স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের ৫০ বছর

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের প্রতি অনুগত্য প্রদর্শন ও সম্মান জানিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম ক্যাপ্টেন মন্সুর আলী, কামরুজ্জামান প্রমুখ মহান নেতার সার্বিক তত্ত্বাবধান ও অংশগ্রহণে গঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেই সরকারের শপথ গ্রহণের ঘটনা স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের গৌরবময় সংগ্রামের প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকৃষ্ট করেছিল।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের ৫০ বছর

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১-এর সেই রক্তঝরা দিনগুলোর কথা স্মরণে এলেই আনন্দ-বেদনার স্মৃতিকাতরতা মন আচ্ছন্ন করে তোলে। আনন্দ স্বাধীনতা লাভের, আর বেদনা স্বজন হারানোর। কিন্তু কীভাবে সেই দিনগুলোর কথা উপস্থাপন করা যেতে পারে? এ ব্যাপারে এডওয়ার্ড সাইদের বক্তব্য বিবেচনাযোগ্য। সাইদ বলছেন, কোনো বিষয় উপস্থাপনে 'যেসব শব্দ' প্রয়োগ করা হয়, 'ঘটনাগুলো' যেভাবে প্রদর্শিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট 'তথ্য-উপাত্ত' যেভাবে 'ব্যাখ্যা' করা হয়, তা খুব বেশি ভাবে নির্ভর করে 'কে' এগুলো ব্যাখ্যা করছেন, 'কীভাবে' করছেন এবং 'কী' উদ্দেশ্যে করছেন সে সবের উপর। এডওয়ার্ড সাইদ (১৯৮১) তার 'কভারিং ইসলাম : হাউ দ্য মিডিয়া অ্যান্ড দ্য এক্সপার্টস ডিটারমিন হাউ উই সি দ্য রেস্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড' গ্রন্থে এমনই যুক্তি দিয়েছেন।

আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের উপাদানগুলোর অন্তর্ভুক্ত সমীকরণ হচ্ছে, জাতীয়তা+ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংগঠন +সার্বভৌমত্ব+ভূ-খন্ড। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ প্রস্তুতির পর, বাঙালিরা এই সমীকরণে যুক্ত হয়েছে ১৯৭১ সালের মার্চ এবং এপ্রিলে। আমরা জানি, ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপে এটি সূচিত হয়েছিল ১৬৪৮ খ্রিষ্টাব্দে। ওয়েস্টফেলিয়া শান্তি হচ্ছে- বেশ কয়েকটি চুক্তি যা ১৬৪৮ খ্রিষ্টাব্দের মে এবং অক্টোবরের মধ্যে অসনাব্র্যাক ও মুন্সটার নামক ওয়েস্টফেলীয় নগরে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তিগুলোর ফলে পবিত্র রোম নগরীর ত্রিশ বছরের (১৬১৮-১৬৪৮) যুদ্ধের অবসান হয়। এ ছাড়া এই চুক্তির ফলে স্পেন ও ডাচ প্রজাতন্ত্রের মধ্যে আশি বছরের (১৫৬৮-১৬৪৮) যুদ্ধেরও অবসান ঘটে। এরপর স্পেন ডাচ প্রজাতন্ত্রের স্বাধীনতা স্বীকার করে নেয়। এই চুক্তিগুলো সমগ্র ইউরোপব্যাপী শান্তি পুনঃস্থাপন করতে পারেনি, তবে এগুলো জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের ভিত্তি সৃষ্টি করেছিল। অস্ট্রেলিয়া ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর লুউক গস্নানভিল (২০১১) বলছেন, 'এটি বারবার বলা হয়েছে, সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সপ্তদশ শতাব্দীর দিকে (ওয়েস্টফেলিয়ার শান্তির মাধ্যমে) এবং তখন থেকে রাষ্ট্রগুলো স্বায়ত্তশাসন, অ-হস্তক্ষেপ, বা অন্য কোনো শক্তির নাক না গলানো 'বন্ধনমুক্ত' এবং অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বাইরের হস্তক্ষেপ মুক্ত অধিকার ভোগ করছে।' দেখা যাচ্ছে, ১৬৪৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে যখন সার্বভৌমত্বের এই ধারণা স্বীকৃত হয় তার প্রায় ৩০০ বছর পরে ভারতীয় উপমহাদেশে এই ধারণটি সূচিত হয়।

বঙ্গবন্ধুই আমাদের স্বাধীনতা সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছেন। বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাঙালিদের স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতো না, তাই বঙ্গবন্ধুর জন্ম তারিখ ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১-এর ৭ মার্চ মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধুর আহ্বান। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ মুক্তিকামী বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু, ২৫ মার্চ রাত ১২টার পর বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণা, এরপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার। ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং দেশকে শত্রম্নমুক্ত করার জন্য বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে সর্বাত্মকভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। এরপর এপ্রিলের ১০ তারিখ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয়। এপ্রিলের ১৭ তারিখ স্বাধীন বাংলাদেশের

\হপ্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করেছিলেন। অতএব, প্রতি বছর মার্চ ও এপ্রিল মাস এলেই (পূর্ব) বাংলার জনগণের ওপর পাকিস্তান বাহিনীর আক্রমণ এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির কথা মনে পড়ে যায়।

১৯৭০-এর নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের প্রতি এদেশের মানুষের নিরঙ্কুশ সমর্থন ব্যক্ত হওয়া, সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান কর্তৃক জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা, পূর্ব বাংলার বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণ ও নির্বিচারে বাঙালি হত্যা প্রভৃতি ঘটনার প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু প্রথমে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৭১-এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা ঘোষণার পাশাপাশি সরকারি বাঙালি সরকারি কর্মচারীদের বেতন নিয়ে আসা, অফিসে না যাওয়ার কথা বলে প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে (পূর্ব) বাঙালিরা যখন ১৯৭১-এর ২ মার্চ অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেছিল তখন থেকেই বাঙালি সরকারি কর্মকর্তা বিশেষত যারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অফিস করতেন তারা এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং অফিসে যাওয়া থেকে বিরত থেকেছেন। অন্যান্য অনেকের মতো আমার জন্মদাতা পিতাও সেসময় বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রথমে পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন পরে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠিত হওয়ার পর সেই সরকারের কর্মকান্ডের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। এরপর, ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু পুনরায় স্বাধীনতা ঘোষণা এবং দেশ শত্রম্নমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। এরপর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হয়ে বিহারি সম্প্রদায়ের মানুষ এবং মুসলিম লীগ ও জামায়াতই ইসলামের নেতাকর্মী, সমর্থকরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হল, জগন্নাথ হল এবং শিক্ষকদের কোয়ার্টারে শিক্ষক-ছাত্র-কর্মচারী, রাজারবাগ পুলিশ ফাঁড়ি, হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও আওয়ামী লীগারদের বেছে বেছে হত্যা করা হয়েছিল।

১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী লোকসভায় কঠিন শব্দসহ একটি রেজিউলেশন গ্রহণ করেন। লোকসভা এবং রাজ্যসভায় পাস করা এই রেজিউলেশনে 'পূর্ব বাংলার সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে গভীর ক্লেষ এবং গুরুতর উদ্বেগ' প্রকাশ করা হয় এবং এই রেজিউলেশনে অভিযোগ করা হয় যে 'পূর্ব বাংলার সকল জনগণের আবেদন ও আকাঙ্ক্ষা অবদমনের উদ্দেশ্যে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রেরিত সশস্ত্র বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে নির্বিচারে আক্রমণ চালাচ্ছে'।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এমনই এক আক্রমণের শিকার হয়েছিলাম আমরা। আর এ ধরনের আক্রমণ থেকে আমাদের পরিবারের কয়েকজন বেঁচে গেলেও বাঁচতে পারেননি ফরিদপুর শহরের নিকট শোভারামপুর নিবাসী কুশল দাদু ও তার স্ত্রী। যিনি আমার পিতার একমাত্র মামা। মনে পড়ে, কুশল দাদু প্রতি বছর পৌষ মাসে আমাদের বাড়িতে আসতেন। এ সময় পার্শ্ববর্তী সেনদিয়া গ্রামে পৌষ মেলা উপলক্ষে কবি গানের আসর বসত। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর আক্রমণ থেকে জীবন বাঁচাতে আশপাশের গ্রাম থেকে বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ সেনদিয়া গ্রামের বিভিন্ন স্থানে পালিয়েছিল। পাকিস্তানি বাহিনী খুঁজে খুঁজে তাদের প্রায় ১০০ জনকে গুলি করে হত্যা করেছে। এই সেনদিয়া গ্রামের কবি গানের প্রতি নিরীহ কুশল দাদুর ছিল প্রবল আকর্ষণ। এপ্রিলের প্রথমদিকে পাকিস্তানি সেনারা যখন গোয়ালন্দ ঘাট পার হওয়ার চেষ্টা করেছিল তখন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রসহ স্থানীয় জনসাধারণের পক্ষ থেকে তারা প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধের জন্য বাংলার প্রত্যেকটি এলাকা তখন প্রস্তুত হয়েছিল। প্রথম চেষ্টায় গোয়ালন্দ ঘাটে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অবতরণ চেষ্টায় ব্যর্থ হলেও পরে পাকিস্তানি হায়েনার দল ফরিদপুরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল। গোয়লন্দে পাকিস্তানি বাহিনী অবতরণ করতে সক্ষম হয় তারপরে গুলিবর্ষণ করতে করতে ফরিদপুর শহরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। শহরের লোকজন যে যার মতো প্রাণ বাঁচানোর জন্য ভিটে-বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। পরে বেঁচে যাওয়া অন্যদের কাছে শুনেছি, সহজ-সরল কুশল দাদু মনে করেছিল, 'আমি সাধারণ মানুষ পাকিস্তানি সেনারা আমার কী করবে?' এই চিন্তা করে তিনি পড়ন্ত বিকালে খেতে বসেছিলেন দুপুরের খাবার। খাওয়া অবস্থাতেই পাকিস্তানি সেনারা তাকে গুলি করে হত্যা করেছিল।

এদিকে, ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ ৩০ মার্চ, ১৯৭১ সন্ধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে গিয়ে পৌঁছান। তিনি অতি সত্বর ভারতীয় অফিসারদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন, কলকাতা যান এবং পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং পরে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে যান। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে যুব নেতা শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমদ প্রমুখ কলকাতা পৌঁছেছিলেন। ৬ এপ্রিল নতুন দিলিস্নর পাকিস্তান হাই কমিশনার কে এম শাহাবুদ্দীন এবং আমজাদুল হক পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। ১৮ এপ্রিল কলকাতার পাকিস্তানের একজন বাঙালি ডেপুটি হাই কমিশনার হোসেন আলী পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন।

১৯৭১-এ কিশোর বয়সি যারা ছিলেন তাদের মতো আমারও মনে পড়ে 'বিধ্বস্ত রোদের ঢেউ' আছড়ে পড়া রক্তঝরা সেই দিনগুলোর কথা!' তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রম্নর মোকাবিলা করতে হবে...' ১৯৭১-এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর আহ্বান অনুযায়ী একাত্তরের মার্চ থেকেই চলছিল প্রস্তুতি। ২৬ মার্চ সকালবেলায় আমার জন্মস্থান মাদারীপুর (তৎকালীন ফরিদপুর) জেলার রাজৈর (থানা) উপজেলার টেকেরহাট বন্দরের আশপাশের গ্রামগুলো থেকে হাজার হাজার লোক, যাদের প্রায় সবাই ছিলেন কৃষক পরিবারের, লাঠি, সড়কি, বলস্নম, ঢাল প্রভৃতি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সমবেত হতে থাকে। যুদ্ধ বলতে তখন পর্যন্ত বাঙালিরা এসব অস্ত্র দিয়ে লড়াই করা বুঝত। আর তাদের মনের বল এতটাই প্রবল ছিল যে বিশ্বের 'বেস্ট ফাইটিং ফোর্স' পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ট্যাংক, কামান, মেশিনগান, যুদ্ধবিমান প্রভৃতি ধরনের অত্যাধুনিক সব অস্ত্রশস্ত্রের সামনে বাঙালিদের দেশীয় অস্ত্র যে কিছুই না তা তারা (বাঙালিরা) বিবেচনায় নেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করে নাই। টেকেরহাটে সমবেত সবাই তখন ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের মাদারীপুর-রাজৈর নির্বাচনি এলাকা থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্য ফণিভূষণ মজুমদার, আওয়ামী লীগ নেতা সরদার শাজাহান, হারুন মোলস্না, বর্তমান রাজৈর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাজাহান খান, সেকেন্দার আলী শেখ প্রমুখ নেতাদের স্মরণাপন্ন হয়েছিলেন পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ ও নির্দেশনার জন্য। এর মধ্যে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের বৃহস্পতিবার, পার্শ্ববর্তী (বর্তমান) গোপালগঞ্জ জেলা সে সময়ের মহকুমার মুকসুদপুর থানাধীন জলিরপাড় হাট চলাকালে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একটি স্যাবরজেট বিমান সরাসরি ঢাকা থেকে এসে নদীর মধ্যে প্রচন্ড গুলিবর্ষণ করে চলে যায়। ধারণা করা হয়, বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থান হওয়ার কারণে গোপালগঞ্জও মাদারীপুরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বাঙালিদের যুদ্ধ প্রস্তুতির বিরুদ্ধে এটি ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর একটি সতর্ক বার্তা। এর মধ্যে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, প্রভৃতি স্থানে পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ এবং ফরিদপুরের সন্নিকটে গোয়ালন্দ ঘাটে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সেখানকার বাঙালিদের তুমুল যুদ্ধ চলার খবর আসছিল। দেশের অন্যান্য স্থানেও এ ধরনের অসম প্রতিরোধ যুদ্ধের খবর পাওয়া যাচ্ছিল।

১৯৭১-এর ১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠনের কথা ঘোষণা করেন। ভারতের জাতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো এই ঘোষণার কথা প্রচার করে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের সামরিক জান্তার কারাগারে অন্তরীণ অবস্থায় থাকার কারণে, অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সৈয়দ নজরুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। মন্ত্রিপরিষদে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিবর্গ ছিলেন, উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম; প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ; এ এম কামরুজ্জামান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী; ক্যাপ্টেন (অব.) মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী। পরবর্তীকালে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু ও জেলখানায় চার জাতীয় নেতা হত্যাকান্ডের ষড়যন্ত্রকারী খোন্দকার মোশতাক পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী হিসেবে এই মন্ত্রিপরিষদে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কর্নেল এম এ জি ওসমানিকে কমান্ডার ইন চিফ এবং কর্নেল আব্দুর রবকে চিফ অব আর্মি স্টাফ নিযুক্ত করা হয়। ১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল সকাল ১১টায় বর্তমান মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের একটি চৌকস দল মাহবুবউদ্দিন আহমদ, বীর-বিক্রমের নেতৃত্বে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন।

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা ছিল সে সময়ের মহকুমা বর্তমান চুয়াডাঙ্গা জেলায়। কিন্তু পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে এটি মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গোলক মজুমদার এবং সে সময়ে মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক (এসডিও) তৌফিক-ই- ইলাহী চৌধুরী স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে বৈদ্যনাথতলায় শপথ গ্রহণের মঞ্চ তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। সবস্তরের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এপ্রিলের ১৬ তারিখ রাতারাতি বৈদ্যনাথতলায় শপথ গ্রহণ মঞ্চ স্থাপন করা হয়েছিল। সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ এবং অন্য নেতারা ১৭ এপ্রিল সকাল ৯টায় শপথ গ্রহণের স্থানে এসে উপস্থিত হন। এই অনুষ্ঠানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। স্থানীয় শিল্পীরা স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি' পরিবেশন করেন। ১০০'র বেশি স্থানীয় ও বিদেশি সাংবাদিক ও মুক্তিকামী কয়েক হাজার মানুষের উপস্থিতিতে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তাজউদ্দীন আহমদ ৩০ মিনিটের একটি বক্তৃতা প্রদান করেন এবং বৈদ্যনাথতলাকে মুজিবনগর নামকরণ করেন। তিনি তার ভাষণে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি এবং নতুন সরকারকে সামরিক সহযোগিতা করার জন্য বিশ্বসম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান। আম্রকানন শোভিত ছোট্ট গ্রাম বৈদ্যনাথতলায় বাংলাদেশের প্রথম সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের খবর মুক্তিকামী লাখ লাখ জনতা বেতার মারফত জানতে পেরেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের প্রতি অনুগত্য প্রদর্শন ও সম্মান জানিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মন্সুর আলী, কামরুজ্জামান প্রমুখ মহান নেতার সার্বিক তত্ত্বাবধান ও অংশগ্রহণে গঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেই সরকারের শপথ গ্রহণের ঘটনা স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের গৌরবময় সংগ্রামের প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকৃষ্ট করেছিল।

এমনিতে অতীতের কোনো গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা বর্তমানের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে স্মরণ করার ব্যাপারটি তাৎপর্যপূর্ণ বটে! ১৯৭১ সালের এপ্রিলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জাতি স্বাধীনতার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। এই যুদ্ধে ত্রিশ লাখেরও বেশি মানুষ জীবন দিয়েছিলেন। যাদের মধ্যে আমার অতি প্রিয় কুশল দাদুও আছেন। ২০২১-এর এপ্রিলে দাঁড়িয়ে ১৯৭১ সালের সেই রক্তঝরা দিনগুলো স্মরণ করার সময় যারা স্বাধীনতার জন্য নিঃশেষে জীবন দান করেছেন, তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

প্রফেসর ড. অরুণ কুমার গোস্বামী : 'ইনস্টিটিউশনালাইজেশন অব ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ' গ্রন্থের লেখক; ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ এবং প্রফেসর, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে