logo
রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২০ ৯ কার্তিক ১৪২৭

  আলতাব হোসেন   ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০  

সর্বোচ্চ মজুতে স্বস্তিতে দেশ

করোনাকালেও খাদ্য উৎপাদনে রেকর্ড

করোনাকালেও খাদ্য উৎপাদনে রেকর্ড
করোনাভাইরাসের মহামারিকালেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। ধান উৎপাদনে বিশ্বে একধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয় ধান উৎপাদনকারী দেশ। করোনা বিপর্যয়ের মধ্যেও সর্বোচ্চ খাদ্য উৎপাদন ও মজুত নিয়ে স্বস্তিতে বাংলাদেশ। বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়লেও দেশের খাদ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই। যে পরিমাণ মজুত আছে তাতে, প্রয়োজন হলে বিশ্বে চাল রপ্তানিও করতে পারবে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ধান উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে থাকলেও করোনাকালে বাম্পার ফলনে তৃতীয় অবস্থানে ওঠে এসেছে। এর আগে তৃতীয় অবস্থানে ছিল ইন্দোনেশিয়া। ধান উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম চীন ও দ্বিতীয় ভারত। চলতি বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কৃষি বিভাগ ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক প্রতিবেদনে এই সুসংবাদ দিয়েছে। বাংলাদেশ এখন চাল রপ্তানিকারক ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ।

করোনাকালে সর্বোচ্চ আতঙ্ক ছিল বোরো ধানের উৎপাদন নিয়ে। সব আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে এবার রেকর্ড পরিমাণ সর্বোচ্চ দুই কোটি দুই লাখ টন বোরো ধান উৎপাদন হয়েছে। আগের দুই বছর উৎপাদন ছিল এক কোটি ৮৬ লাখ টন। আমন উৎপাদন হয়েছে এক কোটি ৫৩ লাখ টন। আগের বছর আমন হয় এক কোটি ৩৩ লাখ টন। চলমান দীর্ঘ বন্যায় দুই লাখ টন ধান নষ্ট হওয়ার পরও চলতি আউশ মৌসুমে ৩৪ লাখ টন আউশ ধান উৎপাদন হয়েছে। এবার বোরো আউশ ও আমনের বাম্পার ফলনে ধান-চাল গড়াগড়ি খাচ্ছে কৃষকের ঘরে, মহাজনের চাতালে, চালকল ও খাদ্যগুদামে।

এ বিষয়ে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, বাংলাদেশ এখন খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশ। পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত আছে। তিনি জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর ) পর্যন্ত সরকারি গুদামে সিদ্ধ চাল ১০ লাখ ৩৪ হাজার টন মজুদ আছে। আতপ চাল আছে দেড় লাখ টন, ধান আছে প্রায় ১২ লাখ টন, গম আছে এক লাখ ২৩ হাজার টন। চলতি মাসেই রাশিয়া থেকে দুই লাখ টন গম কেনা হচ্ছে। গম কেনায় ব্যয় হচ্ছে ৪৩৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। বেসরকারি চালকলগুলোতে প্রায় ১৭ লাখ টন চাল মজুত আছে। দাম বাড়ার আশায় কৃষকরাও নিজেদের গোলায় ধান মজুত রাখছেন। তারপরও চাল আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে দিয়ে আমদানির পথ খোলা রেখেছে। আগামী চলতি বছরের নভেম্বরে আমন থেকে আসবে আরও প্রায় দেড় কোটি টন ধান।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবদুল মুঈদ বলেন, ইতোমধ্যে সারাদেশে আমন রোপণ হয়েছে ৫৮ লাখ ৯৫ হাজার ২১৫ হেক্টর জমিতে। এবার পর্যাপ্ত বৃষ্টিতে দেশের উত্তরাঞ্চল ও উঁচু এলাকা বরেন্দ্র অঞ্চলেও আমনের বাম্পার ফলনের আশা করা হচ্ছে। এবার আমন থেকে টার্গেট এক কোটি ৫৭ লাখ টন। গত বছর আমন হয়েছিল দেড় কোটি টনের বেশি।

ফিলিপাইন, চীন ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশ ভিয়েতনাম চালের অন্যতম আমদানিকারক। দেশটি চাল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় এসব দেশে চালের সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। চাল

আমদানিকারক দেশ ফিলিপাইনে মাত্র তিন মাসের চাল মজুত আছে। চালের বাণিজ্য দীর্ঘসময় ধরে স্থবির হয়ে থাকলে ফিলিপাইনসহ এশিয়া ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশ নাজুক অবস্থায় পড়বে। শীর্ষ আমদানিকারক ইন্দোনেশিয়াসহ এশিয়ার বড় আমদানিকারক দেশগুলোর হাতে নভেম্বর পর্যন্ত গমের মজুত আছে।

ভিয়েতনামের চাল ব্যবসায়ীরা গণমাধ্যমকে বলেছেন, ভিয়েতনাম চাল রপ্তানি বন্ধ করেছে, ভারত এবং থাইল্যান্ড হ্যা বা না কিছুই বলছে না রপ্তানি নিয়ে। থাইল্যান্ডে চালের দাম বেড়েছে, যা ২০১৩ সালের আগস্টের পর সর্বোচ্চ। বিশ্বে নবম গম রপ্তানিকারক কাজাখাস্তান রপ্তানি সীমিত করেছে।

অপরপক্ষে আমদানিকারকদের দিক থেকে ইরাক ঘোষণা দিয়েছে তারা ২০ লাখ টন গম ও দুই লাখ টন চাল কিনবে। দেশটির 'ক্রাইসিস কমিটি' খাদ্য মজুতের পরামর্শ দেওয়ার পর তারা এই আমদানির ঘোষণা দিয়েছে। এরই মধ্যে শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে (সিবিওটি) গমের দাম ৪ শতাংশ বেড়েছে। চিনি ও ভোজ্যতেলের দামও বাড়তির দিকে। সরবরাহ সংকটের কারণে চলতি মাসে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক মূল্যসূচক সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিভাগ (এফএও)।

ইউরোপের দেশ সার্বিয়া সূর্যমুখী তেলসহ কয়েকটি পণ্যের রপ্তানি স্থগিত করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে চাল রপ্তানিতে ক্লিয়ারেন্স দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে ভিয়েতনামের রাজস্ব বিভাগ। সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ দিয়েছে রাশিয়া। রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শস্য রপ্তানিকারক দেশ। বিভিন্ন দেশ শস্য ও খাদ্যপণ্য রপ্তানি সাময়িক বন্ধ করে দেয়ায় টালমাটাল খাদ্য পণ্যের বাজার। করোনাভাইরাস মহামারিতে আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ায় খুচরা ক্রেতারা অতিরিক্ত খাদ্যপণ্য ক্রয় করছেন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে দফায় দফায়।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এক প্রতিবেদনে বলেছে, করোনাভাইরাসের আক্রান্ত ও মৃতু্যর সংখ্যা বাড়ায় খাদ্য সরবরাহ চক্রে ইতোমধ্যেই চাপ পড়েছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে বিভিন্ন দেশ অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যসহ সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ হয়েছে। এমন পরিস্থিতি কারণে খাদ্য সংকট সৃষ্টি হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য সংস্থার। সংস্থাটির প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিম টোরেরো বলেছেন, ফসলের উৎপাদন ভালোই হয়েছে বিভিন্ন দেশে। তবে করোনার কারণে শ্রমিক সংকট তৈরি হয়েছে। নিজ দেশের খাদ্য সুরক্ষাব্যবস্থার ফলে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ করায় সামনের দিনগুলোতে সমস্যা দেখা দিতে পারে বিশ্বের প্রধান খাদ্য সরবরাহকারী দেশগুলোর। এরইমধ্যে সবচেয়ে খারাপ যেটা ঘটতে পারে, তা হলো বিভিন্ন দেশ খাদ্য রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে।

জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস বলছেন- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বড় সংকটে এখন বিশ্ব। ভাইরাসকবলিত প্রায় প্রতিটি দেশে আতঙ্কিত লোকজন টয়লেট পেপার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নানা উপকরণের মতো খাদ্যপণ্য কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। রাশিয়ার ভেজিটেবল অয়েল ইউনিয়ন সূর্যমুখীর বীজ রপ্তানি সীমিত করার ঘোষণা দিয়েছে এবং বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ পাম তেল উৎপাদনকারী দেশ মালয়েশিয়ায় তেলের উৎপাদন কমে গেছে। সুপারমার্কেটগুলোর পণ্যের তাক ফাঁকা পড়ে থাকার চিত্র দেখা যাচ্ছে দেশে দেশে। এতে বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, সরকারের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত আছে। উৎপাদনে রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বাড়ছে। সেই কারণে দেশে চালের দাম বাড়ছে। তবে হাহাকার নেই। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো একটু কষ্টে আছে। আগামী সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই ১০ টাকা কেজিতে ৫০ লাখ পরিবারের মধ্যে চাল বিক্রি করা হবে। খাদ্য নিয়ে কোনো সংকট নেই।

সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বাংলাদেশের কৃষিকে বিশ্বের উদাহরণ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। চালে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। মাংস, ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি, গুঁড়োদুধ, ফলমূল, আদাসহ বিভিন্ন মসলায় আমরা বহুলাংশে আমদানিনির্ভর। এসব পণ্যের লাগাম টেনে ধরতে টিসিবিকে আরও সক্রিয় করা দরকার।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ফেলো ড. এম আসাদুজ্জামান বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে চালের আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম ওঠানামা করছে। ফিলিপাইনসহ অনেক দেশ ইতোমধ্যে রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। দেশে খাদ্যের মজুত আছে পর্যাপ্ত। তবে সুষ্ঠু খাদ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি মনিটরিং কমিটি থাকা জরুরি।

এ বিষয়ে ইউনিভার্সিটি অব গেস্নাবাল ভিলেজ (ইউজিভি) উপাচার্য বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, করোনার কারণে বিশ্বে খাদ্যের একটা বড় সংকট আসন্ন। খাদ্য সমস্যা না হলেও বাংলাদেশের বিশেষ প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে