বঙ্গবন্ধু যুব ঋণ

প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় কর্মসংস্থান ব্যাংকের অনুকূলে আমানত/তহবিল হিসেবে ঘোষিত ৫০০ কোটি টাকা দেশের বেকার যুবকদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এবং ব্যাংকের তহবিল ঘাটতি পূরণে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। এবং বঙ্গবন্ধু জন্মশতবার্ষিকীকে স্মরণীয় করে রাখতে মুজিববর্ষে কর্মসংস্থান ব্যাংক কর্তৃক গৃহীত 'বঙ্গবন্ধু যুব ঋণ' হতে পারে বেকার যুব অর্থনৈতিক মুক্তির দিশারি। এজন্য সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা বিশেষ করে তহবিলের যোগান অপরিহার্য
বঙ্গবন্ধু যুব ঋণ
মো. আব্দুল মান্নান

এসডিএফ

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার সিংহভাগই কর্মক্ষম তরুণ। দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যার উলেস্নখযোগ্য অংশই বেকার। এই বেকার জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকান্ডে সম্পৃক্তকরণ ব্যতিরেকে দেশের সুষম উন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশের সুষম উন্নয়ন, বেকারত্ব হ্রাস ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী দেশ গড়ার প্রত্যয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগে ১৯৯৮ সালে ৭ নং আইন বলে কর্মসংস্থান ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বেকার যুবক ও যুব মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থান এবং নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি এ ব্যাংকের মূল লক্ষ্য। ১৯৯৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বেকার যুবকদের মাঝে ঋণের চেক হস্তান্তরের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাংকের উদ্বোধন করেন।

কর্মসংস্থান ব্যাংক আইন অনুযায়ী ব্যাংক জনগণের নিকট হতে সরাসরি আমানত সংগ্রহ করতে পারে না। ব্যাংকের তহবিলের অন্যতম প্রধান উৎস পরিশোধিত মূলধন, প্রাতিষ্ঠানিক আমানত, ঋণ গ্রহণ ও ঋণ গ্রহীতাদের ক্ষুদ্র সঞ্চয়। ব্যাংকের শুরুতে অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধন ছিল যথাক্রমে ৩০০ কোটি ও ১০০ কোটি টাকা। মাঠ পর্যায়ে ঋণের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার ধাপে ধাপে অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধন বৃদ্ধি করছে। বর্তমানে ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ১০০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৮০০ কোটি টাকা।

বর্তমানে দেশের ১৭ কোটির বেশি জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশেরও বেশি কর্মক্ষম যাদের বয়স ১৫ থেকে ৬৪ বছর। যখন কোনও দেশে যুবকের এত আধিক্য থাকে, যারা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম, এ সুযোগটি জনসংখ্যাতাত্ত্বিক লভ্যাংশ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হিসেবে পরিচিত। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ বছর অব্যাহত থাকে। একটি দেশের জন্য এ লভ্যাংশ সাধারণত একবার আসে। দেশের মোট জনসংখ্যায় তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ থাকায়, আমাদেরকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সুবিধা নেয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এজন্য দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল এবং দক্ষ কর্মী বাহিনীতে রূপান্তর করা দরকার। জনসংখ্যাতাত্ত্বিক লভ্যাংশের সুফল গ্রহণের লক্ষ্যে বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরির এখনই সর্বোত্তম সময়।

দেশে ছাত্রসমাজ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করলেও বাস্তবমুখী জ্ঞান খুবই কম। ফলে কারিগরি বা বাস্তবমুখী শিক্ষার অভাবে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের হার। কারিগরি ও বিশেষায়িত শিক্ষায় দক্ষতাসম্পন্ন ও অভিজ্ঞতা সম্পন্নদের চাকরির বাজারে দেশে ও দেশের বাইরে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু চাহিদানুযায়ী দক্ষ জনবল সৃষ্টিতে আমাদের বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থা যুগোপযোগী নয়। ফলে দেশের শিক্ষিত বেকার যুবক ও যুব মহিলারা চাকরি না পেয়ে হচ্ছে হতাশাগ্রস্ত। আবার হতাশাগ্রস্ত বেকার যুবকদের একটি অংশ ধ্বংসাত্মক কাজে জড়িয়ে পড়ছে, যা কেবল তার নিজ বা পরিবারের জন্যই হুমকি নয়, বরং রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। এজন্য এ সমস্যা থেকে উত্তরণের করণীয় ঠিক করতে সরকার নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করছে। চাকরীর পাশাপাশি আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে সরকার বেকার যুবসমাজকে স্বাবলম্বী করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি করার প্রয়াশ অব্যাহত রেখেছেন।

প্রশিক্ষণ কিংবা বাস্তব অভিজ্ঞতা ব্যতীত কোনো কাজই সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা সম্ভব নয়। কাজের গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। প্রশিক্ষিত যুবকরাই গড়তে পারে সমৃদ্ধ সোনার বাংলা। সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে প্রশিক্ষিত যুবকদের পাশে দাঁড়িয়েছে কর্মসংস্থান ব্যাংক। এ ব্যাংকের ঋণ প্রদানের টার্গেট গ্রম্নপ হলো যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বেকার যুবক ও যুব মহিলা।

গতানুগতিকভাবে ব্যাংক তেলের মাথায় তেল দেয়। এ গতানুগতিক ধারার গন্ডি পেরিয়ে ব্যতিক্রমধর্মী প্রত্যয় নিয়ে কর্মসংস্থান ব্যাংক বেকার যুবকদের পাশে দাঁড়ানোর অভিলক্ষে উপজেলাভিত্তিক শাখা খোলার কার্যক্রম গ্রহণ করে। বর্তমানে ২৪৮ শাখার মাধ্যমে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বেকার যুবকদের মাঝে উৎপাদন, সেবা ও ব্যবসায়িক খাতে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ বিতরণ করছে।

প্রাথমিকভাবে ব্যাংকারদের মাঝেই বদ্ধমূল ধারণা ছিল জামানত গ্রহণপূর্বক ঋণ বিতরণ করে বিতরণকৃত ঋণ আদায় করা যেখানে কষ্টকর সেখানে জামানতবিহীন ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ। কিন্তু তাদের এ ধারণা ভুল প্রমাণ করেছে বেকার যুবক ও যুব মহিলারা। কারণ বেকার যুবকদের মাঝে বিতরণকৃত ঋণের আদায় হার ৯৫ শতাংশ। শ্রেণিকৃত ঋণ নিয়ে যেখানে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিমশিম খাচ্ছে সেখানে কর্মসংস্থান ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের হার মাত্র ৪ শতাংশ। এ ব্যাংকে শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২৩ লাখ লোকের কর্মসৃজন হয়েছে।

স্বাধীনতার মহান স্থপতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে কর্মসংস্থান ব্যাংক ২ লাখ প্রশিক্ষিত বেকার যুবককে স্টার্টআপ ঋণ হিসেবে 'বঙ্গবন্ধু যুব ঋণ' নামে একটি নতুন কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। এ কর্মসূচির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো- মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ, ন্যায়নিষ্ঠ, আধুনিক জীবনবোধসম্পন্ন ও আত্মমর্যাদাশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং যুবকদের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা বিকাশের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে মাদক ও বিপথগামী হতে যুবকদের রক্ষা করে উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করা।

এ কর্মসূচির আওতায় জামানতবিহীন নূ্যনতম ২০ হাজার টাকা হতে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হচ্ছে। এ ঋণের সুদের হার ৯% (সরল সুদ)। ২ লাখ প্রশিক্ষিত যুবকের মাঝে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ও সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (এসডিএফ) সাথে ইতোমধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। যোগাযোগ করা হয়েছে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা)সহ অন্যান্য প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে। ইতোমধ্যে তৈরি করা হয়েছে ৭.৪৪ লক্ষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবকের ডাটাবেজ। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের ডাটা প্রতিনিয়ত হালনাগাদ করার কাজ করছেন কর্মসংস্থান ব্যাংকের উদ্যোমী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। মাঠ পর্যায়ে বেকার যুবকদের মাঝে এ ঋণ গ্রহণ করে স্বাবলম্বী হওয়ার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতোমধ্যে এ কর্মসূচির আওতায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৪৫৮৯ জনের মাঝে ৬৪.০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। নভেল করোনা (কোভিড-১৯) পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বেকার যুবকরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকের ১৪৮টি শাখার মধ্যে নিকটস্থ শাখা হতে ঋণ সহায়তা গ্রহণ করে যাতে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে সে বিষয়ে পরামর্শসহ ঋণ প্রদান সহজীকরণ করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সরাসরি এ কর্মসূচি মনিটরিং ও দিক নির্দেশনা প্রদান করছে।

মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের দেশের প্রায় ৪.৫০ মিলিয়ন রেমিট্যান্স যোদ্ধা কাজ করছে। কোভিড-১৯ এর বিরূপ প্রভাবে সৌদি আরব, ইউএই এবং ওমান হতে বাংলাদেশি শ্রমিকরা দেশে ফেরত আসতে শুরু করেছে। অধিকন্তু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ২০২৫ সালের মধ্যে ৭০ শতাংশ বিদেশি শ্রমিক হ্রাসের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় আরও শ্রমিক ফেরত আসার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। ফলে বেকারত্বের হার আরও বৃদ্ধি পাবে। বেকারত্ব হ্রাসের লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে আফ্রিকার দেশসহ নতুন নতুন শ্রমবাজার খোঁজার পাশাপাশি দেশেও তাদের দক্ষতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করছে। কোভিড-১৯ এর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় কর্মসংস্থান ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ, পলস্নী সঞ্চয় ব্যাংক এবং পিকেএসএফের অনুকূলে আমানত বা তহবিল হিসেবে ৫০০ কোটি টাকা করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় কর্মসংস্থান ব্যাংকের অনুকূলে আমানত/তহবিল হিসেবে ঘোষিত ৫০০ কোটি টাকা দেশের বেকার যুবকদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এবং ব্যাংকের তহবিল ঘাটতি পূরণে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবার্ষিকীকে স্মরণীয় করে রাখতে মুজিববর্ষে কর্মসংস্থান ব্যাংক কর্তৃক গৃহীত 'বঙ্গবন্ধু যুব ঋণ' হতে পারে বেকার যুব অর্থনৈতিক মুক্তির দিশারি। এজন্য সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা বিশেষ করে তহবিলের যোগান অপরিহার্য।

লেখক- মো. আব্দুল মান্নান

উপব্যবস্থাপনা পরিচালক

কর্মসংস্থান ব্যাংক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে