শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০
walton

অরক্ষিত ডিসি হিল!

বিধিনিষেধের আগে মাদকসেবী, ছিনতাইকারী আর অসৎ চরিত্রের মানুষের আনাগোনার কারণে সময়ে সময়ে ডিসি হিল সংবাদের শিরোনাম হতো। বিধিনিষেধের পর বেশ ক'বছর ডিসি হিল হয়ে ওঠে পরিপাটি, নান্দনিক। ময়লা-আবর্জনা থেকে মুক্ত হয়ে সৌন্দর্যে চকচকে ঝকঝকে অপরূপ দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয় ভ্রমণপ্রিয় দর্শনার্থীদের। কিন্তু সেই চিরচেনা সৌন্দর্য এখন হারিয়ে যেতে বসেছে।
বিপস্নব বড়ুয়া
  ৩০ নভেম্বর ২০২৩, ০০:০০

ইট পাথরের উঁচু উঁচু শোভিত দালান আর দূষণ ধুলো থেকে সুরক্ষিত রাখতে ছোট বড় সব শ্রেণিপেশার মানুষ যখন কিছু সময়ের জন্য নগরীর ফুস ফুসখ্যাত স্থানগুলোতে মুক্ত হাওয়ায় নিঃশ্বাস নিতে ছুটে যায়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, ইদানীং চট্টগ্রাম নগরের সেই স্থানগুলো ক্রমশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। ডিসি হিল, লালদীঘির পাড়, লালদীঘির মাঠ, সিআরবি, কাজির দেউড়ির স্টেডিয়াম পাড়া, জেলা পরিষদের সামনে, বিপস্নব উদ্যান, জাম্বুরী মাঠসহ নান্দনিক স্থানগুলো এখন অবাধে অসামাজিক কার্যকলাপ ও মাদকসেবীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। শুধু জামালখান ব্যতীত অন্য কোথাও একাকী সুস্থভাবে বসার চট্টগ্রাম শহরে এখন কোথাও আর সেই পরিবেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না। এভাবেই চট্টগ্রামের পার্ক ও বিনোদন কেন্দ্রগুলো একে একে অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। এই দায় কী শুধু প্রশাসনের? নাগরিকের কী কোন দায় নেই? একজন সাধারণ নাগরিক হয়ে খুবই লজ্জিত।

তার কারণটি হচ্ছে গত ১৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের ডিসি হিলে হাঁটতে গিয়ে এমন একটি ঘটনার সাক্ষী হলাম- যা সচেতন মানুষ কখনো এই ধরনের কর্মকান্ড কখনো মেনে নেওয়ার নয়। বসার স্থানে (গ্যালারিতে) সাদা ফোমের অসংখ্য লাঞ্চ বক্সের ছড়াছড়ি দেখে মনটা খাড়াপ হয়ে য়ায়। এই দৃশ্যটি সঙ্গে সঙ্গে আমি মোবাইলের ক্যামেরায় বন্দি করি। নিরাপত্তা কর্মীদের একজনকে কাছে ডেকে নিয়ে এরকম হওয়ার কারণ জানতে চাইলাম, কোন ঘৃণ্য ইতররা এই নিকৃষ্ট কাজ করলেন। তিনি বললেন, একটি রাজনৈতিক দলের নেতার অনুসারীরা মিছিল শেষে ডিসি হিলে বসে খাওয়া-ধাওয়া করে। খাওয়া শেষে এভাবে যত্রতত্র বক্স ও খাবরের উচ্ছিষ্টগুলো ফেলে চলে যায়। তাদের কোনো কিছু বলা যায় না। প্রায় সময় নাকি তাদের এই ধরনের অরাজক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। মানুষ কী এরকম জঘন্য হতে পারে? এমন একটি সুন্দর স্থানকে এইভাবে নোংরা করতে পারে? তাদের কী কোনো রকম বোধ শক্তি নেই? ডিসি হিল এক সময় ভ্রমণপ্রিয় মানুষের অবাধ বিচরণ ছিল। মন ভালো করতে যে কেউ ছুটে যেতেন সেখানে। ডিসি হিলের নজরুল মঞ্চটি ছিল সাংস্কৃতিক সংগঠনের জন্য উন্মুক্ত। এখন বাধানিষেধের আড়ালে স্থবির হয়ে পড়েছে এই জনপ্রিয় অঙ্গনটি।

\হ২০১৭ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান ছাড়া অন্য সব ধরনের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেন। তৎকালীন সময় ডিসি হিল চব্বিশ ঘণ্টা উন্মুক্ত থাকার কারণে এটি অসৎ চরিত্র, বকাটে ও মাদকসেবীদের স্বর্গরাজ্য হয়ে ওঠেছিল একথা ঠিক কিন্তু এভাবে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পুরোদমে বন্ধ করে দেওয়া কোনোভাবে উচিত হয়নি। এই ডিসি হিলের ঠিক ওপড়ে থাকেন প্রশাসনের দুই বড়ো কর্তা। একজন বিভাগীয় কমিশনার, অন্যজন জেলা প্রশাসক। এই দুই কর্তা ব্যক্তির বাসভবন ওখানে। মূল গেট থেকে একটু আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে কিছুদূর যেতেই রয়েছে জোরালো সিকিউরিটি। ডিসি হিলের অরক্ষিত পরিবেশের কারণে এক সময় প্রশাসন বাধ্য হয় বিধিনিষেধ আরোপ করে। সেই সময় তড়িঘড়ি করে রাস্তা সংলগ্ন বিশাল গেট আর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে প্রশাসন ভ্রমণ আর দর্শনার্থীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেন। ভোর থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রেখে প্রশাসন নতুন সময় সূচির আদেশ জারি করেন। প্রথম দিকে এই নিয়ে চট্টগ্রামে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে যুক্তরা এই বিধি আরোপ কোনোভাবে মেনে নিতে পারেনি। ডিসি হিলের উন্মুক্ত নজরুল মঞ্চে প্রতিদিন কোনো না কোনো অনুষ্ঠান লেগে থাকত। বিনোদন প্রিয় মানুষ এই স্থানকে একটি স্বস্তির ঠিকানা হিসেবে বেঁচে নিয়েছিলেন। এ নিয়ে প্রতিবাদী সভা-সমাবেশ, আন্দোলন ও পত্রপত্রিকায় লেখালেখির অন্ত ছিল না। আমি নিজেও একাধিক প্রতিবাদে সভা, মিছিলে শরিক হয়েছিলাম। তখন আমি এবং আমার মতো আরো অনেকে রাত ১০টা পর্যন্ত হাঁটা চলা ও শারীরিক ব্যায়াম করার অভ্যস্ত ছিলাম। বিধিনিষেধের কারণে সেই সুযোগটা যখন হাতছাড়া হলো মনটা ভেঙে গেল তখন। ৮টার পরে যখন ওই রাস্তা ধরে হেঁটে যেতাম বুকের ভেতর থেকে শোক ভেসে উঠতো। তারপর থেকে যখনি ডিসি হিলে যাই রাত ৮টার মধ্যে বের হতে হবে মাথায় রেখেই যেতাম। যাক, এত কিছুর পরও তৎকালীন জেলা প্রশাসকের বিন্দুমাত্র টনক নড়াতে পারেনি। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা নীতিগত আন্দোলন করেও সেই ডিসি হিলকে প্রশাসনের কবজা থেকে পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। পরবর্তী জেলা প্রশাসক মো. মমিনুর রহমান- শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মীদের তোপের মুখে এক ঘোষণায় বিধিনিষেধ আংশিক পরিবর্তনের কথা বললেও তা আর কার্যকর হয়নি।

বিধিনিষেধের আগে মাদকসেবী, ছিনতাইকারী আর অসৎ চরিত্রের মানুষের আনাগোনার কারণে সময়ে সময়ে ডিসি হিল সংবাদের শিরোনাম হতো। বিধিনিষেধের পর বেশ ক'বছর ডিসি হিল হয়ে ওঠে পরিপাটি, নান্দনিক। ময়লা-আবর্জনা থেকে মুক্ত হয়ে সৌন্দর্যে চকচকে ঝকঝকে অপরূপ দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয় ভ্রমণপ্রিয় দর্শনার্থীদের। কিন্তু সেই চিরচেনা সৌন্দর্য এখন হারিয়ে যেতে বসেছে।

\হডিসি হিলে সুরম্য গেট, নিরাপত্তা চৌকি থাকার পরও এখন নতুন করে মাদকসেবীরা দিনের অধিকাংশ সময় বসার স্থানগুলো নষ্ট মানুষের দখলে চলে যায়। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। যে একটি পানির ফোয়ারা আছে বর্তমানে সেটি এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। দুর্গন্ধময় পরিবেশ। গেটে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের প্রবেশের ক্ষেত্রে শর্ত লেখা থাকলেও সেই সব শর্ত ভঙ্গ করে ফটক বন্ধ করা অবধি অসামাজিক কার্যকলাপে মেতে ওঠে। প্রশাসন শুধু একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে যেন সব দায় শেষ করেছে। উঠতি স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের নোংরা দৃশ্য ও অসামাজিক কার্যকলাপ ভ্রমণপ্রিয় দর্শনার্থী অভিভাবকদের দিন দিন রীতিমতো শঙ্কিত করে তুলেছে। বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সংগঠক মনোপ্রিয় বড়ুয়া মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে শাস্তি ও জরিমানার ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

একই অবস্থা নগরীর লালদীঘির পাড় পার্ক, লালদীঘির মাঠ, জেলা পরিষদ, মুসলিম হাইস্কুলের সামনে বসার স্থান এবং লালদীঘির মাঠে বানানো মঞ্চেও। সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করেও সাধারণ জনগণের কোনো কাজে আসছে না। লালদীঘির পাড়ে সকাল-সন্ধ্যা কিছু সময় শরীর চর্চাকারীদের আনাগোনা থাকলেও বাকি সময়গুলো মাদকসেবীদের আস্তানায় পরিণত হয়। আর লালদীঘির মাঠে প্রবেশের ক্ষেত্রে উঁচু দেওয়াল না থাকায় অতি সহজে দেওয়াল মাদক কারবারিরা টপকিয়ে ঢুকে পড়ে। বলা যায়, এটি এখন অনায়াসে মাদকসেবীদের বিচরণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। দিনের যে কোনো সময় মাদক বেচাকেনা চলে। যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করে পরিবেশকে পুরোদমে দূষিত করে তুলেছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে অভিযান চালিয়ে মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপ থেকে চট্টগ্রাম মহানগরের পার্ক ও বিনোদন কেন্দ্রগুলো মুক্ত করে সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি মনে করছেন সচেতন মহল।

বিপস্নব বড়ুয়া : প্রাবন্ধিক

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে