মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯
walton1
ছাত্রলীগের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

গুজবে কান দেবেন না

জনগণ আওয়ামী লীগকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেয় আমাদের সঙ্গে যৌথ আন্দোলন করে রাজনীতি শিখেছে বিএনপি তারা বুদ্ধিজীবী নন, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী
ম যাযাদি রিপোর্ট
  ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০
মঙ্গলবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত ছাত্রলীগের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নৌকা প্রতীক উপহার দেন সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক -ফোকাস বাংলা
দেশের ব্যাংকগুলোতে 'টাকা না থাকার গুজব' ছড়িয়ে একটি শ্রেণি মানুষকে 'বিভ্রান্ত করতে চাইছে' মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'কিছু গুজব ছড়াচ্ছে। কী? ব্যাংকে টাকা নেই। টাকা নেই বলে অনেকে টাকা তুলে ঘরে নিয়ে যাচ্ছে। আমি আগেও বলেছি, এখনো বলি যে এদের কি চোরের সঙ্গে কোনো সখ্য আছে কি না যে ব্যাংকের থেকে টাকা নিয়ে ঘরে রাখে চোরের পোয়াবারো। চোর চুরি করে খেতে পারবে, সেই ব্যবস্থা করে দিচ্ছে নাকি কেউ কেউ, আমি জানি না।' মঙ্গলবার সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৩০তম জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন সরকারপ্রধান। মঙ্গলবার বেলা সোয়া ১১টায় ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্মেলনস্থলে উপস্থিত হন শেখ হাসিনা। জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে তিনি জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। আর ছাত্রলীগ সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় এবং সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য উত্তোলন করেন দলীয় পতাকা। পরে পায়রা অবমুক্ত করে ছাত্রলীগের ৩০তম জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধন করেন সাংগঠনিক নেত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় ছাত্রলীগের দলীয় সঙ্গীত গাওয়া হয়। ৩০তম জাতীয় সম্মেলনেরর আহ্বায়ক অসীম কুমার বৈদ্য ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার রেজাউল করিম সুমন পরে প্রধানমন্ত্রীকে ফুলেল শুভেচ্ছা দেন। সম্মেলন উদ্বোধনের পর ঐতিহ্যবাহী এ সংগঠনের জন্য নতুন অ্যাপেরও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের ব্যাংকগুলোতে কোনো সমস্যা নেই দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমি একটা কথা স্পষ্ট জানাতে চাই- আমি এসডিজি সচিব, অর্থ সচিব এবং আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে কথা বলেছি। আজকে (মঙ্গলবার) সকালে আমি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছি। আলস্নাহর রহমতে আমাদের কোনো সমস্যা নাই। প্রতি ব্যাংকেই টাকা আছে। কাজেই আমি বলব- গুজবে কেউ কান দেবেন না। গুজবে কান দেবেন না। এটাই আমার সকলের কাছে একটা অনুরোধ যে যারা এইসব মিথ্যা কথা বলে মানুষকে তারা ভাঁওতাবাজি দিয়ে বিভ্রান্ত করতে চায়, এটা একটা শ্রেণি আছে। তারা এটা করবেই আমি জানি। আর মিথ্যা কথায় তারা পারদর্শী।' স্যোশাল মিডিয়া আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে ভরে গিয়েছে উলেস্নখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের তার ''উপযুক্ত'' জবাব দিতে হবে। জবাব দেওয়ার বেশি কিছু না। ওরা যখন আমাদের বিরুদ্ধে যেটা লেখে তার জবাব দেওয়া লাগবে না। ওদের অপকর্মটা যদি সেখানে কমেন্টে ছেড়ে দেওয়া যায়, তাহলেই ওরা ওটা বন্ধ করে দেবে। এটাই হচ্ছে সব থেকে ভালো। ওরা যা বলবে... বিএনপি ক্ষমতায় থেকে কী করেছে তাদের অগ্নিসন্ত্রাস, তাদের খুন, তারা কাকে কাকে মেরেছে, কী করেছে, কই কই তাদের চুরি, ভোট চুরি, ডাকাতি এগুলো তুলে ধরলেই তো যথেষ্ট। কাজেই আমার মনে হয় ছাত্রলীগ এই কাজটা করতে পারবে।' ছাত্রলীগের সম্মেলনে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের পড়ালেখার গুরুত্ব তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, 'লেখাপড়া শিখে এ দেশের উপযুক্ত নাগরিক হতে হবে, যেন বাংলাদেশের এই উন্নয়নের ধারাটা অব্যাহত থাকে। আমাদের আর কী। ৭৬ বছর বয়স, যেকোনো দিন অক্কা পেতে পারি। কিন্তু আমি চাই, বাংলাদেশে আমাদের যারা নেতাকর্মী, তারা সেইভাবে গড়ে উঠবে যাতে এই দেশের স্বাধীনতার চেতনা কেউ মুছে ফেলতে না পারে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেউ মুছে ফেলতে না পারে, খুনি, রাজাকার, আল বদর, যুদ্ধাপরাধী- এরা যেন কোনোদিন এই দেশে আর ক্ষমতায় আসতে না পারে সেইভাবেই জনমত সৃষ্টি করতে হবে। যে যাই করুক না কেন লেখাপড়াটা শিখতে হবে। লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতে হবে।' চতুর্থ শিল্প বিপস্নবের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, 'সেখানে কাজ করতে গেলে প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ মানব শক্তি দরকার। কাজেই আমাদের এই যুব সমাজ যারা আমাদের ভবিষ্যৎ, আমি ২০৪১-এ উন্নত বাংলাদেশ করব, তাহলে '৪১-এর সৈনিক কারা হবে? এই আজকের যুব সমাজ তারা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম। কাজেই তাদেরকে আমরা দক্ষ করে গড়ে তুলতে চাই।' বিদু্যৎ, পানি, জ্বালানি তেলসহ সবকিছু ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'ছাত্রছাত্রীদের বলব, হোস্টেলে থাকলে বিল দিতে হয় না। কিন্তু ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ওই সুইচটা অফ করতে হবে। মোবাইল চার্জ বা ল্যাপটপের চার্জ... চার্জারের সুইচটা বন্ধ করে দিতে হবে। প্রত্যেককে এভাবে সাশ্রয়ী হতে হবে। আগামী দিনে যখন বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা সেই মন্দার ধাক্কা যেন বাংলাদেশে না লাগে সেদিকে সবাইকে দৃষ্টি দিতে হবে।' প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আজকে আমাদের দারিদ্র্যের হার কমে গেছে। মানুষের খাবারে অভাব নেই। প্রচুর পরিমাণে খাবার আছে। আলস্নাহর রহমতে উৎপাদনও ভালো হয়েছে। প্রত্যেকটা জিনিস আমরা আগে থেকে লক্ষ রাখি, ব্যবস্থা নিচ্ছি। উন্নত দেশগুলো যেখানে হিমশিম খাচ্ছে- আমি ইংল্যান্ডের কথা জানি, দোকানে গেলে একটা পরিবার এক প্যাকেটের বেশি ডিম খেতে পারবে না। একটার বেশি পাউরুটি কিনতে পারবে না। সবকিছুই রেশন। বিদু্যতের দাম দেড়শ' গুণ বাড়িয়েছে, একটা পরিবার একটি রুমের মধ্যে পরিবারের সবাই হিটার জ্বালিয়ে বসে থাকে। ওই ঠান্ডায় হিটার না জ্বালিয়ে তো আর টিকতে পারে না। কাজেই ওভাবে তাদের থাকতে হয়। সেই অবস্থায় বাংলাদেশ তো অনেক ভালো অবস্থায় আছে। তারপরও আমি বলব- যখন বিশ্বব্যাপী দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, অর্থাৎ মন্দা দেখা দেয়- তার ধাক্কাটা আমাদের দেশে লাগবেই। কাজেই আমাদের আগে থেকেই সতর্ক হতে হবে।' ভোট চুরি করলে জনগণ কখনো ছেড়ে দেয় না মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমাদের বিরুদ্ধেও মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়। আমরা ভোট চুরি করতে যাব কেন? জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের ভোট দেয়। আর বিএনপি (নির্বাচনে) জিতবে কীভাবে? ২০১৮ নির্বাচনে এক সিটে তিনজন করে নমিনেশন দেয়। এখানে ফখরুল একজনকে নমিনেশন দেয়, রিজভী আরেক দফা দেয়, আর লন্ডন থেকে তারেক দেয় আরও একজনকে। যে যত টাকা পায় সে ততজনকে নমিনেশন দেয়। সেখানে হলো টাকার খেলা। তারপরে শেষে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে বলে, আমাদের নির্বাচন করতে দিল না।' এ সময় বিএনপির দু'জনের নাম উলেস্নখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'বিএনপির অন্তত দু'জন নেতা এসে আমার কাছে নালিশ করে গেছেন। সিলেটের এনাম চৌধুরী এসে সোজা বললেন, আমার কাছে টাকা চেয়েছে তারেক জিয়া। আমি দিতে পারিনি, তাই আমার নমিনেশন বাতিল করে যার কাছে টাকা পেয়েছে, তাকে দিয়েছে। আমাদের মোর্শেদ খান, তিনি নিজে এসে বলেছেন, তার কাছে মোটা অঙ্কের টাকা চেয়েছে। তিনি বলেছেন, আমি টাকা দিতে পারব না। ব্যস, তার নমিনেশন ক্যান্সেল। এই হলো তাদের ২০১৮ সালের নির্বাচন।' সাজাপ্রাপ্ত আসামি খালেদা-তারেকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যারা এখন গণতন্ত্রের কথা বলে তাদের কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক জ্ঞানী-গুণী মানুষও জিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়ে কথা বলেছিল। এখনো অনেকে আছে খালেদা জিয়া-তারেক জিয়ার সঙ্গে। মানিলন্ডারিং, অস্ত্র কারবারি ও ২১ আগস্টে গ্রেনেড হামলার আসামি তারেক। খালেদা এতিমের টাকা আত্মসাতের মামলার আসামি। এ অপরাধীদের সঙ্গে এখন অনেক জ্ঞানী-গুণীও গণতন্ত্রের কথা বলে। তারা বুদ্ধিজীবী না, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীজীবী। তারা খালেদা-তারেকের সঙ্গে গিয়ে মিলেছে। বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, '২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়ার পেটুয়া বাহিনী সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে দেয়। ঢাবিতে রাতের অন্ধকারে ভিসিকে সরিয়ে নতুন আরেকজনকে বসিয়ে দিয়ে ভিসির পদটাও দখল করে নেয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই শিক্ষকসহ বহু নেতাকর্মী হত্যা করে। তাদের অত্যাচার নির্যাতনে সারা বাংলাদেশ ছিল নির্যাতিত। শুধু ক্ষমতায় থাকলেই না, ক্ষমতার বাইরে থেকেও অগ্নিসন্ত্রাসের কথা সবার জানা। ২০১৩/১৪ সালে প্রায় তিন হাজার মানুষকে দগ্ধ করে তারা। বাস, লঞ্চ, রেল কোনো কিছুই তাদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।' তিনি বলেন, বিএনপির কাজই হচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করা। খালেদা জিয়া বলেছিলেন, আওয়ামী লীগকে শিক্ষা দিতে ছাত্রদলই যথেষ্ট। এর প্রতিবাদে আমি ছাত্রলীগের হাতে বই-খাতা, কলম তুলে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, শিক্ষা শুধু নিজেরাই গ্রহণ করবে না, গ্রামে গিয়ে নিরক্ষর মানুষকে শিক্ষা দেবে। তারা সেটিই করেছে। আমাকে রিপোর্টও দিয়েছে। আমাদের পেটুয়া বাহিনী লাগে না। ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়ের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের সঞ্চালনায় এতে আরও বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমানের পকেট থেকে অবৈধভাবে জন্ম হয়েছে বিএনপির। ক্যান্টনমেন্টে বসে গোয়েন্দাদের সহায়তায় এই বিএনপির জন্ম। কিছু রাজনীতি শিখেছে আমাদের সঙ্গে যৌথ আন্দোলন করে। এরশাদবিরোধী আন্দোলন যখন আমরা করি, তখন ওই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তারা কিছু শিখেছে। এটাই বাস্তবতা। তাছাড়া তাদের রাজনীতি আর কী ছিল। শেখ হাসিনা বলেন, জিয়াউর রহমান হঁ্যা-না ভোট দিয়ে কারচুপি শুরু করেছিলেন। এই কালচার কে নিয়ে এসেছে? এটা জিয়াউর রহমান শুরু করেছেন। হঁ্যা-না ভোটে না এর বাক্স পাওয়া যেত না। কেবল হঁ্যা-এর বাক্স পাওয়া যেত। আর আমাদের শক্তি জনগণ। আমাদের পেটোয়া বাহিনী লাগে না।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে