শনিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২২, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

জাতির পিতার শিক্ষাদর্শন ও প্রাথমিক শিক্ষা

২০৪১ সালের উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শিক্ষা দর্শন প্রাথমিক শিক্ষাকে আরও যুগোপযোগী করতে পারে। সে লক্ষ্যে শিক্ষক, অভিভাবক ও ছাত্রসহ সবার অংশগ্রহণে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মোক্ষম সময় এখনই।
সাদিয়া জেরিন
  ০৭ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০
পৃথিবীর বুকে বাঙালি এক মহান জাতির নাম আর বঙ্গবন্ধু একজন প্রজ্ঞাবান নেতা, একজন সমাজ সংস্কারকের নাম। মূলত, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ এক সূত্রে গাঁথা। বাঙালি জাতিসত্তা, বাংলাদেশ নামক ভূ-খন্ডের সৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ দেশ, কাল, জাতিভেদে বিশ্ব পরিমন্ডলে অনন্য নজির স্থাপন করেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রারম্ভেই তিনি অনুধাবন করেছিলেন শিক্ষা ছাড়া আমাদের জাতীয় মুক্তি সম্ভব নয়। দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূরীকরণের মধ্য দিয়ে সমাজতন্ত্র বাস্তবায়ন করতে হলে সমগ্র জাতিকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্ত শিক্ষা, তাই বঙ্গবন্ধু একটি শিক্ষিত জাতির স্বপ্ন দেখেছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল তার শিক্ষা ভাবনা। যেখানে মৌলিকত্ব, অভিনবত্ব, বাস্তবতার গুরুত্ব ছিল সর্বাধিক। শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ পুঁজি বিনিয়োগ করে বাংলার আপামর মানুষের মধ্যে জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা বিকশিত করে প্রগতিশীল ভাবনার অধিকারী, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনই ছিল এই শিক্ষা দর্শনের মানদন্ড। বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ক্ষেত্রে বিনিয়োগকে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ বলে বিশ্বাস করতেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সীমাহীন অভাবের মধ্যেও তার পরিকল্পনা ছিল সৃজনশীল, উদ্ভাবনী চেতনায় সমৃদ্ধ শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। শিক্ষা ব্যবস্থাকে বৈষম্যহীন ও যুগোপযোগী করতে নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন সে সময়। ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে শিক্ষাসহ মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা, সুযোগের সমতা, অধিকার ও কর্তব্যের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছিলেন। 'সবার জন্য শিক্ষা' নিশ্চিত না করা গেলে প্রকৃতপক্ষে কোনো সমাজের পরিপূর্ণ সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে জাতির পিতা উপলব্ধি করেছিলেন। বৈদেশিক সাহায্য নির্ভরতাকে বঙ্গবন্ধু টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা মনে করতেন। এক সময় শিশুরা পাঠশালা, মক্তব অথবা গুরুগৃহে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করত। প্রাথমিক শিক্ষা তখন রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ইংরেজ শাসন আমলে প্রাথমিক শিক্ষার ধারায় কিছুটা পরিবর্তন হয়। পাকিস্তান আমলে প্রাথমিক শিক্ষায় অবহেলা ছিল বিস্তর। পরবর্তীতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা বিশেষ গুরুত্ব পায়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক করাসহ ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন বঙ্গবন্ধু। ১১ হাজারেরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের কাজ শুরু করেছিলেন। ৪৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছিলেন। প্রথম পাঁচশালা পরিকল্পনায় (১৯৭৩-৭৮) জাতির পিতা দেশে ৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় তৈরির প্রস্তাব করেন। ০৫ বছর বয়সি শিশুদের বাধ্যতামূলকভাবে প্রাথমিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। সেই সাথে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে ১৯৭৩ সালে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নারী শিক্ষাকে অবৈতনিক করার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ত্যাগ ও নিষ্ঠার মাধ্যমে শিশুদের ভালোবেসে অকৃপণভাবে মেধা ও শ্রম দিয়ে সোনার বাংলা গড়ে তুলতে পারে শিক্ষক সমাজ। শিক্ষা ও শিক্ষককে অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বলেছিলেন আগামী প্রজন্মের ভাগ্য শিক্ষকদের উপর নির্ভর করছে। শিশুদের যথাযথ শিক্ষার ব্যত্যয় ঘটলে কষ্টার্জিত স্বাধীনতা অর্থহীন হবে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা, দক্ষ মানব সম্পদ উৎপাদনে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা জেনে এদেশের মানুষের সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিবেশের আলোকে সুদূরপ্রসারী শিক্ষার লক্ষ্য নিয়ে তিনি ১৯৭৪ সালে জাতিকে কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন উপহার দেন। পাকিস্তানি শাসনকালে গঠিত সকল শিক্ষা কমিশন বাঙালি জাতিকে প্রবঞ্চনা আর প্রহসন ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি। ১৯৭৪ সালে কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ ৫-৮ বছর করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ০৮ বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষাকে সার্বজনীন, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রাখা হয়। এছাড়া শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় উৎসাহিত করা, ইংরেজি ভাষা শেখার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া, শিক্ষার সমান সুযোগ সৃষ্টি করা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার উপর জোর দেওয়া, শিক্ষা ক্ষেত্রে উলেস্নখযোগ্য বাজেট রাখার মতো বিষয়গুলো কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করতে দ্য প্রাইমারি স্কুল অ্যাক্ট ১৯৭৪ প্রণয়ন করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুকে ১৯৭৫ সালে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করার পর ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন আলোর মুখ দেখেনি। এরপর দীর্ঘ সময় শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ ছিল না। ১৯৯৬ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ সম্পূর্ণ শিক্ষা খাতকে গতিশীল করেন। যার ধারাবাহিকতায় বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহে শতভাগ ভর্তি নিশ্চিতকরণ, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালুকরণ, বিনামূল্যে বছরের প্রথম দিন পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, নতুন ভবন নির্মাণ, ওয়াশবস্নক, স্যানিটেশন, উপবৃত্তি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, বঙ্গবন্ধু-বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টসহ বহু প্রশংসনীয় উদ্যোগ চলমান আছে। সরকারি কর্মকমিশনের মাধ্যমে ২০১৬ সালে বিসিএসে উত্তীর্ণদের ৮৯৮ জনকে সরাসরি প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা সংক্রান্ত অধিবেশনে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে 'অস্ত্র নয়, শিক্ষায় বিনিয়োগের' আহ্বান জানিয়েছিলেন। যা থেকে প্রতীয়মান হয় জাতির পিতার আদর্শে শিক্ষার সম্প্রসারণে সরকার কতটা আন্তরিক অবস্থানে আছে। বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থার উলেস্নখযোগ্য উন্নয়ন ঘটলেও মানবিক গুণাবলির যথাযথ চর্চা না হওয়ায় নৈতিক মূল্যবোধ নিশ্চিত করতে পারিনি আমরা। যার ফলে ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থে বৃহত্তর ক্ষতি সাধিত হচ্ছে শিক্ষাঙ্গণে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের ঘুষ, দুর্নীতি, প্রাইভেট বাণিজ্য, অদক্ষ, স্বার্থান্বেষী ম্যানেজিং কমিটির জাঁতাকলে নানা অনিয়ম শিক্ষা ক্ষেত্রে সুশাসন বিঘ্নিত করছে। জাতির পিতা বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তিনি খেটে খাওয়া শ্রমিক, কৃষক, মজুরের ভাগ্যোন্নয়নে, তাদের মুখে হাসি ফোটাতে, তাদের সন্তানদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে আমৃতু্য কাজ করে গিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু সোনার মানুষ গড়তে চাইতেন। সেই সোনার মানুষ গড়ার লক্ষ্যে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্ত করতে তিনি শিক্ষার উপর অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক ও মাধ্যমিকসহ উচ্চ শিক্ষার সব ক্ষেত্রে মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছিলেন। তবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে উলেস্নখযোগ্য পরিবর্তন ঘটান। ২০৩০ সালের মধ্যে 'টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা' অর্জনে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করছে সরকার। ২০৪১ সালের উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শিক্ষা দর্শন প্রাথমিক শিক্ষাকে আরও যুগোপযোগী করতে পারে। সে লক্ষ্যে শিক্ষক, অভিভাবক ও ছাত্রসহ সবার অংশগ্রহণে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মোক্ষম সময় এখনই। সাদিয়া জেরিন : উপজেলা নির্বাহী অফিসার, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে