বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে

বঙ্গবন্ধু তার প্রথম পাবনা সফরে আসছেন। আমরা স্টেডিয়াম মাঠে কয়েকটা লাইনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছি তাকে সংবর্ধনা জানাতে। রুশ হেলিকপ্টার থেকে তিনি নামলেন। গার্ডস অব অনারের পর তিনি লাইনগুলোতে এসে সবার সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন। আমি তৃতীয় লাইনে অপেক্ষমাণ। প্রথম লাইনে জনা বিশেকের সঙ্গে করমর্দন করতেই তার চোখ পড়ল আমার দিকে এবং ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে বললেন, কী রণেশ বাবু, বলেছিলাম না, বাংলাদেশ স্বাধীন হবে।
বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে

১৯৫৩ সালের মাঝামাঝি (সম্ভবত) আওয়ামী মুসলিম লীগ সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে দলীয় সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানসহ পাবনা সফরে আসেন। করবেন কর্মী ও জনসভা। ছাত্র ইউনিয়ন কোনো দলের সহযোগী বা অঙ্গসংগঠন ছিল না। ছিল যথার্থ অর্থে একটি ছাত্র গণসংগঠন। তাই আওয়ামী লীগের ওই কর্মিসভায় যাওয়া আমরা সমীচীন বোধ করলাম না- আহ্বানও পাইনি। কিন্তু দেশের একমাত্র বিরোধী দলের (তৎকালীন সময়ের) দুই শীর্ষ ও জনপ্রিয় নেতার পাবনা আগমনকে কেন্দ্র করে আমরা মন থেকে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ১৯৫৪ সালের প্রথম দিকে অনুষ্ঠিতব্য প্রাদেশিক নির্বাচনে খুনি নূরুল আমিনের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগকে পরাজিত করে মুসলিম লীগ বিরোধী এক গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অপরাপর দলকে একটি যুক্তফ্রন্ট গঠনের অনুরোধ জানানোর তাদের সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ছাত্র ইউনিয়নের এক প্রতিনিধি দলসহ দেখা করতে গেলাম আনুমানিক সকাল ৯টার দিকে। আসলে আওয়ামী লীগ তখনও গঠনপ্রক্রিয়া শেষ করতে পারেনি- তাই যথেষ্ট সাংগঠনিক শক্তি ও অর্জন করতে পারেনি।

যাহোক গিয়ে মুজিবভাইকে পেয়ে গেলাম-পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত জননেতা আবদুর রব বগা মিয়ার শালগাড়িয়ার বাসভবনে যেমন- বগা মিয়াকে বগাভাই বলে ডাকতাম তেমনই শেখ মুজিবকে (তখন তিনি তরুণ) মুজিবভাই বলেই সম্বোধন করে আমাদের সবার পরিচয় তাকে জানালাম। তিনি করমর্দনের জন্য হাত এগিয়ে দিলেন। পরে হেসে বললেন, তবে তো সবাই কমরেড। ছাত্র ইউনিয়ন তো কমিউনিস্ট। হেসে আমিও জবাব দিলাম, খুব অল্পসংখ্যক ছাত্র ইউনিয়ন নেতাকর্মী কমিউনিস্ট- বাকী বৃহত্তর অংশ অকমিউনিস্ট তবে কেউই অ্যান্টি কমিউনিস্ট নয়। ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যে বিস্তর আওয়ামী লীগ সমর্থক ও থাকার কথা ছিল- কিন্তু আপনাদের দলের নামের সঙ্গে তো সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ আছে- 'আওয়ামী মুসলিম লীগ' হওয়ায়। ছাত্র ইউনিয়ন পূরোদস্তুর সাম্প্রদায়িকাতবিরোধী।

মুজিবভাই হেসে বললেন, না, আওয়ামী লীগ ও অসাম্প্র্রদায়িক দল কদাপি সাম্প্রদায়িকতার চর্চা করে না যদিও দলের নাম দেখে তেমন ধারণার সৃষ্টি হওয়া সম্ভব। আগামী নির্বাচনের পরে সুবিধাজনক কোনো এক সময়ে আমরা দলের নাম থেকে 'মুসলিম' শব্দ তুলে দেবো।

যা হোক, অবশেষে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হলো হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে। কমিউনিস্ট পার্টিকে যুক্তফ্রন্টে নেওয়া সম্ভব হলো না। তবে পার্টির পক্ষ থেকে পৃথকভাবে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো নির্দিষ্ট কয়েকটি আসনে। বাকি সব আসনে কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিধাহীনভাবে যুক্তফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থীদের সমর্থন দেবে- পার্টি এ সিদ্ধান্ত যুক্তফ্রন্টকে জানিয়ে দিল। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ১০টি আসন বাদে বাকি সব আসনে বিজয়ী হলো- কমিউনিস্ট পার্টি পেল ৪টি আসন। তবে যুক্তফ্রন্ট তাদের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানায়নি।

শেরে বাংলার নেতৃত্বে পূর্ববাংলায় ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করলেও মিথ্যা অজুহাতে কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ সরকার মাত্র ৫৮ দিনের মাথায় তৎকালীন ৯২(ক) ধারার ক্ষমতাবলে পূর্ববাংলা মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে গভর্নরী শাসন কায়েম করে হাজার হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী, কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মী, ছাত্র ইউনিয়ন-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীকে বিনা বিচারে আটক করে জননিরাপত্তা আইনে। আমরাও বাদ পড়ি না। মুক্তি পাই ১৩ মাস পরে। তখন শেরেবাংলা এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ সরকারের মন্ত্রিত্বে অধিষ্ঠিত হয়। মওলানা ভাসানী ৯২(ক) ধারা জারির আগে থেকেই স্টকহোমে বিশ্বশান্তি পরিষদের আমন্ত্রণে আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনে অংশ নিতে স্টকহোমে- তবে দেশে ফিরলেই তাকে গ্রেপ্তারের হুমকি দিল কেন্দ্রীয় সরকার।

এ প্রসঙ্গে আর নয়। এবারে ষাটের দশকের প্রসঙ্গে আসি। তখন আইয়ুবের সামরিক শাসন চলছে। ১৯৬৬ সালের কথা। তার আগে ১৯৬৫ সালে ভারত পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। পাকিস্তান পরাজিত হয়। লাহোরে অনুষ্ঠিত হয় সর্বদলীয় সম্মেলন। মুজিবভাই তার দলীয় নেতাদেরসহ ওই সম্মেলনে গিয়ে ঐতিহাসিক ছয় দফা প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পেশ করা মাত্র সম্মেলন আহ্বানকারী ও অংশগ্রহণকারী ডানপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল মহলগুলো ওই কর্মসূচিকে অনুমোদন করা দূরের কথা- তার মধ্যে খুঁজে পেলেন বিচ্ছিন্নতাবাদের ষড়যন্ত্র-পাকিস্তান ভাঙার চক্রান্ত এবং দেশ দ্রোহিতার অপরাধ। বিরোধীদলীয় সম্মেলন হলে কি হবে- সেখান থেকে দাবি উঠল দেশদ্রোহিতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রচারক হিসেবে শেখ মুজিবকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা হোক। পশ্চিম পাকিস্তানের সব সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় ব্যানার হেডিংয়ে ওই চক্রান্তের খবর রং ছড়িয়ে ফলাও করে প্রচার করা হয়, শেখ মুজিবের গ্রেপ্তারের দাবিও জানানো হয়। সদলবলে বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন ঢাকায়। সেখানে সাংবাদিক সম্মেলন করে পুনরায় ছয় দফা কর্মসূচি ও তার সঠিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেন সবিস্তারে। তবু তিনিসহ কয়েকজন প্রথম সারির আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেপ্তার হন ঢাকা থেকে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নেতাদের এনে বঙ্গবন্ধুকে দেওয়ানী ওয়ার্ডে রেখে বাকি সবাইকে যথা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ প্রমুখকে ভিন্ন ভিন্ন জেলে বদলি করে দেওয়া হয়। রচনা করা হয় এক ভীতিকর পরিবেশ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে।

আমি যুদ্ধ শুরু হওয়ার থেকেই গ্রেপ্তার হই ১৯৬৫ সালে। আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রেপ্তারের সময়েও মুক্তি পাইনি। আটক রয়েছি পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইনে বিনাবিচারে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে। ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ও আইজি প্রিজনসের অনুমতি পেয়েছি কারাভ্যন্তরে থেকেই এলএলবি ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার। কিছুদিনের মধ্যেই আমাকে বদলি করে দেওয়া হলো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কারণ আটক বন্দিদের মধ্যে যারাই পরীক্ষা দিতে ইচ্ছুক তাদের সবার পরীক্ষার কেন্দ্র ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমাকে সেখানকার পুরাতন ২০ সেলের স্থান দেওয়া হলো। ওই সেলে ঢুকিয়ে প্রধান দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে দিয়ে বলা হলো সেলের অভ্যন্তরেই আমার গতিবিধি সীমাবদ্ধ থাকবে। আমিও পরীক্ষার প্রস্তুতিমূলক পড়াশোনার অনুকূল পরিবেশের জন্য নিরিবিলিই থাকতে চেয়েছিলাম। তাই সেলে রাখার জন্য আমার দিক থেকে কোনো অভিযোগ ছিল না। আমাকে যখন আটকে রেখে ডেপুটি জেলার চলে যান তখন আনুমানিক বেলা ১২টা। খানিক পর সেলের অভ্যন্তরে প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড়-বইপত্র গুছিয়ে রেখে ঘাটে শুয়ে বিশ্রাম করে স্নানের জল চলে এলো। তাড়াতাড়ি স্নান সেরে দেখি টেবিলে খাবার রেখে গেছে খাবারের দায়িত্বে থাকা কয়েদিরা। খেয়ে নিয়ে বেলা দুটোর দিকে বিছানায় শুয়ে দিব্যি একটা ঘুম দিলাম। রাজশাহী থেকে রাত জেগে ঢাকা আসায় (ট্রেনে) তখন খুব ঘুম পাচ্ছিল। টানা ঘুম শেষে জেগে দেখি প্রায় পাঁচটা। হুড়মুড় করে উঠে চোখ-মুখ ধুয়ে এক পেয়ালা চা খেয়ে আবারও যেন ঘুম ঘুম বোধ করছিলাম। হঠাৎ দেখি মেইন দরোজা খুলে হেড ওয়ার্ডার এসে হাজির। বললেন একটু সামনে এসে দেখুন, এক ভদ্রলোক আপনাকে ডাকছেন। জিজ্ঞেস করলাম, কে? ইন্টারভিউ নাকি? তিনি হেসে বললেন, বাইরে বেরোলেই দেখতে পাবেন- সেলের সামনেই আছেন তিনি।

বেরিয়ে বিস্মিত নয়নে দেখি বিশাল বপু এবং সাহসদীপ্ত জননেতা শেখ মুজিবুর রহমান- আমাদের মুজিবভাই। তিনি ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন, গভীরভাবে আলিঙ্গনাবদ্ধ করলেন। অতঃপর কুশলাদি বিনিময়। মুজিবভাই বললেন, ছয় দফা ঘোষণা করেই তো কারাগারে এসে স্থান নিয়েছি। বাইরে জনগণ কি ভাবছে তার খবর তেমন একটা জানি না। আপনি সদ্য বাইরে থেকে এলেন- টাটকা খবর বলুন। এই প্রথম মুজিবভাই আপনি বলে সম্বোধন করলেন।

যাহোক বললাম, টাটকা খবর তো নেই মুজিবভাই আমি তো আপনার বহু আগে থেকেই আটক। তা বছর খানেক তো হবেই। তবে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সিরাজগঞ্জ জগন্নাথগঞ্জ ঘাট দিয়ে ঢাকা আসতে যে প্রায় ২৪ ঘণ্টা বাইরে ছিলাম ট্রেনে ও স্টিমারে সেই সময় যাত্রীদের মধ্যেকার কথাবার্তা থেকে বুঝছি আগে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়েছিলেন ছয় দফা কর্মসূচি প্রকাশিত হওয়ার পর। ধীরে ধীরে তা কেটে যাচ্ছে এবং ছয় দফার প্রতি দেশবাসীর সমর্থন প্রতিদিনই বাড়ছে। আমার দলের নেতারাও তো জেলে তবুও বাইরে যোগাযোগ করে যতটুকু যখন জানতে পারব-বলব আপনাকে।

মুজিবভাই বললেন, বাইরে যোগাযোগের জন্য চিঠি লিখে আমার কাছেও দিতে পারেন- যাকে দিতে বলেন তার কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব পালনে আমি রাজি আছি। আমার অনেক চ্যানেল আছে। ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম তার সম্ভবত দরকার হবে না। আমাদের দলীয় চ্যানেল আছে সেই চ্যানেলে মাঝেমধ্যে তারাই গুরুত্বপূর্ণ খবরাদি জানাবেন। তবে প্রয়োজন হলে আপনাকেও বলব।

মুজিবভাই কথাগুলো বলছিলেন হাঁটতে হাঁটতে। আমাকে বললেন, যতদিন এই সেলে থাকেন সকালে এক ঘণ্টা বিকালে এক ঘণ্টা দুজনে হাঁটাহাঁটি করব, কথাবার্তা বলব, খবরাদি আদান-প্রদান করব। বললাম আমাকে ডেপুটি জেলার বলে গেছেন অন্য কথা। মুজিবভাই বললেন, ওরা বলবেই- কারণ আমার সঙ্গে কারও যেন যোগাযোগ না হয় তেমন অর্ডার উপরমহল থেকে আছে। তবে আপনার আসার খবর পেয়ে আমি তাদের সঙ্গে কথা বলে এই ব্যবস্থা করেছি। সুতরাং অসুবিধে হবে না। তবে জেলার ঢুকলে সেলে চলে যাবেন। হেড ওয়ার্ডার এসে আগেই খবর দিয়ে যাবে।

বস্তুত মুজিবভাই তো যে কোনো কারাগারে মুকুটহীন সম্রাট। তার কথা কে না শোনে? তাই এক মস্ত সুযোগ পাওয়া গেল হাঁটাহাঁটি এবং কথাবার্তার। নইলে লেখাপড়ার সময়টুকু বাদে একাকিত্বের যন্ত্রণায়ও ভুগতে হতো বাকি সময়টুকু। অবশ্য দীর্ঘ কারাজীবনে অভ্যস্ত হওয়ায় এগুলো সবাই গা-সহা হয়েছে অনেক আগেই। তাই বেশ নির্বিঘ্নেই হাঁটতাম-বেড়াতাম-কথাবার্তা বলতাম প্রতিদিন সকাল-বিকাল এক ঘণ্টা করে দুই ঘণ্টা। সংবাদপত্রের খবরগুলোও আমাদের বিষয়বস্ত হতো আলোচনার।

একদিন বললেন, মাঝেমধ্যে উদ্বিগ্ন বোধ করি, ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ তো একা হয়ে গেছে কোনো দলই এই কর্মসূচির পক্ষে সমর্থন জানায়নি। আপনাদের ন্যাপ তো এটাকে সিআইয়ের কর্মসূচি-বিচ্ছিন্নতাবাদের কর্মসূচি বলে অভিহিত করেছে। প্রতিবাদ জানিয়ে বললাম মুজিবভাই আপনি কি খবর রাখেন না- ন্যাপের চীনাপন্থিরা এ কথা বলে আমরা যারা রুশপন্থি বলে পরিচিত তারা তো বিবৃতি দিয়েই ছয় দফা কর্মসূচিকে সমর্থন দিয়েছি। আমিও তো সেই দলেই। মুজিবভাই বললেন, সৈয়দ আলতাফ অন্যরা তো? বললাম হঁ্যা। মুজিবভাই বললেন হঁ্যা আপনারা সমর্থন জানিয়েছেন ঠিকই। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।

বঙ্গবন্ধুর এই সান্নিধ্য বস্তুতই এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে পেয়েছিলাম বলা চলে ওই দিনগুলো ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের নবোত্থানের উত্তাল দিন। সন্ধ্যায় যখন মুজিবভাই তার কক্ষে, আমি আমার সেলে তালাবদ্ধ হতাম- তার কিছুক্ষণ পরেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের শক্ত সুউচ্চ প্রাচীর ভেদ করে বিশাল বিশাল মশাল মিছিলের স্স্নোগানের আওয়াজ ভেসে আসত, 'জয় বাংলা' জেলের তালা ভাঙব- রাজবন্দিদের আনব, 'ছয়দফা-এগার দফা-মানতে হবে, মানতে হবে'- তখন মনে হতো মিছিলকারীদের পদভারে বিশাল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দেওয়ালগুলোর প্রতিটি ইট কেঁপে কেঁপে উঠছে-আমাদের ইচ্ছে হচ্ছে ছুটে বেরিয়ে ওই মিছিলে যোগ দিই। আর ওদিকে মুজিবভাই জেলপুলিশ পাঠিয়ে জানতে চাইতেন- মিছিলের আওয়াজ শুনেছি কিনা। সেই মুহূর্তগুলো ছিল যথার্থই-রোমাঞ্চকর।

অতঃপর কোনো একদিনের (তারিখটা মনে নেই) বিকালে সেলে বসে আছি। হঠাৎ হেড ওয়ার্ডার শ্লিপ নিয়ে এসে হাজির। তাড়াতাড়ি অফিসে যেতে হবে-ইন্টারভিউ আছে-এই খবর নিয়ে। ইন্টারভিউয়ের খবর পেয়ে অবাক হলাম। আমি তো কারও ইন্টারভিউ চেয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো আবেদন জানাইনি। তবু কাপড়-চোপড় পরে রেডি হয়ে গেলাম রাজবন্ধীদের জন্য নির্দিষ্ট লম্বা ইন্টারভিউ রুমে। হাতে ডিটেনশন অর্ডারটা। ঢুকতেই দেখি মুজিবভাই বসা। সামনে বসে আছেন এক বয়স্ক মহিলা- সঙ্গে এক কিশোরী কন্যা। তাদের কাউকে চিনতাম না। আর অন্যপ্রান্তে বসে আছেন আমার বাল্যবন্ধু ব্যারিস্টার আমীর উল-ইসলাম। তিনিই এসেছেন নিজ উদ্যোগে আমার সঙ্গে দেখা করতে। তার দিকে পা বাড়াতেই মুজিবভাই একটু দাঁড়াতে বলে ভাবীর দিকে ঈশারা করে বললেন, 'আপনার ভাবী'। আমি তাকে সশ্রদ্ধ সালাম জানালাম। আর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ইনি তোমার চাচা রণেশ মৈত্র। পাবনার ন্যাপের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা। বয়সে আমার জুনিয়র হলেও আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহকর্মী। সালাম কর।' হাসিনা এগিয়ে আসতে নিলে বললাম, না, তোমাকে আসতে হবে না, তুমি অনেক বড় নেতার মেয়ে, নিজেও ভবিষ্যতে বড় কিছু একটা হবে আশা করি। সেভাবে নিজেকে গড়ে তোলো। হাসিনা কপালের দিকে হাত তুলে সালাম জানালেন।

অতঃপর ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলামের সামনে গিয়ে পৃথক চেয়ার-টেবিলে বসলাম। তিনি আমার আটকাদেশ বেআইনি এবং অবৈধ দাবি করে আমার মুক্তির নির্দেশ প্রার্থনা করে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করতে চান। এ ব্যাপারে আমার সম্মতি চাইলে দিলাম। আটকাদেশটি চাইলে ডেপুটি জেলারের মাধ্যমে ব্যারিস্টার আমীরকে তা দিলাম। বাইরের কিছু খবরাখবরও আকারে-ইঙ্গিতে শুনলাম। মুজিবভাই হঠাৎ আমীর-উল-ইসলামকে লক্ষ্য করে বললেন, 'শোন আমীরুল, টাকা যা লাগে আমি দেব। তুমি রিটটা ভালো করে করবে। রণেশ বাবু বাইরে গেলে অনেক কাজ হবে। হেসে আমীরুল বললেন, 'না টাকা লাগবে না। রণেশ আমার বাল্যবন্ধু- ওর সঙ্গে আমিও জেল খেটেছি অতীতে। ওর কেস অবশ্যই ভালোভাবে করব। বলেই ওকালতনামাতে আমার সই নিয়ে ডেপুটি জেলারকে দিয়ে তা ধঃঃবংঃবফ করিয়ে নিলেন। আসলেই তিনি একটি পয়সাও না নিয়ে খেটে-খুটে রিটটি করে কয়েক মাসের মধ্যেই উচ্চ আদালতের নির্দেশে আমাকে মুক্ত করলেন। তৎকালীন রাজবন্দিদের আরও অনেকের আটকাদেশ চ্যালেঞ্জ করে একইভাবে তাদেরও মুক্ত করেছেন। আমীরুল ওই সময়ে রিটগুলোর মাধ্যমে বেশ জনপ্রিয় আইনজীবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

ওই দিন ইন্টারভিউ শেষে ফিরে এসে আর হাঁটার সময় পাওয়া গেল না। মুজিবভাইও পাননি।

১৯৭২-এর ফেব্রম্নয়ারি। স্বাধীন বাংলাদেশের অভু্যদয় ঘটেছে। বঙ্গবন্ধু তার প্রথম পাবনা সফরে আসছেন। আমরা স্টেডিয়াম মাঠে কয়েকটা লাইনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছি তাকে সংবর্ধনা জানাতে। রুশ হেলিকপ্টার থেকে তিনি নামলেন। গার্ডস অব অনারের পর তিনি লাইনগুলোতে এসে সবার সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন। আমি তৃতীয় লাইনে অপেক্ষমাণ। প্রথম লাইনে জনা বিশেকের সঙ্গে করমর্দন করতেই তার চোখ পড়ল আমার দিকে এবং ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে বললেন, কী রণেশ বাবু, বলেছিলাম না, বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। হলো তো? জবাবে হাসতে হাসতে বললাম, হঁ্যা মুজিবভাই, হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু আপনার কেবলায় নয়- আমার বলা কেবলায়।

বঙ্গবন্ধু বললেন, সেই পাঁচ বছর আগের কথা- তাও জেলখানায়। আজও মনে আছে? আবারও কোলাকুলি।

রণেশ মৈত্র: সাংবাদিক ও রাজনীতিক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে