বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৯ ফাল্গুন ১৪৩০
walton

তরুণদের নিয়ে আমরা কী ভাবছি

তারুণ্য এখন দিকহারা দিশাহারা উগ্র উদ্ভ্রান্ত। তারা মা-বাবা অভিভাবকদের কথা শোনে না, শোনে না বড় ভাই-বোনসহ অন্য অভিভাবকদের কথাও। তাদের উপদেশকে তারা হাস্যকর মনে করে। গুরুজনদের শ্রদ্ধা বা ভক্তি করা এসব তো উঠে গেছে অনেক আগেই। ফলে পরিবারের সদস্যরা তাদের ব্যাপারে হতাশ ও দিশাহারা। তারা লেখাপড়া বিমুখ, কর্মবিমুখ, পরিবার ও সমাজ বিমুখ। তারা আত্মীয়স্বজন বিমুখ। তারা নতুন চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতা বিমুখ। তাদের ভেতর নেই মানবিকতা ও স্বাভাবিক সৌজন্যবোধ। তারা দিনে দিনে নিষ্ঠুর হয়ে যাচ্ছে, জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে। বিচ্ছিন্নতাবোধ তাদের আঁকড়ে ধরছে।
সালাম সালেহ উদদীন
  ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ০০:০০

তরুণ সমাজকে নিয়ে বাংলাদেশ সবসময় গর্ব করে, গর্ব করে তাদের অতীত নিয়ে। গর্ব করি আমরাও। আজকের তরুণরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আগামী দিনে দেশের উন্নয়নে, দেশসেবায়, মানবকল্যাণে, বিভিন্ন উদ্ভাবনে, তারাই অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। কেউ কেউ এখনো রাখছে। একজন তরুণকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই দায়িত্ব নিতে হবে পরিবারকে, তারপর সমাজ তথা রাষ্ট্রকে। নিশ্চিত করতে হবে পারিবারিক সামাজিক, অধিকার ও নিরাপত্তা। গভীর মনোযোগ দিতে হবে তার মেধা বিকাশের দিকে। \হস্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, আমরা কি তা পারছি? তরুণদের নিয়ে আমাদের যে স্বপ্ন, সে স্বপ্ন কি বাস্তবায়িত হচ্ছে? অপ্রিয় হলেও সত্য, নানা কারণে দেশের তরুণদের নিয়ে আমরা আশাবাদী হতে পারছি না। তাদের নিয়ে আমাদের স্বপ্ন হতাশার কাফনে মোড়া। তরুণদের উলেস্নখযোগ্য একটি অংশ বিপথগামী, দিকভ্রান্ত ও অবক্ষয়গ্রস্ত। তারা ইয়াবা, চরস, গাঁজা, মদ, সিগারেটসহ বিভিন্ন ধরনের নেশায় আসক্ত। অনেকেই আসক্ত হয়ে পড়ছে ফেনসিডিল আর হিরোইনের মতো নেশাদ্রব্যে। পাশাপাশি এই মাদকসেবনের মাধ্যমে একই সিরিঞ্জ বারবার ব্যবহার করায় দুরারোগ্য সব রোগ ছড়িয়ে পড়ছে প্রান্তিক পর্যায়ের নগর-তরুণদের মধ্যে। এমনকি টাকার লোভে অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে চোরাচালানের কাজেও। প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে মাদকসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে তরুণরা। জীবনের একদম শুরু থেকেই নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়ে বেড়ে ওঠে এক শ্রেণির তরুণ। ফলে এদের একটি বড় অংশই বিপথগামী হয়ে পড়েছে। জীবনের প্রতি তাদের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। বস্তির তারুণ্য আরও ভয়ঙ্কর। হেন কোনো অপরাধ নেই যে তারা করে না। মাদকসেবন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, খুন, ধর্ষণ ও গণধর্ষণ সব ধরনের অপরাধের সঙ্গে তারা জড়িত। এরা ভাড়াটে তুনি হিসেবেও কাজ করে। কেবল বস্তির তারুণ্যই নয়, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের তারুণ্য চরমভাবে অবক্ষয়গ্রস্ত ও বিপথগামী। এরাও নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। এদের একটি অংশ জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গেও জড়িত। তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগে এরা একেবারেই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। লেখাপড়ার দিকে তাদের কোনো মনোযোগ নেই। সারাক্ষণ স্মার্ট ফোন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে। এই ঘাঁটাঘাঁটি চলে গভীর রাত পর্যন্ত। ফলে ঘুম থেকে সকালে ওঠার পরিবর্তে দুপুরে উঠে লাঞ্চ করে। তারা ঘরে-বাইরে কী করে, কোথায় যায়, পরিবারের সদস্যরা জানে না। অভিভাবকদের জানানো হয় না তাদের কর্মকান্ড। অভিভাবকরা এ বিষয়ে কথা বললে, প্রশ্ন করলে জবাব দেয়, তোমরা কী বোঝ? অথবা এড়িয়ে গিয়ে প্রসঙ্গান্তরে চলে যায়। তারুণ্য এখন দিকহারা দিশাহারা উগ্র উদ্‌ভ্রান্ত। তারা মা-বাবা অভিভাবকদের কথা শোনে না, শোনে না বড় ভাই-বোনসহ অন্য অভিভাবকদের কথাও। তাদের উপদেশকে তারা হাস্যকর মনে করে। গুরুজনদের শ্রদ্ধা বা ভক্তি করা এসব তো উঠে গেছে অনেক আগেই। ফলে পরিবারের সদস্যরা তাদের ব্যাপারে হতাশ ও দিশাহারা। তারা লেখাপড়া বিমুখ, কর্মবিমুখ, পরিবার ও সমাজ বিমুখ। তারা আত্মীয়স্বজন বিমুখ। তারা নতুন চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতা বিমুখ। তাদের ভেতর নেই মানবিকতা ও স্বাভাবিক সৌজন্যবোধ। তারা দিনে দিনে নিষ্ঠুর হয়ে যাচ্ছে, জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে। বিচ্ছিন্নতাবোধ তাদের আঁকড়ে ধরছে। তারা রাস্তার মোড়ে জটলা করে। উচ্চশব্দে অর্থহীন হাসি হাসে, অশ্লীল কথা বলে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার শলাপরামর্শ করে ও যৌনতা নিয়ে কথা বলে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, কিংবা সৃষ্টিশীল বিষয়ে তাদের মধ্যে কোনো আলাপ নেই। একেক সময় ভাবি, এই অবক্ষয়গ্রস্ত তারুণ্য নিয়ে আমরা কতদূর এগিয়ে যেতে পারব। এরা পরিবারের কারও দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহী। সবসময় এদের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা কাজ করে। ঘরের খাবার তাদের পছন্দ নয়, এরা ফাস্ট ফুডনির্ভর। আমাদের তরুণরা ধীরে ধীরে অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং এক সময় তারা তলিয়ে যাবে। তখন আমাদের কিছুই করার থাকবে না। আমরা যদি পেছনের দিকে তাকাই তা হলে দেখতে পাব, ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শিক্ষিত তরুণরা জীবন দিয়ে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করেছিল। ১৯৬৬ সালের ৬-দফা আন্দোলনে, ১৯৬৯ সালের গণ-অভু্যত্থানেও ছাত্র-তরুণদের ছিল উলেস্নখযোগ্য উজ্জ্বল ও অগ্রণী ভূমিকা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের তরুণ সমাজ যে অবদান রেখেছে তা জাতি কোনো দিন ভুলবে না এবং শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণদের যে অসামান্য ভূমিকা তাও অবিস্মরণীয়। আজ শুধু বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়- দেশের স্কুল-কলেজেও তরুণরা পড়ালেখা বাদ দিয়ে রক্তের হোলি খেলায় মেতে উঠেছে। এটা জাতির জন্য এক অশুভ বার্তা। আর যাই হোক, এমন তারুণ্য তো আমরা চাইনি। দেশ গড়ার বাতিঘর বলা হয় দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে। পূর্ব প্রজন্মের ইতিহাস, ঐতিহ্য নিয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। ইতিহাসকে পুঁজি করেই তাদের পথচলা। অথচ আমরা কী দেখতে পাচ্ছি। অসুস্থ ও নোংরা ছাত্ররাজনীতি করছে তরুণরা। ইদানীং তরুণদের হাতেই তরুণরা বলি হচ্ছে, অবলীলায় তাদের জীবন চলে যাচ্ছে। দেশে তৈরি হয়েছে কিশোর গ্যাং। ১০ বছর আগেও তা ভাবা যায়নি। আমরা যদি দেশের জাতীয় রাজনীতির দিকে তাকাই তা হলে কী দেখতে পাব। জাতীয় রাজনীতিতে চলছে পেশিশক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার, লুটপাট আর দুর্নীতির মহোৎসব। এর কুপ্রভাব পড়ছে তরুণদের ওপরও। তারা অপরাধের মূল ধারার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ অবস্থা আর কতকাল চলবে। আমাদের তরুণরা স্বাধীন দেশে আর কত অপকীর্তি করে বেড়াবে এবং তা প্রত্যক্ষ করবে জাতি। এ থেকে মুক্তি পাবে না দেশ? আসলে আমরা আজ যে রাষ্ট্র ও সমাজে বাস করছি সে সমাজ, রাষ্ট্র তরুণদের সঠিক পথে আনতে পারছে না। আমরা নানারকম সামাজিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেও বারবার ব্যর্থ হচ্ছি। পা পিছলে ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছি। সমাজের একজন সুস্থ এবং বিবেকবান মানুষ হিসেবে এমন পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কি সামাজিক ক্ষেত্রে, কি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, সর্বক্ষেত্রেই অবক্ষয় দেখতে পাচ্ছি- যা একজন শান্তিকামী মানুষ হিসেবে আমরা স্বাধীন ও একটি গণতান্ত্রিক দেশে কল্পনা করতে পারছি না। এ অবক্ষয় ইদানীং আরও প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। সামাজিক মূল্যবোধ তথা ধৈর্য, উদারতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ন্যায়পরায়ণতা, শৃঙ্খলা, শিষ্টাচার সৌজন্যবোধ, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায়, নান্দনিক সৃষ্টিশীলতা, দেশপ্রেম, কল্যাণবোধ, পারস্পরিক মমতাবোধ ইত্যাদি নৈতিক গুণাবলি লোপ পাওয়ার কারণেই সামাজিক অবক্ষয় দেখা দেয়- যা বর্তমান সমাজে প্রকট। সামাজিক নিরাপত্তা আজ ভূলুণ্ঠিত। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, দেশের সামগ্রিক যে অবক্ষয়ের চিত্র এবং তারুণ্যের যে অবক্ষয় এর থেকে পরিত্রাণের কোনো পথই কি আমাদের খোলা নেই? আমাদের অতীত বিস্মৃতির অতল গহ্বরে নিমজ্জিত, বর্তমান অনিশ্চিত এবং নিরাপত্তাহীনতার দোলাচলে দুলছে এবং ভবিষ্যৎ মনে হচ্ছে যেন পুরোপুরি অন্ধকার। কেবল রাজনীতিবিদরাই নন, এই বিপথগামী তারুণ্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে কলুষিত করছে, সমাজকে ভারসাম্যহীন ও দূষিত করে তুলছে। চারদিকে যে সামাজিক অবক্ষয় চলছে, চলছে তারুণ্যের অবক্ষয়- এর কি কোনো প্রতিষেধক নেই? তারুণ্যের অতীত গৌরব হারিয়ে গেছে, অতীত ইতিহাস ভুলে তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। তারা যদি সঠিকপথে পরিচালিত না হয়, তা হলে দেশের সামনে কঠিন বিপদ অপেক্ষা করছে। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, তারুণ্যের গৌরবদীপ্ত ফসল বর্তমান স্বাধীন সার্বভৌম উন্নয়নশীল বাংলাদেশ। ইতিহাসধন্য তারুণ্য একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ও লাল-সবুজ পতাকার জন্ম দিয়েছে। সুতরাং তারুণ্যকে পরিচালিত করতে হবে ইতিবাচক ধারায় ইতিহাসের পথরেখায়। সেজন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের যথেষ্ট করণীয় রয়েছে। মনে রাখতে হবে, এরাই ভবিষ্যতের কর্ণধার, দেশের কান্ডারি। তারা নানা আবিষ্কারের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে সুনাম অর্জন করছে। বিদেশের মাটিতে তরুণরা সফল নেতৃত্ব দিচ্ছে, দিচ্ছে সততার পরিচয়। তারা যাতে সঠিকপথে পরিচালিত হয়, তাদের বিকাশ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় রাষ্ট্রকে সেদিকে গভীর মনোযোগ দিতে হবে, দিতে হবে পরিবারকেও, রাখতে হবে সতর্ক দৃষ্টি এবং এর কোনো বিকল্প নেই। সালাম সালেহ উদদীন : কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক সাংবাদিক ও কলাম লেখক

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে