ঈদযাত্রায় স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত

ছুটছে মানুষ বাড়ির পানে

ছুটছে মানুষ বাড়ির পানে

দরজায় কড়া নাড়ছে মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর। প্রিয়জনদের সঙ্গে এ উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে গ্রামে ছুটছেন প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। দূরপালস্নার বাস, ট্রেন ও লঞ্চ বন্ধ থাকায় যে যেভাবে পারছেন ঝুঁকি নিয়ে ছুটছেন বাড়ির পানে।

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ও তৃতীয় ঢেউয়ের শঙ্কার মধ্যে সবাইকে কর্মস্থল না ছাড়তে নির্দেশনা দেয় সরকার। সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকিপূর্ণ এ ঈদযাত্রায় মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধিও। পরিবহণগুলোতে শারীরিক দূরত্ব তো দূরের কথা গাদাগাদি করে এমনভাবে যাত্রী নেওয়া হচ্ছে যাতে নিঃশ্বাস ফেলার মতো জায়গাও নেই। আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকেই গাড়ি পাননি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিরক্ত

\হহয়ে পায়ে হেঁটে কিছুটা পথ আগানোর চেষ্টা করেছেন অনেকেই। আবার কেউ কেউ ভেঙে ভেঙে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করেছেন।

মঙ্গলবার মোটরসাইকেলে তিনজন, সিএনজি-অটোরিকশায় পাঁচজন, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, পিকআপ, সিটি সার্ভিসের ছোট ছোট বাসে গাদাগাদি করে বাড়ির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়তে দেখা গেছে ঈদযাত্রীদের। এ দিন বেশ কিছু গার্মেন্ট ছুটি হয়েছে। ছুটির পর মঙ্গলবার বিকেল থেকেই ঢাকা, সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার গার্মেন্টকর্মীরা বাড়ি ফিরতে শুরু করেন। এ সময় মানুষের বাড়তি চাপে সড়কে জটলা তৈরি হয়।

যাত্রীদের তুলনায় যানবাহন অপ্রতুল হওয়ায় ভোগান্তি ও করোনা ঝুঁকি দুটোই বেড়েছে কয়েকগুণ। এতে ঈদের পর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে যানজট লক্ষ্য করা গেলেও ঢাকার বাইরে তেমন যানজট হয়নি।

আমাদের গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জ ও কুমিলস্না প্রতিনিধি জানিয়েছেন, এসব এলাকায় সকাল থেকেই যান চলাচল অনেকটা স্বাভাবিক থাকলেও পরিবহণের অপেক্ষায় থাকা মানুষের ভিড়ে বিভিন্ন জায়গায় জটলা তৈরি হয়েছে।

সকাল গড়িয়ে দুপুর আসতে না আসতেই গাজীপুরের টঙ্গী ও চান্দনা চৌরাস্তায় মানুষের জট লেগে যায়। এ সময় কম সংখ্যক যাত্রীকেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাফেরা করতে দেখা গেছে। গাজীপুরের চন্দ্রার তিন রাস্তার মোড়েও মানুষের জটলা দেখা গেছে। অনেকে গাড়ি না পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন রাস্তার পাশে। বাড়ি ফিরতে পিকআপ ভ্যান, মিনি ট্রাক আর মোটরসাইকেল ছাড়া বিকল্প পাননি যাত্রীরা। মাঝেমধ্যে ছেড়ে যাচ্ছে দু-একটা বাস। তিন থেকে চারগুণ ভাড়া দিয়ে যাচ্ছেন অনে যাত্রী। অনেকে হেঁটে রওনা দিচ্ছেন সামনে গিয়ে কোনো যানবাহন পাওয়ার আশায়।

গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় কথা হয় পোশাকশ্রমিক আমিনুলের সঙ্গে। তিনি জানান, বাস বন্ধ থাকলেও ট্রাক ও পিকআপে করে গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনা যাওয়ার জন্য বের হয়েছেন।

অপর এক যাত্রী জানান, সরকার স্বাস্থ্যবিধি মেনে দূরপালস্নার গণপরিবহণ খুলে দিলে ভালো হতো। কারণ আমরা যারা ছোট চাকরি করি, বাড়িতে আসা-যাওয়ায় অনেক বেশি খরচ হওয়ায় পরিবারের ওপর চাপ পড়ছে। বাড়িতে যাচ্ছি, বৃদ্ধ মা-বাবা, বউ-ছেলেমেয়ের সঙ্গে ঈদের সময়টা কাটালে ভালো লাগবে বলে।

এদিকে গাজীপুর-কালিয়াকৈর-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। বিভিন্ন ছোট-বড় বাহনে করে মানুষকে বাড়ি ফিরতে দেখা যায়। লকডাউনের মধ্যেও মহাসড়কে ছিল যানবাহনের চাপ। গাজীপুরের মাওনা চৌরাস্তা এলাকার এক কারখানা শ্রমিক আনিসুর রহমান জানান, বাস বন্ধ থাকায় তারা মাইক্রোবাস ভাড়া করেছেন। এক মাইক্রোবাসে ১৪ জন যাবেন। জনপ্রতি ১২শ টাকা করে ভাড়া দিতে হবে তাদের।

ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে সকালের দিকে যানবাহনের চাপ স্বাভাবিক থাকলেও বিকেলে কিছুটা বেড়ে যায়। তবে এই এলাকায়ও পরিবহণ সংকটে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়ছে ঈদযাত্রীদের। দীর্ঘ সময় গাড়ি না পেয়ে অনেকে হেঁটেই গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। আবার অনেকে ট্রাক, মাইক্রোবাস, পিকআপভ্যানসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত গাড়িতে গাদাগাদি করে বাড়ি ফিরছেন। এতে করোনা সংক্রমণ ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। গার্মেন্ট ছুটি হওয়ার পর বিকেলে সড়কে মানুষ ও যানবাহনের বাড়তি চাপ লক্ষ্য করা গেছে।

কুমিলস্নার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দূরপালস্নার বাস বন্ধ থাকলেও যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ বেড়েছে। ঈদকে সামনে রেখে বাড়ি ফেরা শুরু হওয়ায় যানবাহনের চাপে মহাসড়কের কোথাও ধীরগতি, আবার কোথাও খন্ড খন্ড যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এতে করে যাত্রী ও চালকদের দুর্ভোগ বেড়েছে। ঢাকা থেকে কুমিলস্নামুখী দূরপালস্নার বাস প্রবেশ করতে না দেওয়ায় দাউদকান্দির টোলপস্নাজা এলাকায় পুলিশের চেকপোস্ট থেকে হেঁটে যাত্রীরা গন্তব্যে যাচ্ছেন। আবার অনেকে বিকল্প বাহন হিসেবে পণ্য পরিবহণের ট্রাকে করে গন্তব্যে ফিরছেন। তবে মহাসড়কের কোনো অংশে দীর্ঘ যানজট নেই। মঙ্গলবার সকাল থেকে কুমিলস্নার দাউদকান্দির শহীদনগর থেকে পুটিয়া পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার সড়কে যানবাহনের ধীরগতির সঙ্গে খন্ড খন্ড যানজট সৃষ্টি হয়।

দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার ওসি জহরুল ইসলাম বলেন, মহাসড়কে বিভিন্ন ধরনের গাড়ির চাপ বেড়েছে। দূরপালস্নার কোনো বাস যাতায়াত করতে দেওয়া হচ্ছে না। চেকপোস্টে ঢাকা থেকে কুমিলস্নামুখী যাত্রী পরিবহন করা বাস আটকে দেওয়া হচ্ছে। তবে ব্যক্তিগত গাড়ি বেড়েছে মহাসড়কে। সেই সঙ্গে পণ্য পরিবহণের গাড়িতে করে বাড়ি ফিরছেন ঘরমুখী মানুষ।

অপরদিকে, রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া নৌপথে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে। ফেরি চলাচল স্বাভাবিক করে দেওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ঈদযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে এলেও মানুষের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ঘাট কর্র্তৃপক্ষ। বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও রাজধানী ছেড়ে যাওয়া মানুষ মঙ্গলবার সকাল থেকে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাটে ভিড় জমান। বৃষ্টিতে ভিজে পায়ে হেঁটে ঘাটে আসেন অনেক যাত্রী।

গণপরিবহণ বন্ধ থাকায় পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে মানুষ যে যেভাবে পারছেন, গন্তব্যে ছুটে চলছেন। অনেকে খোলা ট্রাকে করে পরিবারসহ রওনা করেছেন। এছাড়া প্রতিটি ফেরিতে মানুষ এবং ছোট ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে পাটুরিয়া ঘাট থেকে ছেড়ে আসা অধিকাংশ ফেরিতে এমন চাপ দেখা যায়। বিপরীতে দৌলতদিয়া ঘাটে যানবাহন বা যাত্রী চাপ না থাকায় হাতে গোনা কিছু গাড়ি নিয়েই ফেরিগুলো ছেড়ে যাচ্ছে। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, আগের নিয়মেই ফেরি চালু রাখা হয়েছে।

এদিকে দৌলতদিয়া ঘাটে মঙ্গলবার সকালে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে দেখা যায়, ৩, ৪ ও ৫ নম্বর ঘাট চালু রয়েছে। প্রতিটি ঘাটে তিন-চারটি ফেরি নোঙর অবস্থায় আছে। পাটুরিয়া থেকে যানবাহন ও যাত্রী নিয়ে আসা ফেরি দৌলতদিয়ায় ঘাট না পেয়ে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দৌলতদিয়া ঘাট থেকে পাঁচ-ছয়টি গাড়ি নিয়েই ফেরিগুলো পাটুরিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছে। এ সময় যাতায়াতকারী অধিকাংশ মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করেন।

মুন্সীগঞ্জে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে পুলিশ-বিজিবি রাস্তায় থাকলেও ঘাটের অদূরে চেকপোস্টগুলোর দুই পাশে গাড়ির জটলা লক্ষ্য করা গেছে। চেকপোস্টের কাছে এসে গাড়ি ছেড়ে পায়ে হেঁটে অপর পাশে অপেক্ষমাণ গাড়িতে গিয়ে উঠছে। সিরাজদিখান উপজেলা নির্বাহী অফিসার সৈয়দ ফয়েজুল ইসলাম জানান, এখানে ব্যক্তিগত, যাত্রীবাহী ও অন্যান্য যানবাহন আটকে দেওয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রাম থেকে আসা শামীম আহমেদ জানান, সোমবার সারারাত ট্রাকে চেপে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছেন। ফেরি পার হয়ে মাদারীপুর যাবেন। তার সঙ্গে থাকা অপর একজন জানান, ট্রাকে এক হাজার ৯০০ টাকা ভাড়া দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নেমেছেন। এরপর কোনো যানবাহন না পেয়ে হেঁটেই পোস্তগোলা সেতু পার হয়েছেন। এরপর একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় এই চেকপোস্ট পর্যন্ত এসেছেন।

প্রসঙ্গত, করোনার বিস্তার ঠেকাতে ঈদের আগে শিমুলিয়া ও পাটুরিয়া ঘাটে ঘরমুখো মানুষের ঢল ঠেকাতে গত শনিবার থেকে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। বিআইডবিস্নউটিসি ওই দিন ফেরি চলাচল বন্ধ রেখেও শত শত মানুষের ঘাটে আসা ঠেকাতে পারছিল না। নাছোড়বান্দা মানুষ ফেরিতে উঠে পড়লে এক পর্যায়ে ফেরি চলাচল শুরু করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে