আজ বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস

মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারে উর্বরতা হারাচ্ছে ফসলি মাটি

মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারে উর্বরতা হারাচ্ছে ফসলি মাটি

ফসল উৎপাদন মাটির স্বাস্থ্যের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। মাটি হচ্ছে কৃষির মূল ভিত্তি। উর্বর মাটি না হলে ভালো ফসল উৎপাদন হয় না। তাই সুষম মাটিতে ৫ শতাংশ জৈব উপাদান থাকার কথা। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, মাটিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে দেশের মোট আবাদযোগ্য এক কোটি ১৪ লাখ ৮ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ৬১ শতাংশে জৈব পদার্থের মারাত্মক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, জমির উর্বরা শক্তি কমার মূল কারণ হচ্ছে-একই জমিতে বছরে একাধিকবার ফসল চাষ এবং মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে ভেঙে পড়েছে মাটির স্বাস্থ্য। মাটির উর্বরতাশক্তি ও জৈব পদার্থের উপস্থিতি নিয়ে একটি গবেষণা চালিয়েছে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইন্সটিটিউট (এসআরডিআই)। 'ল্যান্ড ডিগ্রেডেশন ইন বাংলাদেশ' শীর্ষক এ সমীক্ষায় মাটির উবর্রতা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে মাটিতে জৈব পদার্থের ঘাটতির তথ্য উঠে এসেছে। এমন অবস্থার মধ্যে আজ রোববার ৫ ডিসেম্বর পালিত হচ্ছে বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে 'লবণাক্ততা প্রতিরোধ করি, মৃত্তিকা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করি'। সাধারণত ৪৫ শতাংশ খনিজ বা মাটির কণা, ৫ শতাংশ জৈব এবং ২৫ শতাংশ করে পানি ও বাতাস থাকা মাটিকে সুষম মাটি বলা হয়। একটি আদর্শ জমিতে জৈব পদার্থের মাত্রা ৩.৫ শতাংশ থাকা অতি প্রয়োজনীয় হলেও এ দেশের বেশিরভাগ জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ এক দশমিক ১৭ শতাংশ এবং কিছু কিছু জমিতে এর পরিমাণ ১ শতাংশের চেয়েও কম এর মধ্যে ৫৪ লাখ হেক্টর জমিতে ফসফরাস, ২৬ দশমিক ৩০ লাখ হেক্টর জমিতে পটাশিয়াম, ৩৩ দশমিক ৩০ লাখ আট হাজার হেক্টর জমিতে গন্ধক, ২৭ দশমিক ৭ লাখ হেক্টর জমিতে দস্তা সার, ২৩ দশমিক ৯ লাখ হেক্টর জমিতে বোরন সারের অভাব রয়েছে। এছাড়া অনেক জমিতে রয়েছে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের অভাব। জলবায়ুর পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, একই জমিতে যুগের পর যুগ একই ফসলের চাষ, জমিকে বিশ্রাম না দেওয়া, রাসায়নিক সারের অসম ব্যবহারের কারণে মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. মঞ্জুরুল হান্নান খান যায়যায়দিনকে বলেন, বেশি ফলন পাবার আশায় বেশি বেশি রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেন কৃষকরা। এতে জমির জৈব পদার্থ কমে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে জমির উর্বরা শক্তি। জমির উর্বরা শক্তি ঠিক রাখতে প্রয়োজন নানা ধরনের ফসল চাষ। উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ফসল চাষও জমির উর্বরা কমার কারণ। ধাতব পদার্থের কারণে দূষিত হয়ে পড়ছে দেশের উর্বর মাটি। আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ, সীসা, নিকেল হচ্ছে ভারি ধাতব পদার্থ। এসআরডিআইয়ের তথ্যমতে, কৃষিজমিতে স্বাভাবিকের তুলনায় দস্তার পরিমাণ কম। এর মধ্যে পদ্মা নদীর অববাহিকার মাটিগুলোয় চুন ও ক্ষারের মাত্রা অনেক বেশি। অন্যদিকে হাওড়াঞ্চলের জেলাগুলোয় আবাদি এলাকা নিচু এলাকা হওয়ার কারণে কৃষিজমিগুলো অধিকাংশ সময় জলমগ্ন থাকে। এজন্য এসব অঞ্চলে দস্তার পরিমাণ দিনের পর দিন কমছে। দেশের প্রায় ৫৫ শতাংশ জমিতে দস্তার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রমাগত ফসল ফলানোর কারণে দেশের মাটিতে প্রয়োজনীয় পরিমাণে জৈব পদার্থ নেই। মাটিকে যথাযথভাবে ব্যবহার না করায় উর্বরতা শক্তি নষ্ট হচ্ছে। অপরিকল্পিত চাষাবাদ, মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহার, ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ, শিল্পায়ন, দূষণ, ব্যাপক হারে বনভূমি ধ্বংস এবং অপরিকল্পিতভাবে সারের ব্যবহারের কারণে মাটির উবর্রতা শক্তি হারাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ইটভাটার জন্য মাটির উপরিভাগের অংশ তুলে নেওয়া ছাড়াও মাটির টেকসই ব্যবস্থাপনার অভাবে পুষ্টি উপাদানের ঘাটতির ফলে মৃত্তিকা এখন হুমকির মুখে রয়েছে। এসব কারণে মাটির স্বাস্থ্যহীনতায় এখন প্রতি বছর ফসল উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কৃষিবিদ আব্দুল হামিদ যায়যায়দিনকে বলেন, অধিকাংশ কৃষকই বেশি ফসলের জন্য নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম সার ব্যবহার করেন। অপরিমিত ও মাত্রাতিরিক্ত সার ব্যবহারে মাটির উর্বরা গুণাগুণ হারিয়ে যাচ্ছে। এতে একটা সময় কৃষিতে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। মাটির ঘাটতি কমানোর পাশাপাশি উবরতা শক্তি ধরে রাখতে সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার। জীবন ধারণের জন্য উদ্ভিদ মাটি থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্য হিসেবে খনিজ পদার্থ ও পানি সংগ্রহ করে। এর অভাব হলে ফসল তথা উদ্ভিদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে ও ফসলহানি ঘটে। দেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করতে গিয়ে শস্যের নিবিড়তা বাড়ছে, এতে মাটির উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে। টেকসই মাটি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাটির উৎপাদনশীলতা, মাটিতে গাছের অপরিহার্য পুষ্টি উপাদানের মান বজায় রাখতে হবে। কারণ মানুষের জীবন-জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তা নির্ভর করে টেকসই মাটি ব্যবস্থাপনা ধরে রাখতে হবে। সেজন্য মাটিকে সজীব রাখতে হবে, মাটির গুণাগুণ বজায় রাখতে হবে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক কৃষিবিদ বিধান কুমার ভান্ডার যায়যায়দিনকে বলেন, মাত্রাতিরিক্ত সারের ব্যবহারে হারিয়ে যাচ্ছে জমির উর্বরা শক্তি। জমির উর্বরা শক্তি ঠিক রাখতে প্রয়োজন নানা ধরনের ফসল চাষ। উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ফসল চাষও জমির উর্বরা কমার কারণ।? সংস্থাটির গবেষণাগারে বছরে ৪০ হাজার মৃত্তিকা পানি নমুনা বিশ্লেষণ করে সুষম সার দেয়ার সুপারিশ করছে। প্রকাশ করা হয়েছে ভূমি ব্যবহারের মানচিত্রও। নিত্যনতুন কৌশল হিসেবে অনলাইন সার সুপারিশ প্রযুক্তির মাধ্যমেও কৃষকদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দস্তা ও বোরন সারে ৭০ শতাংশ ভেজাল পাওয়া যাচ্ছে। সরকার ইউরিয়া সারের দাম কমানো ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখায় ইউরিয়া সারে ভেজাল কমেছে। উর্বরা শক্তি ফিরিয়ে আনতে চাষে ভিন্নতা আনতে হবে। একবার ধান করলে পরের বছর ডাল জাতীয় ফসল করতে হবে। আবার দুই ফসল উৎপাদনের পর জমিকে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। গরু-মহিষের বর্জ্য জৈব পদার্থের বড় উৎস্য। তিনি আরও বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে ফসল চাষাবাদে ভূমি ক্ষয় একটি বড় সমস্যা। এই সমস্যাকে সামনে রেখে এসআরডিআই বান্দরবানে বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছে। ইতোমধ্যে পাহাড়ি এলাকার ভূমি ক্ষয়রোধে কয়েকটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলে ১০ লাখ ৫৬ হাজার জমি লবণাক্ত।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

সকল ফিচার

ক্যাম্পাস
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
হাট্টি মা টিম টিম
কৃষি ও সম্ভাবনা
রঙ বেরঙ

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে