বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১
শিগগিরই গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযান শুরু

বায়ুদূষণে ৫৮% দায়ী ইটভাটা

আলতাব হোসেন
  ০১ মার্চ ২০২৪, ০০:০০
ঢাকার বায়ুদূষণের স্থানীয় উৎসগুলোর মধ্যে আশপাশের ইটভাটার ধোঁয়া অন্যতম -সংগৃহীত

দেশে ইট পোড়ানোর ভরা মৌসুম চলছে। সারাদেশে ইটভাটার সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার। এর মধ্যে ৪ হাজার অবৈধ। আর ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোতে রয়েছে এক হাজারের বেশি দূষণকারী ইটভাটা। এতে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। ঢাকার বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটা প্রায় ৫৮ শতাংশ দায়ী। ইটভাটার ধোঁয়ার গত ১৫ বছরে ঢাকার বাতাসে দূষণের মাত্রা বেড়েছে ৯০ শতাংশ। রাজধানীর বায়ুদূষণ বন্ধে দুই দফায় বিশ্বব্যাংক প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। তারপরও রাজধানীর বায়ুদূষণ বন্ধ করা যাচ্ছে না। দূষণে জিডিপির পাঁচ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। মানুষের গড় আয়ু কমছে ৭ বছর। বায়ুদূষণে মানুষ নানা ধরনের রোগে ভুগছে। এ জন্য অবৈধ ও দূষণকারী ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযান চলছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। খুব শিগগিরই ঢাকার আশপাশে অভিযান শুরু হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট উইংয়ের পরিচালক মোহাম্মদ মাসুদ হাসান পাটোয়ারী বলেন, ইতিমধ্যে সারাদেশে প্রায় ৪শ' অবৈধ ও দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ ও জরিমানা করা হয়েছে। অবৈধ ও দূষণকারী ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযান চলমান রয়েছে। খুব শিগগিরই ঢাকার আশপাশের ইটভাটাগুলো অভিযান চলবে। তিনি জানান, বরিশালে ৭টি, ফরিদপুর ও চট্টগ্রামে ২৯টি, মানিকগঞ্জে ৬টি, মুন্সীগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জে ২০টি, ভোলায় ৬টি,

নেত্রকোনায় ২টি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২টি, কুমিলস্না ও বান্দরবানে ১৮টি, নোয়াখালী ও কক্সবাজারে ২২টিসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ ইটভাটা বন্ধ ও জরিমানা করা হচ্ছে।

এদিকে, রাজধানীর আশপাশের ইটভাটার দূষণ নিয়ে গত ৮ ফেব্রম্নয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় সাংবাদিকদের বলেন, রাজধানীর বায়ুদূষণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী ঢাকার আশপাশের ইটভাটা। তিনি বলেন, গবেষণা অনুসারে শুষ্ক মৌসুমে ঢাকা শহরের বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটা ৫৮ শতাংশ দায়ী।

রাজধানীর আশুলিয়া, তুরাগ, গাবতলী, আমীনবাজার, ধামরাই, সাভার থেকে শুরু করে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত পথের দুই পাশে দেখা যায় শত শত ইটভাটা থেকে কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। এদিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে তেঘরিয়া, কোন্ডা, রাজেন্দ্রপুর, রাজহালট, কদমপুর, জাজিরা, বাক্তারচর হয়ে আটিবাজার, বসিলা পর্যন্ত হাজার খানেক ইটভাটার চুলিস্ন থেকে অনবরত কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। এসব রাজধানী ও উপশহরগুলোতে বায়ু ও পরিবেশ দূষণ করছে।

সারাদেশে ইটভাটা আছে প্রায় ৮ হাজার। দেশের বেশিরভাগ ইটভাটা নিয়মবহির্ভূতভাবে চলছে। এসব ইটভাটার কারণে ঘটছে বায়ুদূষণ। আর ইটভাটাগুলোয় প্রতি মৌসুমে ২৫ লাখ টন কয়লা ও ২২ লাখ টন কাঠ পোড়ানো হয়। ইটভাটার দূষণে ৮৮ লাখ ৮৬ হাজার টন গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গত হয়। বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটা প্রায় ৫৮ শতাংশ দায়ী। এ ছাড়া নির্মাণ কাজ, যানবাহন, সড়ক ও মাটি থেকে সৃষ্ট ধুলাবালির মাধ্যমে ১৩ শতাংশ, বিভিন্ন জিনিসপত্রসহ পস্নাস্টিক সামগ্রী পোড়ানোর ফলে ৫ শতাংশ এবং প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ২৪ শতাংশ আসছে ঢাকায়।

গত ২৪ জানুয়ারি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী বলেছিলেন, রাজধানীর বায়ুদূষণ কমাতে আগামী ১০০ দিনে রাজধানীর আশপাশের পাঁচশ' ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। ঢাকার চারপাশে ১ হাজার অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। ১০০ দিনের কর্মসূচিতে দিনে গড়ে তিন থেকে চারটি ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেব। আদালতের হিসেবে ২ হাজারের মতো অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। আমরা প্রথমে ঢাকার আশপাশে স্থায়ী চিমনিগুলো চিহ্নিত করছি। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে দ্রম্নতই অবৈধ ও দূষণকারী ইটভাটা ভেঙে দেওয়ার অভিযান শুরু হবে।

ইট উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। সারাদেশে ৮ হাজারের বেশি ইটভাটা রয়েছে। যার মধ্যে ৪ হাজার অবৈধ। বছরে প্রায় ২৩ বিলিয়নের বেশি ইট বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে ইটভাটাও বাড়ছে দিনের পর দিন। বছরে প্রায় ৯ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন টন কয়লা ইটভাটায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ২০১০ ও ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৩-এ বলা হয়েছে, বসতি এলাকা, পাহাড়, বন ও জলাভূমির এক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ইটভাটা করা যাবে না। কৃষিজমিতেও ইটভাটা অবৈধ। অথচ দেশের প্রায় শতভাগ ইটভাটা এই আইন মানছে না। ইট তৈরির কাঁচামাল হিসাবে বছরে প্রায় ৩৩ হাজার ৫০ মিলিয়ন কিউবিক ফুট ফসলি মাটি ইট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। দেশে অধিকাংশ ইটভাটায় চিমনি পদ্ধতিতে ইট পোড়ানো হয়। এক্ষেত্রে ধোঁয়া নির্গমন বেশি হয়। এতে বছরে প্রায় ১৫ দশমিক ৬৭ মিলিয়ন টন কার্বন ডাইঅক্সাইড ইটখোলা থেকে বায়ুমন্ডলে যোগ হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণায় দেখা যায়, ইটখোলার আশপাশে বসবাসরত মানুষ বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন। ইটভাটা থেকে নির্গত কার্বন ডাইঅক্সাইড একটি অন্যতম গ্রিনহাউস গ্যাস। অনবায়নযোগ্য জ্বালানি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও বনায়ন ধ্বংসের ফলে বায়ুমন্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ লাগামহীনভাবে বেড়েই চলছে। ইট তৈরিতে ব্যবহৃত মাটিতে ক্যালসিয়াম কার্বনেটের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। এ ছাড়াও ইটের ভালো রং হতে ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়। উচ্চ তাপে ওই মাটিতে উপস্থিত ক্যালসিয়াম কার্বনেট ভেঙে ক্যালসিয়াম অক্সাইড ও কার্বন ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন হয়। এভাবে দেখা যাচ্ছে, প্রতি কেজি ইট তৈরিতে শুধু মাটি থেকে প্রায় ২৫ গ্রাম কার্বন ডাইঅক্সাইড বায়ুমন্ডলে যোগ হচ্ছে যা বায়ুদূষণ ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করছে। এ ছাড়াও ইটভাটা থেকে নির্গত ছাই পার্শ্ববর্তী নদী বা জলাশয়ে নিষ্কাশিত হয়। ওই বর্জ্য পানিতে মিশে বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত উপাদান যেমন- লেড, ক্যাডমিয়াম, জিংক ও ক্রোমিয়াম জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর মাধ্যমে খাদ্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। ফলে মানুষ বিভিন্ন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত জটিল রোগের সম্মুখীন হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে বায়ুদূষণের জন্য বেশি দায়ী ইটভাটা। দেশের ৮ হাজার ইটভাটা রয়েছে যার অর্ধেকের পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। এসব ইটভাটায় ইট তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে ফসলি জমির উর্বর মাটি। এতে জমির উর্বরতা শক্তি ও ফসল উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। যত্রতত্র গড়ে ওঠা অবৈধ ইটভাটার আগ্রাসনে বিনষ্ট হচ্ছে তিন ফসলি জমি। যা কৃষিনির্ভর জনবহুল দেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। এ ছাড়াও ইটভাটায় অবাধে পোড়ানো হচ্ছে জ্বালানি কাঠ ও নিম্নমানের কয়লা। এতে উজাড় হচ্ছে বন এবং দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। এ জন্য নির্মাণ কাজের জন্য দূষণমুক্ত বস্নকের কারখানা তৈরির পরামর্শ দিচ্ছেন পরিবেশকর্মীরা।

পরিবেশবিদ আবু নাসের বলেন, প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু উভয়ের জন্য পার্টিকুলেট ম্যাটার স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ইটভাটা থেকে নির্গত এই দূষিত উপাদান মানবদেহে শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে প্রবেশ করে রেসপিরেটরি সিস্টেমের ক্ষতি করে যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে ইটভাটার আশপাশে বসবাসরত মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে। গবেষণায় আরও পাওয়া যায়, বর্তমানে বায়ুতে পার্টিকুলেটস ম্যাটারের উপস্থিতিতে মানুষের মৃতু্যর হার আগের তুলনায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বায়ুতে মাত্রাতিরিক্ত সালফার ডাইঅক্সাইডের উপস্থিতির কারণে মানুষ চোখ, নাক, গলাসহ অ্যাজমাটিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। বায়ুতে দূষিত উপাদানের উপস্থিতিতে ফুসফুসে ক্যানসার, হার্ট অ্যাটাক ও অন্যান্য রোগের প্রাদুর্ভাবে মৃতু্যর হার বেড়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে পরিবেশ আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাইফুল হাসান বলেন, ইটভাটা বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। একই সঙ্গে তা কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতির ক্ষতি করছে। একদিকে ইটভাটা বন্ধ করলে আরেকদিকে অবৈধ ইটভাটা বাড়তে থাকে। স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি ও সহায়তা ছাড়া অবৈধ ইটভাটা বন্ধ হবে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ ইটভাটার মালিকরা আদালতের আশ্রয় নিয়ে থাকে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ঢাকার আশপাশের অবৈধ ও দূষণকারী ইটভাটার বিরুদ্ধে জরিমানা ও ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযান শুরু করা প্রয়োজন।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে