দ্বিতীয় ঢেউয়ের চেয়ে তিন গুণ গতিতে চূড়ায় চড়ছে করোনা

সংক্রমণ বিস্তারে এখনো ডেল্টার প্রভাব বেশি থাকলেও ওমিক্রন শিগগিরই এগিয়ে যাবে। এ অঞ্চলে ওমিক্রনের সংক্রমণ বেড়ে আবারও ধরন পরিবর্তন করবে কি না, তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে
দ্বিতীয় ঢেউয়ের চেয়ে তিন গুণ গতিতে চূড়ায় চড়ছে করোনা
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকার জন্য অপেক্ষা করছেন সাধারণ মানুষ -পিবিএ

দেশে দ্বিতীয় ঢেউয়ের চেয়ে ৩ গুণ ক্ষিপ্র গতিতে সংক্রমণের চূড়ার দিকে এগোচ্ছে মারণব্যাধি করোনা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভয়াবহ এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চলতি মাসেই তা সংক্রমণের আগের রেকর্ড ভেঙে অনেক দূর এগিয়ে যাবে। ফেব্রম্নয়ারির প্রথম দুই সপ্তাহে দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে তা মার্চ অবধি ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।

করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দেশে সংক্রমণ বিস্তারে এখনো ডেল্টার প্রভাব বেশি থাকলেও ওমিক্রণ ভ্যারিয়েন্ট শিগগিরই এগিয়ে যাবে। এ অঞ্চলে ওমিক্রনের সংক্রমণ বেড়ে আবারও করোনাভাইরাস তার ধরন পরিবর্তন করবে কি না, তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলাকালে সাপ্তাহিক গড় হিসেবে ২০২১ সালের ৩ আগস্ট দেশে সর্বোচ্চসংখ্যক রোগী শনাক্ত করা হয়। ওই সপ্তাহে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৪৭৭ জন। এর আগের দশ সপ্তাহে দেশে যথাক্রমে ৮ হাজার ৯৩১ জন (২৬ জুলাই), ১১ হাজার ৮২৮ জন (১৮ জুলাই), ১০ হাজার ৮৯৬ জন (১১ জুলাই) ৮ হাজার ৭৩ (৪ জুলাই), ৫ হাজার ৭৮১ জন (২৮ জুন), ৩ হাজার ৫৩৬ জন (২০ জুন), ২ হাজার ১৬৪ জন (১২ জুন), ১ হাজার ৬৪৬ জন (৪ জুন), ১ হাজার ৩৭৮ জন (২৮ মে), ১ হাজার ২৩ জন (২১ মে) এবং ৮৪৮ জন (১৪ মে) জন করোনা রোগী শনাক্ত করা হয়।

অন্যদিকে চলতি বছরে দেশে করোনার তৃতীয় ঢেউ শুরুর পর সাপ্তাহিক গড় হিসেবে ১০ জানুয়ারি ১ হাজার ২৫৬ জন রোগী শনাক্ত করার পর মাত্র ৬

\হদুই সপ্তাহের ব্যবধানে তা ১০ হাজার ৭৯৬ জনে পৌঁছায়। উলেস্নখিত দুটি পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলাকালীন সাপ্তাহিক গড় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১ হাজার থেকে সাড়ে ১০ হাজারের কোটা ছুঁতে ৯ সপ্তাহ সময় লাগলেও তৃতীয় ঢেউয়ে এ গন্ডি পেরোতে সময় লেগেছে মাত্র ৩ সপ্তাহ।

সংক্রমণ বৃদ্ধির এ গতি আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, আগামী তিন থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে দেশে ওমিক্রনের সংক্রমণ বাড়তে পারে। আর এ সময় সংক্রমণের হার আরও ভয়াবহ হবে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, গত দুই বছরের সংক্রমণ চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ইউরোপ-আমেরিকায় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছড়ানোর তিন থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে সেটি আমাদের দেশে প্রবেশ করে এবং পরবর্তীতে তা ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এবার ওমিক্রণের ক্ষেত্রেও এমনটা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তবে দ্বিতীয় ঢেউয়ের চেয়ে তিন গুণ বেশি ক্ষিপ্র গতিতে করোনা সংক্রমণের চূড়ায় চড়ার আশঙ্কা থাকলেও মৃতু্যর মিছিল তখনকার মতো এতটা দীর্ঘ হবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করেন, ডেল্টার চেয়ে ওমিক্রনের দাপট বেশি হওয়ায় সংক্রমণের উচ্চ হার সৃষ্টি হয়েছে। তবে অন্য ভ্যারিয়েন্টগুলোর মতো ওমিক্রন ফুসফুসে প্রদাহ সৃষ্টি করে না। সে কারণে হয়তো এর সংক্রমণ অনেক বেশি হলেও গুরুতর অসুস্থতা ও মৃতু্যর সংখ্যা কম হতে পারে।

এদিকে মার্চে সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কার ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা হল, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর থেকে পরপর দুই বছর একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। আর তা হল শীতের মৌসুমে করোনাভাইরাসের প্রকোপ কমে গিয়ে মার্চ থেকে সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে। তাই এই বছরও তেমন হওয়ার সম্ভাবনাই দেখছেন করোনাভাইরাস সম্পর্কিত সরকারের কারিগরি কমিটির সদস্যরা।

তারা জানান, শীতে স্থানীয় যে ভাইরাসগুলোর সংক্রমণ হয় সেগুলো সব শ্বাসতন্ত্রের অসুখ, করোনাভাইরাসও তাই। একটি ভাইরাসের প্রকোপ থাকলে তখন অন্য ভাইরাস সেভাবে বিস্তার ঘটানোর সুযোগ পায় না। তাই করোনাভাইরাস এখন সংক্রমণ করতে পারছে না। তবে মার্চের দিক থেকে যখন দেশীয় ভাইরাসগুলো কমে আসবে তখন করোনাভাইরাস আবার সুযোগ নেবে। গত দুই বছর এমনটাই হয়েছে।

এদিকে এ বছর করোনার প্রকোপ আগের চেয়ে আরও ভয়াবহ রূপ নেওয়ার পেছনে স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতাকেও সমানভাবে দায়ী করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, গত কয়েক মাস ধরে মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো তাগিদ নেই। শুধু তাই নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত। ব্যক্তি পর্যায়ে কেউই স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করছেন না, মাস্ক পরা থেকে শুরু করে হাত ধোয়া কোনো কিছুই তোয়াক্কা করছেন না। এমনকি তৃতীয় ঢেউ শুরুর পরও বাণিজ্য মেলা বন্ধ করা হয়নি। বাজারঘাট, গণপরিবহণ সব জায়গাতেই এখনও স্বাস্থ্যবিধি ব্যাপকভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে। এসব কারণে সংক্রমণের গতি দ্রম্নত বাড়ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুলস্নাহ বলেন, 'ইউরোপ, আমেরিকা, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বব্যাপীই করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও তা ঊর্ধ্বমুখী। সবখানেই এটি ভয়ঙ্করভাবে আঘাত করেছে। আমাদের দেশেও যে হারে বাড়া শুরু হয়েছে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এটা ভয়াবহ পর্যায়ে চলে যাবে। এর মূল কারণ হচ্ছে কেউ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই ভয়াবহ বিপর্যয়ে পড়ে যাব আমরা। স্বাস্থ্যবিধিটা অবশ্যই মানতে হবে। যারা এখনও ভ্যাকসিন নেয়নি, সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ভুলে দ্রম্নত ভ্যাকসিন নিতে হবে।'

এ বিষয়ে হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তার লেনিন চৌধুরী যায়যায়দিনকে বলেন, করোনার গতি বাড়ার ক্ষেত্রে যতক্ষণ প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা না যায় ততদিন সেটা বাড়তেই থাকে। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা না হলে বাড়ার এ গতি অব্যাহত থাকবে। এভাবে চলতে থাকলে ডেল্টা ভেরিয়েন্ট যে পর্যায়ে গিয়েছিল সেটাকে দ্রম্নত অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে। তাই স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে দ্রম্নত প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

সকল ফিচার

ক্যাম্পাস
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
হাট্টি মা টিম টিম
কৃষি ও সম্ভাবনা
রঙ বেরঙ

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে