বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের নেপথ্যে !

রেজা মাহমুদ
  ০৬ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০
হঠাৎ জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয় ও দেশব্যাপী ভোগান্তির নেপথ্যের কারণ জানতে কৌতূহলী সাধারণ মানুষ। মঙ্গলবার কেন এমন হলো এবং আবারও এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে কিনা, সেটা নিয়ে তাদের মধ্যে আগ্রহের শেষ নেই। মূলত রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা, অনুন্নত সঞ্চালন লাইন ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি স্বয়ংক্রিয় না হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে বিদু্যৎ বিপর্যয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মত দিয়েছেন। তবে সরকারিভাবে এখনো এর কারণ জানানো হয়নি। আর বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, 'দুর্নীতির কারণে এমনটি হয়েছে, ভবিষ্যতে আরও হবে।' জাতীয় গ্রিডে পির্যয়ের নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হলেও বাংলাদেশে তা এখনো হয়নি। গত কয়েক বছরে বিদু্যৎ উৎপাদন বাড়লেও সঞ্চালন ব্যবস্থায় ততটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। যদি সঞ্চালন ব্যবস্থা উন্নত না হয়, তবে এমন সমস্যা ঘটতেই পারে। এ ছাড়াও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের অবহেলা তো রয়েছেই। এদিকে, ঘটনার প্রায় ৩২ ঘণ্টার বেশি সময় পার হয়ে গেলেও সরকারিভাবে বিপর্যয়ের কোনো কারণ জানানো হয়নি। তবে পিজিসিবি এবং বিপিডিবি কর্মকর্তারা মনে করেন, মঙ্গলবারের গ্রিড বিপর্যয় আশুগঞ্জ-সিরাজগঞ্জ আন্তঃসংযোগ ট্রান্সমিশন লাইনের কোথাও একটা সমস্যা থেকে শুরু হয়েছিল। পরে ধারাবাহিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে সারাদেশের বিদু্যৎ কেন্দ্রগুলো। যেহেতু বিদু্যৎ জমিয়ে রাখা যায় না, তাই চাহিদা অনুযায়ী জাতীয় গ্রিডে বিদু্যৎ সরবরাহ করা হয়ে থাকে। আবার চাহিদা কমে গেলে সীমিত করা হয় উৎপাদন। মূলত পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির দপ্তর থেকে এই সমন্বয় করা হয়। কিন্তু এই সিস্টেমের কোনো একটিতে ত্রম্নটি হলে পুরো সিস্টেমটি ভেঙে পড়ে। দেখা গেছে, যদি কোনো বিদু্যৎ স্টেশনের চাহিদা বেড়ে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়, তখন অন্য স্টেশন থেকে চাহিদা পূরণের চেষ্টা করা হয়। তখন চাপ বেড়ে যায়। কিন্তু সিস্টেমে এমন একটা ব্যবস্থা আছে যে, চাপ বেশি বা কম হলে যন্ত্রপাতির সুরক্ষার জন্য সেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে একটা চেইন রিঅ্যাকশনে পুরো ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়ে। প্রকৌশলীদের ভাষায় এটাকে বলা হয় 'ক্যাসকেড ট্রিপিং'। এদিকে জাতীয় পাওয়ার গ্রিড বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে কাজ শুরু করেছে একাধিক তদন্ত কমিটি। বিদু্যৎ বিভাগের সচিব হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি তদন্ত শুরু করেছে। এ ছাড়াও প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে আরও দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্যদিকে, পিজিসিবির নির্বাহী পরিচালক (পি অ্যান্ড ডি) এবং তদন্ত কমিটির প্রধান ইয়াকুব এলাহী চৌধুরী জানিয়েছেন, বুধবার সকালেই গ্রিড বিপর্যয়ের সম্ভাব্য কারণ খুঁজে বের করতে কাজ শুরু করেছে তদন্ত কর্মকর্তারা। এই কমিটি মূলত সাবস্টেশন ও পাওয়ার স্টেশন এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত সিস্টেম ও সুযোগ-সুবিধা পরিদর্শন করবে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন পেতে কিছুটা সময় লাগবে। কারণ, গ্রিডের পুরো সিস্টেম পর্যালোচনা করে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে হবে। পিজিসিবির নির্বাহী পরিচালক ইয়াকুব এলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটিতে আছেন-বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (বিপিডিবি), বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) এবং অন্যান্য বিদু্যৎ খাতের সংস্থার প্রতিনিধিরা। এ ছাড়াও স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রিড সিস্টেমের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন- এমন একজনকে অতিরিক্ত সদস্য হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। বিদু্যৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তদন্ত কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও আগামীতে যেন এমন বিপর্যয় না ঘটে, এর জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। বিদু্যৎ সচিব হাবিবুর রহমান যায়যায়দিনকে বলেন, 'এমন ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। তবে কেন হয়েছে, তা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব হচ্ছে না। পুরো বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে সবাই জানতে পারে।' তিনি আরও জানান, বিদু্যৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের নির্দেশে পরবর্তীতে আরও দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ব্যাপারে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বি. ডি. রহমতউলাহ বলেন, 'বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় ন্যাশনাল গ্রিডে চাহিদার সঙ্গে বিদু্যৎ সরবরাহের ব্যবস্থাটি অটোমেটিক্যালি হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে টেলিফোন করে স্টেশনগুলোকে পাওয়ার জেনারেশন বাড়ানো-কমানোর সমন্বয় করতে হয়। তার মতে, মঙ্গলবার যে বিপর্যয় হয়েছে, সেখানে গ্রিড স্টেশন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা লোকজনের অবহেলা থাকতে পারে। এ ছাড়াও বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে বিদু্যৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ হয়েছে। কিন্তু সঞ্চালন ব্যবস্থায় ততটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে সাবেক বিদু্যৎ প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, সারাদেশে যে পাওয়ার পস্ন্যান্টগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ইউনিফাইড স্পেসিফিকেশনে দেয়নি। ফলে কোনো পাওয়ার স্টেশন খুব নিউ জেনারেশনের আবার কোনোটা পুরনো। তাদের মধ্যে সিনকোনাইজড করা সম্ভব না। শুধু জেনারেশনে বিদু্যৎ চলে না, ট্রান্সমিশনে লাগে, ডিসট্রিবিউশনে লাগে-এগুলোর উন্নতি হয়নি। খালি বিদু্যৎ প্রকল্প বানিয়েই গেছে। তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র লুটপাটের জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তিকে পাওয়ার স্টেশন দিয়েছে, সেই পাওয়ার স্টেশনের স্পেসিফিকেশনগুলো কি, প্রসিডিউরগুলো কি, এটা একটির সঙ্গে আরেকটি ম্যাচ করবে কিনা- এসব বিবেচনা করেনি। ফলে বিদু্যতের এই বিপর্যয় ঘটেছে। এমন আরও ভবিষ্যতে হবে।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে