পাঠক মত

নতুনের প্রত্যাশায় দারিদ্র্যশূন্য দেশ

নতুনের প্রত্যাশায় দারিদ্র্যশূন্য দেশ

দরিদ্রতা একটি অভিশাপ, যে অভিশাপের কবলে পড়লে কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারবে না। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটেও দরিদ্রতা এখানে চরমভাবে বিরাজ করে। জনসংখ্যার দিক দিয়ে অধিক ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। এই অধিক জনসংখ্যা হলেও মাথাপিছু আয় কম। স্বাধীনতার এতগুলো বছরেও 'দারিদ্র্য' নামক শব্দটাকে আমরা মুছে ফেলতে পারিনি। কোনো না কোনো যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপের অভাবে দরিদ্রতাকে আমরা এড়িয়ে যেতে পারছি না। তবে দারিদ্র্যের হার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে সেটা দেশের সার্বিক বিবেচনায় কতটা উন্নয়নের অনুকূলে হবে তা সঠিকভাবে নিরূপণ করা যায় না। আমাদের নতুন নতুন প্রত্যাশাগুলোর অন্যতম স্থানে আছে দারিদ্র্র্যশূন্য দেশের স্বপ্ন। যে স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। প্রত্যাশা যাই হোক না কেন তা প্রাপ্তিতে রূপান্তর করতে যথাযথ পরিকল্পনা প্রয়োজন। আমরা কি দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছি? প্রশ্নটা যুক্তিসঙ্গত, আমরা যদি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময়কার কথা চিন্তা করি তাহলে তখন দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৮০ শতাংশ। এই বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সচ্ছল পর্যায়ে আনতে আমরা সফল হয়েছি। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে সাধারণ দারিদ্র্যের হার ২০.৫% এবং চরম দারিদ্র্যের হার ১০.৫%। আমাদের এই অগ্রগতি অন্য রাষ্ট্রগুলোকে চমকে দেওয়ার মতো ক্ষমতা রাখে। তবে এখনো যে পরিমাণ দারিদ্র্য জনগোষ্ঠী বিরাজ করছে তার পেছনে কিছু কারণ রয়েছে যে কারণগুলোর সমাধান যথাযথভাবে হচ্ছে না বলেই এটা নিরসন সম্ভব হচ্ছে না। শহরের তুলনায় গ্রামে দারিদ্র্যের হার অনেক বেশি। আয় 'উন্নয়ন 'অবকাঠামো' শিক্ষা' সব দিক দিয়ে শহরের মানুষ এগিয়ে থাকার কারণেই গ্রামের মানুষ দরিদ্রতা কাটিয়ে উঠতে পারছে না। দেশের পূর্বাঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দারিদ্র্য এখনো বেশি। বাংলাদেশে উচ্চ বৈষম্যের কারণে দারিদ্র্য কমানোর গতি কম। যারা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে তারাই বারবার সেই সুযোগ-সুবিধাগুলো পাচ্ছে। আর যারা এর থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তারা বঞ্চিত হয়েই থেকে যাচ্ছে এই বৈষম্য দূর করা প্রয়োজন। গ্রামীণ এলাকায় প্রায় ৮০ শতাংশ জনসংখ্যা বসবাস করে এরমধ্যে আনুমানিক ৩৫ শতাংশ জনসংখ্যা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। গ্রামাঞ্চলের মানুষ অনেক বৈষম্যের শিকার হয় যার ফলে দারিদ্র্য নামক যুদ্ধে তারা একটু পিছিয়ে পড়ে। গ্রামীণ পর্যায়ে দুর্নীতি বিরাজ করে যার ফলে অনেক সাহায্য-সহযোগিতা গরিব মানুষের দ্বারে পৌঁছায় না। শিক্ষার ব্যাপারে এখন গ্রামীণ সমাজ অনেক এগিয়ে থাকলেও তাদের মধ্যে জেঁকে বসে আছে পুরাতন ধ্যান-ধারণা। মানুষের সৃষ্ট বৈষম্য ছাড়াও প্রাকৃতিক বিরূপ আচরণের ফলেও অনেক মানুষকে দারিদ্র্যের খেতাব বহন করতে হয়। বন্যায় কবলিত এলাকার মানুষ বাড়িঘর, ফসল, পশুপাখি হারিয়ে ফেলে যার ফলে তাদের দারিদ্র্যের গভীরে প্রবেশ করতে হয়। বন্যার কারণে বছরে গড়ে ১৬% পরিবারের আয় হ্রাস পায়, সম্পত্তির ক্ষতি হয় প্রায় ৮৯%। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত জেলা এবং দুর্যোগপ্রবণ জেলাগুলোতে দারিদ্র্যের হার বেশি এসব জেলার মানুষ শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও তথ্যের অভাবে শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার দারিদ্র্য মোচনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমান সরকার ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। টেকসই উন্নয়নের মূল উদ্দেশ্য অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্রমুক্ত দেশ হওয়ার লক্ষ্য আছে। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উচ্চ আয়ের দেশে উন্নীত করা যেখানে দারিদ্র্য হবে নিম্নতম ৫%-এর কম। সরকারের লক্ষ্য হলো- ২০৪১ সালের মধ্যে সব কর্মক্ষম নাগরিক তাদের কর্মসংস্থান থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে জীবনধারণের নূ্যনতম মান বজায় রাখতে পারবে। ২০২৫ সালের মধ্যে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩২ লাখ ৫০ হাজার। যদি সব ধরনের কর্মপরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে দারিদ্রশূন্য দেশের প্রত্যাশা প্রাপ্তিতে পরিণত হবে। দারিদ্র্যের প্রভাব দেশের জন্য ক্ষতিকর এটা সব ধরনের উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে। তাই সরকারের নেওয়া প্রতিটি উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। দারিদ্র্যে এমন একটি সমস্যা যেটা নির্মূল করতে যে উদ্যোগ নেওয়া হয় সেটাতেও দরিদ্রতা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষাবিস্তারের মাধ্যমে সবার জন্য আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় কিন্তু এই শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রেও বাধা হয় 'দারিদ্র্য' নামক শব্দ। এজন্যই এই সমস্যার গভীরে প্রবেশ করে এর পর্যালোচনা করা জরুরি। আমরা ২০২১ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশে পদার্পণ করেছি। দরিদ্রতার যে সংগ্রাম তা আমরা প্রথম থেকেই লড়ে আসছি তবে ব্যক্তিপর্যায়ে থেকেও আমাদের চেষ্টা করতে হবে। তৈরি পোশাক খাত দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তবে এসব খাতে দক্ষ জনবল প্রয়োজন হয় যেটার অভাব আমাদের দেশে তাই তৃণমূল পর্যায় থেকেই সবাই যেন এসব দক্ষতা আয়ত্তে আনতে পারে তার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সরকারের প্রচেষ্টা আমরা সর্বস্তরে লক্ষ্য করছি। ২০২৫ সালের মধ্যে ৮০ লাখ ৫০ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে যা দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে। প্রান্তিক মানুষ বেশি দারিদ্র্যের জালে জড়িয়ে পড়ে এজন্য সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে। আয়-বৈষম্য একটা বড় সমস্যা এই বৈষম্য মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। রূপকল্প ২০৪১-এ সমৃদ্ধি অর্জন করতে হলে দরিদ্রতাকে দূর করতে হবে। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে একটি উন্নত দেশ যেখানে মাথাপিছু আয় হবে ১২৫০০ মার্কিন ডলারেরও বেশি। সোনার বাংলাদেশকে 'দারিদ্র্যশূন্য' দেখার প্রত্যাশা আমাদের সবার।

ফারিয়া ইয়াসমিন

শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে