শুক্রবার, ০১ মার্চ ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০
walton
সফলতার গল্প

টমেটো-কমলা, পান ও হাঁসের খামারে স্বপ্ন বুনছেন কৃষক

স্বদেশ ডেস্ক
  ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩, ০০:০০

টমেটো, কমলা ও পান চাষ করে এবং হাঁসের ভ্রাম্যমাণ খামারের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন এক ঝাঁক তরুণ। বাগেরহাটের চিতলমারীতে টমেটো চাষে, দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে কমলা ও কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে পান চাষে এবং নওগাঁর নিয়ামতপুরে হাঁসের ভ্রাম্যমাণ খামারে আলোর মুখ দেখছেন এসব তরুণ উদ্যোক্তা ও কৃষক। প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে বিস্তারিত ডেস্ক রিপোর্ট-

চিতলমারী (বাগেরহাট) প্রতিনিধি জানিয়েরছেন, প্রতিকূল পরিবেশ ও বৈরী আবহাওয়ার সঙ্গে সংগ্রাম করে এ বছর টমেটো চাষে সাফল্য এনেছেন চাষিরা। বর্তমানে বাজার দর ভালো থাকায় বিগত দিনের লোকসান কাটিয়ে লাভের মুখ দেখছেন অনেকে। এতে চাষিদের মধ্যে খুশির আমেজ ফিরে এসেছে।

আর এমনই সোনালি স্বপ্ন নিয়ে বাগেরহারে চিতলমারীতে টমেটো ক্ষেতে রাত-দিন পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষান-কৃষানিরা। এ বছর এলাকার অধিকাংশ আবাদি-অনাবাদি জমিতে ব্যাপকভাবে টমেটোর আবাদ করা হয়েছে। এটি চাষ করে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখছেন চাষিরা।

স্থানীয় কৃষি অফিস ও এলাকার চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার বড়বাড়িয়া, কলাতলা, হিজলা, চিতলমারী সদর, চরবানিয়ারী ও সন্তোষপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ আবাদি-অনাবাদি জমি ও চিংড়ি ঘেরের পাড়ে এ বছর ব্যাপকভাবে টমেটোর চাষ করা হয়। বর্তমানে প্রতিটি ক্ষেতে বাম্পার ফলন হয়েছে। এছাড়া এ বছর বাজার দর ভালো থাকায় বিগত দিনের লোকসান কাটিয়ে চাষিরা লাভের মুখ দেখছেন।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন চিংড়ি ঘেরের পাড়জুড়ে দৃষ্টিনন্দন টমেটো গাছে প্রচুর ফল ধরেছে। উচ্চফলনশীল জাতের এ টমেটোর থোকায় নুইয়ে পড়েছে ডালপালা। সুরশাইল গ্রামের শান্তি রঞ্জনের ছেলে সজল মন্ডল, শ্যামপাড়া গ্রামের অসীম মন্ডলসহ অনেক চাষি জানান, এ বছর টমেটোর ফলন খুবই ভালো হয়েছে। বাজার দরও বেশ আশানুরূপ। বর্তমানে বাজারে কাঁচা টমেটোর ও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা এখানে টমেটো কিনতে ভিড় জমাচ্ছেন। প্রতিদিন দেশের নানা স্থানে ট্রাকযোগে চালান হচ্ছে এসব টমেটো।

ঢাকার ব্যবসায়ী হারুন শেখ জানান, এলাকার সবজি ও টমেটোর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে রাজধানীতে। এসব টমেটো দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে বাজার দর ভালো থাকায় চাষিরাও ভালো দাম পাচ্ছেন। পুরো মৌসুমে এখান থেকে শত শত ট্রাক টমেটো রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান হয়ে হচ্ছে।

উপজেলার চরবানিয়ারী ইউনিয়নের শ্যামপাড়া গ্রামের নির্মল মন্ডল জানান, তিনি এক বিঘা জমিতে টমেটো আবাদ করেছেন। এছাড়া অসিম মন্ডল দুই বিঘা, গীতা বৈরাগী ১৫ কাঠা জমিতে টমেটো চাষ করেছেন। তারা আশা প্রকাশ করে জানান, এ বছর অতিবৃষ্টিতে করলা-শসাসহ অন্যান্য সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেলেও টমেটোর বাম্পার ফলন হয়েছে। বাজারও দর বেশ ভালো। অন্য বছর এ সময় টমেটোর মণ ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা দরে বিক্রি হতো। কিন্তু এ বছর প্রতি মণ টমেটো ২ হাজার থেকে ২২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে চাষিরা ভালো দাম পেয়ে বেজায় খুশি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সিফাত-আল মারুফ জানান, এ বছর উপজেলায় মোট ৮২৫ হেক্টর জমিতে হাইটম, বিজলী, লাভলী ও বিউটিফুল জাতের উচ্চফলনশীল টমেটো আবাদ করা হয়েছে। ৬০ কোটি টাকার টমেটো বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। সার্বিকভাবে কৃষি অফিস থেকে চাষিদের পরামর্শ ও খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।

ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি জানান, দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে বিসমিলস্নাহ নার্সারিতে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা উৎপাদনের পাশাপাশি দার্জিলিং, ম্যান্ডারিং, চায়না এবং ছাতকী কমলা পরীক্ষামূলক চাষে সফলতা পেয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম। ২০০১ সালে মাত্র ৩৩ শতক জমি নিয়ে ঘোড়াঘাট পৌরসভার নুরজাহানপুর এলাকায় নার্সারি গড়ে তোলেন জাহাঙ্গীর আলম। গত কয়েক বছরে নার্সারির পরিধি বেড়ে বিস্তার লাভ করে ৪ একর জমিতে। বর্তমানে নার্সারিতে বাহারি জাতের দেশি-বিদেশি ফলদ, ফুল, মসলা ও ঔষধি গাছ রয়েছে।

২০২০ সালের জুন মাসে জাহাঙ্গীর তার নার্সারির মধ্যে এক একর জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে বিভিন্ন জাতের কমলার চাষ করেন। শুরুতে নানা শঙ্কা থাকলেও এখন তিনি সফলতার পথে। গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে হলুদ রঙ্গের কমলা। প্রতিদিনই বিভিন্ন স্থান থেকে কমলার বাগান দেখতে আসছেন নানা বয়সি ও শ্রেণি-পেশার মানুষ। কমলা বিক্রি করে এ বছর খরচ বাদে আড়াই লাখ টাকা লাভ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এছাড়াও তিনি কমলার চারা ১০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে বাগান থেকে বিক্রি করছেন।

কমলার বাগান দেখতে আসা দর্শনার্থী রুহুল আমিন বলেন, এ রকম কমলার বাগান আগে কখনো দেখেননি। প্রতিটি গাছই কমলায় পরিপূর্ণ। কমলা ছিঁড়ে খেয়ে দেখেছেন অনেক মিষ্টি। যার কারণে নিজেও বাগানের কথা ভাবছেন।

নার্সারি মালিক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তিন বছর আগে তার নার্সারির এক একর জমিতে পরীক্ষামূলক কমলা চাষ করেন। বর্তমানে বাগানে পরিপূর্ণভাবে কমলা ধরেছে, সুস্বাদু হওয়ায় অনেক চাহিদা। বাগান থেকেই ৩২০ টাকা দরে কমলা বিক্রি করছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রফিকুজ্জামান জানান, কমলা চাষের জন্য ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাসহ গ্রীষ্মকালে কমলা ক্ষেতে ছাউনি দিয়ে ছায়ার ব্যবস্থা করলে ভালো হয়। এছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণ জৈবসার ব্যবহার করতে হবে। গাছপ্রতি পটাশ ১২০ গ্রাম ও বোরণ ২০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হবে এবং গাছের গোড়ার দিকে অপ্রয়োজনীয় ডাল ছাঁটাইয়ের পরামর্শ দেন তিনি। কমলা চাষ বাড়াতে নানা পরার্মশ ও চাষে উদ্বুদ্ধ করছে উপজেলা কৃষি বিভাগ।

হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে আবাদি উঁচু জমিতে, বাড়ির পাশে এবং বিভিন্ন গাছে বা বাড়ির আঙিনায় পান চাষে আগ্রহ বাড়ছে চাষিদের। এতে স্বাবলম্বী হচ্ছেন এলাকার অনেক দরিদ্র পরিবার। এক সময় ইউনিয়নজুড়ে দেখা যেত ধানক্ষেত, এখন সেখানে চোখে পড়ে পানের বরজ।

সূত্র জানায়, চলতি বছর উপজেলায় ১২ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ হয়েছে। এর প্রতি একর জমিতে পানের উৎপাদন ব্যয় পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা, আর তা বিক্রি হয় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকায়। উপজেলায় সুরাটি, হারেঞ্জা ও বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৫০০ পান চাষি রয়েছে। উপজেলার ছয় ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে অসংখ্য পানের বরজ রয়েছে। এখানকার উৎপাদিত পান উপজেলার চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ হচ্ছে পাশের পাকুন্দিয়া, নান্দাইল ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।

এরই মধ্যে উপজেলা পানপলস্নী খ্যাত সুরাটি, সিদলা, জাহাঙ্গীরপুর, পিতলগঞ্জ, বরুয়া, হারেঞ্জাসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ পান চাষ করে বদলে দিয়েছেন গোটা উপজেলার পরিবেশ। ওই উপজেলার পানচাষি তার শ্রম কাজে লাগিয়ে পান চাষ করে বদলে দিচ্ছেন তাদের পরিবারের ভাগ্য।

শুক্রবার সিদলা ইউনিয়নের সুরাটি গিয়ে দেখা গেছে, মাঠের পর মাঠ পানের বাজ। কেউ ক্ষেত থেকে পান তুলছেন, কেউ করছেন ক্ষেতের পরিচর্যা। কথা হয় সুরাটি গ্রামের পানচাষি তমিজ মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, 'পান আমার কষ্ট দূর করছে। এখন গোয়ালে গরু আছে, ডুলিভরা ধান, আর ক্ষেতভরা পান আছে। সব মিলে আমার সুখের সংসার।'

এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এ কে এম সাহজাহান কবির জানান, পান লাভজনক হওয়ায় এ অঞ্চলে পান চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এবার উৎপাদিত পান থেকে প্রচুর আয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়াও পান চাষ করতে গিয়ে কৃষক কোনো রকমের সমস্যার সম্মুখীন হলে তাদের পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করে থাকেন।

নিয়ামতপুর (নওগাঁ) প্রতিনিধি জানান, হাঁসেদের প্যাক প্যাক শব্দে সকাল শুরু হয়। বিল এলাকা থেকে এমন মধুর শব্দ ভেসে আসলে শুনতে কার না ভালো লাগে। এমন সুর শুনতে পাওয়া যায় নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার ভাবিচা বিলে।

ঘটনাস্থলে যেতেই দেখা গেল পিঠে বস্তা নিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে যাচ্ছেন একজন। বস্তার মুখ দিয়ে পড়ছে অল্প অল্প করে ধান। এভাবে পুরো বস্তার ধান ছড়িয়ে দিলেন চারপাশে। সঙ্গে সঙ্গে প্যাক প্যাক শব্দ করে ছুটে আসল হাজার হাজার হাঁসের দল।

এই বিলেরপাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে ভ্রাম্যমাণ হাঁসের খামার। এসব খামারে হাঁস লালন পালনে যেমন খরচ কম, তেমনি লাভবানও হচ্ছেন খামারিরা, এমনটাই জানিয়েছেন তারা।

সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, ভাবিচা বিলে হাঁস খামারে প্রায় দুই হাজার হাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে বিলের খালের পানিতে। খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে দু'জন লোক হাঁসগুলো দেখভাল করছেন। খালের পাড়ে তৈরি করা হয়েছে হাঁসের খামারের অস্থায়ী ঘর। সেখানে একচালা ছোটঘর করে থাকেন খামারিরা।

হাঁস খামারি আজাহার আলী বলেন, দিনভর বিলে চরে হাঁসগুলো। ঘুরে ঘুরে খায় প্রাকৃতিক খাবার। বাড়তি খাবার দেওয়ার তেমন প্রয়োজন পড়ে না। সকালে অল্প করে ধান খেতে দেওয়া হয়। এছাড়া খাল ও বিল কেন্দ্রিক খামারিদের হাঁস পালনে তেমন একটা খরচ নেই বললেই চলে। অল্প পুঁজি খাটিয়েই এই ব্যবসা করা যায়। লাভও ভালো হয় বলে জানালেন ওই খামারি।

নিয়ামতপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল লতিফ জানান, হাঁসের মাংস ও ডিম উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখছেন এসব ভ্রাম্যমাণ খামারি। এসব হাঁস বিলে ঘুরেঘুরে প্রাকৃতিক খাবার শামুক, ঝিনুক, জলজ উদ্ভিদ ও ফসলের উচ্ছিষ্ট অংশ খায়। এসব খাবারের মধ্যে সুষম খাবারের ছয়টি উপাদান বিদ্যমান থাকে। ফলে হাঁসগুলো খুব তাড়াতাড়ি বৃদ্ধি পায় ও ডিম দেয়। প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি পূরণে একটা বড় অবদান রাখছে এই হাঁসগুলো। খামারিরাও কম খরচে এই হাঁস পালন করতে পারছেন।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে