্য সচিব ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল আলিমের স্বজনপ্রীতি ও পকেট কমিটি গঠনকে দায়ী করছেন মাঠ পর্যায়ের দলীয় নেতা-কর্মীরা। 

এ ঘটনার পর রাজধানী পল্টনে অবস্থিত কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের আহবায়যক, যুগ্ন আহবায়ক ও সদস্য সচিব সহ দলের খুলনা বিভাগী ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ ইসলাম অমিত ও সহ সাংগঠনিক জয়ন্ত কুমার কুুন্ডু উদ্বুত পরিস্তিতি নিয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে ভিডিও ভার্চুয়াল মিটিং এর মাধ্যমে রুদ্দদার বৈঠকে বসেন। সেখানে দীর্ঘ ৩২/৩৩ মাসের মধ্যে সাতক্ষীরা জেলা বিএনপি কেন পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে ব্যর্থ হয়েছে সে ব্যাপারে আহবায়ক ও সদস্য সচিবকে কৈফিয়ত তলব করা হয়। এক পর্যায়ে আহবায়ক কমিটির সমন্বয়ে সকল ইউনিটে যাচাই-বাছাই পূর্বক একটি খসড়া প্রস্তাবনা কমিটি বিভাগীয় কমিটির নিকট ৭ দিনের মধ্যে জমা দেওয়ার প্রতিশ্রæতি দিয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এঘটনার কয়েক দিন পর বিএনপির কালিগঞ্জ উপজেলা সভাবেশ থেকে দলের যুগ্ন আহবায়ক তারিকুল হাসানকে পুলিশ গ্রেফতার করে জেলহাজতে প্রেরণ করে। তারিকুল হাসাান জেলখানায় থাকা অবস্থায় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে খসড়া প্রস্তাবনা কমিটি বিভাগীয় কমিটির নিকট জমা না দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ওই ৫টি ইউনিটে পূনারায় কমিটি ঘোষনা করেন দলের আহবায়ক সৈয়দ ইফতেখার আলী ও সদস্য সচিব আব্দুল আলিম। ফেেল ওই কমিটি মেনে নিতে পারেনি দলের বাকী তিন যুুগ্ন আহবায়কসহ ৩৫ সদস্য আহবায়ক কমিটির অন্য ২২ সদস্য। ফলে তারা আহবায়ক ও সদস্য সচিবের বিরুদ্ধে ব্যক্তি পছন্দের নেতা-কর্মীদের নিয়ে পকেট কমিটি ঘোষনা করার কারনে ওই ৫ ইউনিটে ঘোষিত কমিটি বাতিল পূর্বক কেন্দ্রের নির্দেশনা অমান্য করায় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন।

জেলা বিএনপি’র যুগ্ম আহবায়ক মৃণাল কান্তি রায় রায় অভিযোগ করে বলেন, বর্তমান কমিটির আহবায়ক ও সদস্য সচিব সাংগঠনিকভাবে একেবারে ব্যর্থ। তাদের ব্যর্থতা ও স্বজনপ্রীতির কারণে ৩৩ মাসেও পূর্ণাঙ্গ কমটি হয়নি। তারা আমাদের তিন জন যুগ্ন আহবায়যকের কোন মতামত না নিয়েই আহবায়ক ও সদস্য সচিব যে কমিটি ঘোষনা করেছে সেটি একটি পকেট কমিটি। ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে সেখানে তাদের আত্মীয় স্বজনদের বড় বড় পদে স্থান দেওয়া হয়েছে। যাদেরকে আমরা কখনও রাজনীতির মাঠে দেখিনি। অনতিবিলম্বে জেলা বিএনপি’র এই আহবায়ক কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির যুগ্ম আহবায়ক আব্দুর রউফ বলেন, আমাদের কমিটির আহবায়ক সৈয়দ ইফতেখার আলী ও সদস্য সচিব আব্দুল আলিম প্রত্যেকটি ইউনিটে ত্যাগী নেতা-কর্মীদের বাদ দিয়ে পকেট কমিটি করছে। অনতি বিলম্বে এই অথর্পো কমিটি ভেঙ্গে দেওয়া উচিত।  
জেলা বিএনপির অপর যুগ্ন আহবায়ক ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক তারিকুল হাসান জানান, আহবায়ক সৈয়দ ইফতেখার আলী ও সদস্য সচিব আব্দুল আলিম বার বার তারা দলের ভারপ্্রাপ্ত চেয়ম্যান তারেক রহমানের নির্দেশ অমান্য করছে। সেখানে আহবায়ক কমিটির সকল সদস্যদের সাথে আলোচনা করে খুলনা বিভাগীয় নেতাদের কাছে খসড়া তালিকা জমা দেওয়ার পর তাদের মতামতের ভিত্তিতে কমিটি ঘোষনা করার কথা। সেটি না করে তারা আবারও ৫টি ইউনিটে পকেট কমিটি ঘোষনা করেছে। 

এ ব্যাপারে আমরা তিন জন যুগ্ন আহবায়কসহ মোট আহবায়ক কমিটির ২২ জন কমিটি বাতিলের দাবিতে ও তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছি। ব্যক্তি পছন্দের নেতা-কর্মীদের নিয়ে পকেট কমিটি করার কারনে দলীয় কর্মসূচীতে খুব বেশি লোক হচ্ছে না। সম্প্রতি খুলনায় অনুষ্ঠিত মহাসমাবেশে লোক তুলতে তারা চরম  ভাবে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেন এই নেতা। 

জেলা বিএনপির আহবায়ক সৈয়দ ইফতেখার আলী জানান, কেন্দ্র ঘোষিত সকল কর্মসূচী যথাযথ ভাবে জোরে সরে পালিত হচ্ছে। জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুল ইসলাম হাবিবের অনুসারিরা কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াকে বাঁধা গ্রস্থ্য করে একটি সংঘাত পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। কেন্দ্রের নির্দেশে বিভিন্ন ইউনিটে কমিটি গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। খুব শিঘ্রই সম্মেলনের মাধ্যমে জেলা বিএনপির পূর্নাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে। 

তবে এ ব্যাপারে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুল আলিম বলেন, জেলা বিএনপির ৫টি ইউনিটের কমিটি গঠনে স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন ‘যারা দল করে, দলীয় প্রোগ্রামে উপস্থিত হয় তাদের নিয়েই কমিটি গঠন করা হয়েছে। 

বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত জয়ন্ত কুমার কুন্ডু বলেন, ‘পাল্টাপাল্টি কমিটি দেওয়ার কারণে উভয় কমিটি স্থগিত করা হয়েছিল। বিএনপি কখনও দ্বিধা বিভক্তিতে বিশ্বাস করেনা। তাদেরকে একতাবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়ে সকলের মতামতের ভিত্তিতে আলোচনার ভিত্তিতে কমিটি করার কথা। 

উল্লেখ্য ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু স্বাক্ষরিত এক পত্রে এড. সৈয়দ ইফতেখার আলীকে আহ্বায়ক এবং লাবসা ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল আলিমকে সদস্য সচিব করে ৩৫ সদস্য বিশিষ্ট সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেয়া হয়। ওই পত্রে ৩ মাসের মধ্যে সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির ৯ টি ইউনিটের কমিটি গঠন করে জেলা কমিটি গঠনের লক্ষে সম্মেলন আয়োজনের নির্দেশনা দেন। 

যাযাদি/ সোহেল
 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে