বুধবার, ২৪ জুলাই ২০২৪, ৯ শ্রাবণ ১৪৩১

২৮ বছরেও তাদের ভাগ্য বদলায়নি

তারেক মাহমুদ, ঝিনাইদহ
  ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০০:০০
বিল ক্লিনটন ও স্ত্রী হিলারির ছবি হাতে এক বৃদ্ধা -যাযাদি

আলোচিত এলাকা ঋষিপাড়া। ১৯৯৫ সালে এখানে এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের স্ত্রী সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। এরপর থেকে ঋষিপাড়াকে অনেকে হিলারিপাড়া বলেও ডাকেন। ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়কের কোলঘেঁষে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারবাজার ইউনিয়নের মহিষাহাটি গ্রামের একটি অংশ ঋষিপাড়া। এ পাড়ার অধিকাংশ পরিবার দরিদ্র। ১৯৯০ সালে এখানে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। মাত্র আধা কিলোমিটার দূরেই রয়েছে হাটবারবাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়। যেখানে গ্রামের ছেলেমেয়েরা পড়ে। তবে দারিদ্রতা ও পারিবারিক নানা টানাপড়েনের জন্য প্রাথমিকের গন্ডি পেরোতেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় এ পাড়ার মেয়েদের। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এমন রীতির কিছুটা হলেও পরিবর্তন হয়েছে। এখন এ সম্প্রদায়ের সন্তানরা বিদ্যালয়ে যায়। লেখাপড়া শিখে অনেকে চাকরি করছেন।

সে সময় হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে ছিলেন মেয়ে চেলসিয়া ক্লিনটন এবং গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও তখনকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নোবেল জয়ী ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস। সে সময় তারা গ্রামবাসীকে বলেছিলেন তোমাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। অনেক কিছু দেওয়া হবে। কিন্তু শুধু ঋণ ছাড়া আর কিছুই পাননি গ্রামের বাসিন্দারা।'

ঋষিপাড়ার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত ঋষি সম্প্রদায়ের মানুষগুলো। সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা আর শিক্ষাহীনতার কারণে পরিবারের মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। পাশাপাশি পরিবারের ছেলেদেরও একই অবস্থা। ছেলেদের অল্প বয়সে উপার্জনমুখীও হতে হয়। হিলারিপাড়া ও পার্শ্ববর্তী বাদেডিহি আর ফুলবাড়ীপাড়ায় ঋষি সম্প্রদায়ের শতাধিক পরিবারের বসবাস। বেশির ভাগ পরিবারের ছেলেরা নরসুন্দরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বাকিরা জুতা সেলাই, বাঁশ-বেত দিয়ে বিভিন্ন তৈজসপত্র তৈরি করেন। বাকিরা রিকশা-ভ্যান ও কৃষিশ্রমিক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করেন। এর মধ্যে অনেকে আছেন লেখাপড়া শেষে সরকারি-বেসরকারি চাকরি করছেন। তবে তারা এখনো নাগরিক সব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

তবে হিলারি ক্লিনটন ও মুহাম্মদ ইউনূস আসার পর গ্রামের মানুষের মনে স্বপ্ন জেগেছিল, এবার তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। কিন্তুদীর্ঘ ২৮ বছর পেরিয়ে গেলেও ভাগ্যের পরিবর্তন তো দূরের কথা এ পাড়ার অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়েছেন। তবে গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ নিয়ে অনেকের জীবন মানের পরিবর্তন হয়েছে বলে জানান গ্রামের বসবাসকারীরা।

গ্রামে অবস্থিত সরকারি মহিষাহাটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহাবুর রহমান বলেন, প্রথমদিকে গ্রামের সব ছেলেমেয়ে স্কুলে আসলেও, ঋষিপাড়ার ছেলেমেয়েরা আসত না। তবে এখন এ পাড়ার সন্তানরা স্কুলে পড়ে। তারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, লেখাপড়ার মানও ভালো। তারা অনেকে এখন পরিবারের পেশা ছেড়ে উন্নত জীবনের পথে আসতে চান।

প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, আর্থিক সংকট, অধিক সন্তান, ধর্মীয় গোঁড়ামি, সচেতনতার অভাব-ই মূল কারণ। ঋষি সম্প্রদায় মনে করে, তাদের সন্তান বিশেষ করে মেয়েদের বয়স বেশি হলে পাপ হবে, পাত্র পাওয়া যায় না। এ জন্য বাল্যবিয়ে দেয়। আবার আর্থিক অনটনের কারণে ছেলেদের উপার্জনের কাজে লাগান। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের কোনো সচেতনতা কার্যক্রমই এই জনগোষ্ঠীকে তাদের প্রাচীন জীবনধারা থেকে বের করতে পারেনি।

ঋষিপাড়ার বাসিন্দা সবুজ বলেন, নোবেল জয়ী মুহাম্মদ ইউনূস ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফার্স্টলেডি হিলারি ক্লিনটন গ্রামে আসার পর অনেকে গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ নিয়েছিলেন। তাদের আহ্বানে সবাই ঋণ নিয়েছিল। ঋণ নেওয়ার পর অনেকে ভাগ্যের পরিবর্তন করেছেন, আবার অনেকে আরও বেশি ঋণগ্রস্ত হয়েছেন। তবে এখন গ্রামে পাকা রাস্তা হয়েছে, বিদু্যৎ এসেছে। আগের থেকে এ পাড়ার বাসিন্দারা এখন উন্নত জীবনযাপন করছেন। গ্রাম থেকে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রথম সদস্য ভক্ত দাসও বললেন একই ধরনের কথা।

গ্রামের ৭০ বছরের বাসিন্দা মিনা রানি দাস। তিনি জানালেন যেদিন হিলারি ক্লিনটন, তার মেয়ে ও গ্রামীণ ব্যাংকের ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামে এসেছিলেন তখন তারা অনেক মজা করেছিলেন। হিলারিকে তারা শাড়ি পরিয়েছিলেন, শাড়ি পরিয়ে কেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিলেন। হিলারির সঙ্গে অনেক ছবি তুলেছিলাম। তারা ইংরেজিতো বোঝেন না। তারা আমাদের বলেছিল, তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। তাদের অনেক কিছু দেওয়া হবে কিন্তু শুধু ঋণ ছাড়া আর কিছুই পাইনি।

ঋষিপাড়ার বাসিন্দা রিকশাচালক কালিদাসের ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বাঁশ দিয়ে ঝুড়ি-কুলা তৈরি করে জীবন সংগ্রাম শুরু করেন। পরে কৃষি জমিতে দিনমজুরের কাজ করতেন। প্রায় ১২ বছর হলো যশোরে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। স্ত্রী জোসনা দাস অন্যের বাড়ি কাজ করেন। লেখাপড়া করেননি কেউ। ১৮ বছর আগে তাদের বাল্যবিয়ে হয়েছিল। মৌলিক কিংবা নাগরিক অধিকার কী, জানা নেই তাদের। তাদের তিন মেয়ে সন্তান। বড় মেয়ে নূপুর দাসের বয়স ১৬। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে বাড়িতে থাকছে। হৃদরোগী হওয়ায় কোনো কাজ করতে পারে না। দ্বিতীয় মেয়ে বাসনা দাস (১৩) চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। ছোট মেয়ে সুবর্ণা দাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে।

এ ব্যাপারে কালীগঞ্জ উপজেলা মানবাধিকার কর্মী ও পিছিয়ে পড়া শিশুদের নিয়ে কাজ করা সোনার বাংলা ফাউন্ডেশনের পরিচালক শিবুপদ বিশ্বাস জানান, 'ঋষিপাড়ার বাসিন্দারা মূলত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। ওই এলাকায় আমার একটি শিশু স্কুল ছিল, সেখানে তারা লেখাপড়া করত। এই সম্প্রদায় বাল্যবিয়ে প্রথায় তাদের বিশ্বাস। অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণে বেশির ভাগ পরিবার অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেয়। একই বয়সি ছেলেদের কাজে-কর্মে লাগায়। সমাজের মানুষ হিসেবে সবারই উচিত, এই জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেওয়া জন্য প্রচেষ্টা চালানো।'

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান বলেন, 'ঋষিপাড়ার বাসিন্দাদের বিষয়ে আমি তেমন কিছুই জানি না। বিভিন্ন মাধ্যমে গ্রামের পিছিয়ে পড়া এ সম্প্রদায়ের কথা শুনেছি। আমি এই উপজেলায় নতুন এসেছি। তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নেব। সেই সঙ্গে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে উদ্যোগ নেব বলে যোগ করেন।'

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে