সুবর্ণজয়ন্তীর কর্মসূচি ঘিরে বিএনপিতে বিভক্তি

কর্মসূচি শুরুর আগে থেকে এক ধরনের অসন্তোষ ছিল
সুবর্ণজয়ন্তীর কর্মসূচি ঘিরে বিএনপিতে বিভক্তি

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরব্যাপী কর্মসূচির মাধ্যমে দলের নেতাকর্মীদের সক্রিয় করার পরিকল্পনা ছিল বিএনপির। কিন্তু শুরুতেই উল্টো চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কর্মসূচির সপ্তাহ পার না হতেই দলটিতে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। উদ্বোধনের আগে থেকেই শুরু হওয়া অসন্তোষ দিনে দিনে আরও তীব্র হচ্ছে। এ ধরনের একটি বড় আয়োজনে দলীয় চেয়ারপারসনকে আড়াল করে রাখা বা এড়িয়ে যাওয়াকে অনেকেই উদ্দেশ্যমূলক বা ষড়যন্ত্রমূলক বলে ভাবছেন। এ নিয়ে নেতৃত্ব পর্যায়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা শঙ্কা।

সূত্রমতে, সূবর্ণজয়ন্তীর কর্মসূচি শুরুর আগে থেকে বিএনপিতে এক ধরনের অসন্তোষ ছিল। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও আব্দুস সালামের নেতৃত্বাধীন কমিটি গঠনেও আপত্তি ছিল খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত প্রভাবশালী শীর্ষ কয়েকজন নেতার। এছাড়া দলের খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধা নেতাদের নেতৃত্বে এই কমিটি গঠনের পক্ষেও মত ছিল অনেকের। কমিটি গঠনের সময় অসন্তোষ সামনে না এলেও কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

উদ্বোধনের আগে গণমাধ্যমের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় কর্মসূচি থেকে এই অসন্তোষ দেখা দেয়। অভিযোগ ওঠে সভায় শীর্ষ সাংবাদিকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে দায়িত্বপ্রাপ্তরা কার্যকরী কোনো ভূমিকা রাখেননি। বিএনপির সংবাদ সংগ্রহে ধারাবাহিকভাবে দায়িত্ব পালন করা সাংবাদিকরা ছাড়া মতবিনিময়ে উলেস্নখযোগ্য কোনো সাংবাদিক যায়নি।

সভার পরেই বিএনপি সমর্থিত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি এম আবদুলস্নাহ তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন, 'সম্পাদক ও মিডিয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে বিশাল মতবিনিময়! উপস্থিতির তালিকা দেখে করুণা হলো। দেউলিয়াত্ব ও দীনতা কোনো পর্যায়ে গেলে এ চিত্র দেখতে হয়। লজ্জা! দলটিকে আর কত হেয় করবেন?'

বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীও এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া

\হব্যক্ত করেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় কর্মসূচি প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পরে উদ্বোধনী কর্মসূচিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা কার্যকরী ভূমিকা পালন করবেন- এমনই ভেবেছিলেন দলটির নেতাকর্মীরা। কিন্তু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়াকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে অসেন্তাষ আরও বেড়েছে।

১ মার্চ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ব্যানারে দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছবি এবং নাম না থাকায় এ অসন্তোষ শুরু হয়। নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ এর পেছনে 'ষড়যন্ত্র' দেখছেন। কেউ ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আবার কেউ নিজেদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া স্ট্যাটাসে এ নিয়ে সমালোচনামুখর।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর ক্ষোভ প্রকাশ করে বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেসসচিব মারুফ কামাল খান এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, 'বদলে যাওয়া এ এক অন্যরকম বিএনপি। সব আছে, সবাই আছে, শুধু নেই বেগম খালেদা জিয়ার ছবি ও নামটি। এই ঘোর দুষ্কালেও অনেকেই ছিলেন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন অনুষ্ঠানমালার শুভ উদ্বোধন উপলক্ষে লেকশোর হোটেলে আয়োজিত এই জঁমকালো অনুষ্ঠানে। তবে বিএনপির আমন্ত্রণ পেয়েও সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতারা এবং দাওয়াত না পাওয়ায় জামায়াত নেতারাও ছিলেন অনুপস্থিত।'

তীব্র সমালোচনার মুখে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতির বিষয়ে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব ও বিএনপি চেয়ারপাসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম গণমাধ্যমকে বলেন, 'জিয়াউর রহমান মানেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। বাংলাদেশ মানেই জিয়া। তাই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে শুধু জিয়াকে ফোকাস করতে চেয়েছেন। এ কারণে দলীয় চেয়ারপারসনের ছবি ব্যবহার করা হয়নি।' একই কারণে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবিও ব্যবহার করা হয়নি। তা ছাড়া এ কর্মসূচিকে তারা দলীয় না, সার্বজনীন করতে চেয়েছেন বলে শুধু জিয়ার ছবি ব্যবহার করেছেন বলে জানান।

সদস্য সচিবের এই বক্তব্যে আরও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। সুবর্ণজয়ন্তীর শীর্ষপদে থাকা নেতাদের ১/১১ সময় কি ভূমিকা ছিল সেসব আলোচনা শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

আব্দুস সালামের বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশের পর অপর এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে মারুফ কামাল লেখেন, 'অনুষ্ঠানটি দল হিসেবে বিএনপির। সেটার দলীয় পরিচয় মুছবেন কী করে? আর সার্বজনীন মানে কী? শহীদ জিয়াকে যারা মানেন, তাদের কাছে কি খালেদা জিয়া অগ্রহণযোগ্য? যারা অনুষ্ঠানে এসেছেন, তারা খালেদা জিয়ার ছবি থাকলে কি আসতেন না? আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও অন্য নেতাদেরও এ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তারা। সালাম সাহেবের বক্তব্যে মনে হলো, আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে অনুষ্ঠানটিকে গ্রহণযোগ্য করার লক্ষেই হয়তো তারা 'সার্বজনীন' এ ব্যানার বানানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তো কেউ এলেন না। তাতে প্রমাণ হলো, সার্বজনীনতার এ ভুল চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। মধ্যে থেকে দলের নিবেদিত নেতাকর্মীরা কেবল মর্মবেদনার শিকার হলেন। খালেদা জিয়ার ছবি এড়িয়ে শুধু জিয়াউর রহমানকে হাইলাইট করার যে যুক্তি সালাম সাহেব দিয়েছেন, তা মানলেও প্রশ্ন থাকে, ব্যানারে নামটাও কেন দিলেন না তার? ব্যানারে তারেক রহমান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, এমনকি সালাম সাহেবের নিজের নামও তো ছিল!'

বিএনপির সব অনুষ্ঠানের ব্যানারে যে ছবিগুলো থাকা নিয়মে পরিণত হয়েছে, সে রেওয়াজ ভাঙলেন উলেস্নখ করে মারুফ কামাল আরও লেখেন, 'যে অনুষ্ঠান বিএনপির অ্যাক্টিং চেয়ারম্যান তারেক রহমান উদ্বোধন করেন, যে মঞ্চে বিশেষ অতিথি হন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সভাপতিত্ব করেন ড. খোন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং সঞ্চালনা করেন আব্দুস সালাম, সেই অনুষ্ঠানকে দলীয় পরিচয় মুছে তথাকথিত 'সার্বজনীন' করার আশা খুবই দুরাশা ছিল। উনারা সবাই সার্বজনীন কিন্তু কেবল খালেদা জিয়ার নাম বা ছবি দিলেই অনুষ্ঠানটি সার্বজনীনতা হারিয়ে ফেলত- এমন কথা ম্যাডামের প্রতি খুবই অবজ্ঞাসূচক ও অসৌজন্যমূলক। এ ধরনের দুঃখজনক উক্তি করা উচিত হয়নি।'

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন কমিটিতে এমন এক নেতা রয়েছেন যিনি ওয়ান-ইলেভেনে নিজে বিএনপির চেয়ারম্যান হতে চেয়েছিলেন। ওই নেতার নেতৃত্বে দল গঠনের লক্ষ্যে ৬০ নেতার নাম সংবলিত তালিকা তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদের কাছে পাঠিয়ে ছিলেন। যে চিঠি পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার হাতে কোনো মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তো তাদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। তার শঙ্কা সেই ফর্মুলা নতুন করে শুরু হয়েছে। যেহেতু তারেক রহমান বাইরে, খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য অনেকটাই রাজনীতির বাইরে- এ অবস্থায় ফাঁকা মাঠে বিশেষ কারণ দেখিয়ে সেই প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সূবর্ণজয়ন্তীর কর্মসূচি ঘিরে আলোচিত কার্যক্রম শুধু সমালোচনার মধ্যেই সীমবদ্ধ নেই। এর প্রতিবাদে সুবর্ণজয়ন্তীর জাতীয় কমিটি থেকে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির দুই নেতা, আরেকজন অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা ও একজন যুগ্ম মহাসচিব নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির এক নেতা পদত্যাগও করতে পারেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে