আয়না-গয়না প্রকল্প বাস্তবায়ন করেই জনপ্রশাসন পদক পেলেন গাজীপুরের ডিসি-ইউএনও সহ ৫জন

আয়না-গয়না প্রকল্প বাস্তবায়ন করেই  জনপ্রশাসন  পদক পেলেন গাজীপুরের ডিসি-ইউএনও সহ ৫জন

গাজীপুরে দায়িত্বপালনকালে জনসেবা প্রদানে উল্লেখযোগ্য ও প্রশংসনীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ (দলগত) ক্যাটাগরিতে গাজীপুরে পাঁচ কর্মকর্তা জনপ্রশাসন পদক-২০২০ পেয়েছেন।

পদক প্রাপ্তরা হলেন, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এসএম তরিকুল ইসলাম, গাজীপুর পরিবার পরিকল্পনা উপ-পরিচালক লাজু শামসাদ হক, কাপাসিয়ার ইউএনও মোসা. ইসমত আরা, কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আব্দুস সালাম ও কাপাসিয়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুর রহিম।

মঙ্গলবার সকালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের সভাপতিত্বে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলণায়তনে অনুষ্ঠিত এ পদক বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চূয়ালী যোগ দেন । অনুষ্ঠানে প্রধান মন্ত্রীর পক্ষে পদক তুলে দেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এসএম তরিকুল ইসলাম বলেন, মাতৃমৃত্যু শূন্য কোটায় এনে সারাদেশে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলা। গত তিন বছরে মাতৃমৃত্যু শূন্যে নেমে এসেছে কাপাসিয়ায়। মাতৃমৃত্যু কমাতে কাপাসিয়া মডেল বাস্তবায়নে গর্ভবতী মায়েদের ঝুঁকি, বয়সসহ ২৭ ধরনের তথ্য নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে তথ্যভাণ্ডার (ডেটাবেইস সফটওয়্যার), যা ‘গর্ভবতীর আয়না’ নামে পরিচিত। এর পাশাপাশি আছে ‘গর্ভবতীর গয়না’ নামের একটি স্বাস্থ্য নির্দেশিকা। ‘গর্ভবতীর আয়না’ ও ‘গর্ভবতীর গয়না’র সমন্বয়ে চলছে মাতৃমৃত্যুমুক্ত এই কার্যক্রম।দরিদ্র গর্ভবতীর চিকিৎসা সহায়তার জন্য “মানবিক সহায়তা তহবিল” নামে একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় ঔষধসহ স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে প্রতি ছয় মাস অন্তর ইউনিয়ন ভিত্তিক ‘গর্ভবতী মা সমাবেশ’ অয়োজন করা হয়।

মাতৃমৃত্যু কমাতে কাপাসিয়া মডেলকে আদর্শ ধরে ১০০টি উপজেলায় তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশ্বমঞ্চেও গুরুত্ব পাচ্ছে এই মডেল। জনসংখ্যা ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে সর্বোত্তম অনুশীলন (বেস্ট প্র্যাকটিস) হিসেবে এই মডেল জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) মাধ্যমে বিশ্বের ২৭টি দেশে প্রদর্শনের জন্য নির্বাচিত হয়েছে।

কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আব্দুস সালাম বলেন, মাতৃমৃত্যুমুক্ত কাপাসিয়া গড়ার কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর থেকে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর মাধ্যমে এই কার্যক্রম চালানো হয়। এই কার্যক্রম শুরুর আগের বছর ২০১৭ সালে কাপাসিয়ায় ৮ জন গর্ভবতী মায়ের মৃত্যু হয়েছিল। ওই বছর গর্ভবতী মা ছিলেন ৬ হাজার ৭০০। কর্মসূচি চালুর বছর ২০১৮ সালে মাতৃমৃত্যু নেমে আসে ৪ জনে। ওই বছর গর্ভবতী ছিলেন ৬ হাজার ৩০০ জন। ২০১৯ সালে একজন গর্ভবতী মা মারা যান। সে বছর গর্ভবতী মা ছিলেন ৬ হাজার ৩৫০ জন। আর ২০২০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কোন গর্ভবতী মায়ের মৃত্যু হয়নি। গত বছর গর্ভবতী ছিলেন সাড়ে ৬ হাজার।

কাপাসিয়া ইউএনও মোসা. ইসমত আরা জানান, ২০১৭ সাল থেকে কাপাসিয়ার গর্ভবতীদের ৩৭টি তথ্যসংবলিত পরিচয় নম্বরসহ ৪৪ পৃষ্ঠার মা ও শিশু স্বাস্থ্যসহায়িকা বই দেওয়া হয়। এতে গর্ভবতী মায়ের নাম ও উচ্চতা, স্বামীর নাম ও পেশা, রক্তের গ্রুপ, বাল্যবিয়ে ছিল কি না বিস্তারিত তথ্য ও গর্ভবতীর রক্তের গ্রুপ অনুযায়ী সম্ভাব্য তিনজন রক্তদাতার মোবাইল ফোন নম্বরসহ পরিচয় লেখা থাকে এবং গর্ভবতীর বাচ্চা প্রসবের আগে থেকে রক্তদাতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয়। গর্ভধারণের সময় থেকে শুরু করে সন্তান প্রসবের ৪২ দিন পর্যন্ত অন্য কোন দুর্ঘটনা ছাড়া কোনো নারীর মৃত্যুকে মাতৃমৃত্যু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।

উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে গত মার্চ-এপ্রিল মাসে কাপাসিয়ায় ৭১৯ জন গর্ভবতী সন্তান প্রসব করেছেন। এর মধ্যে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে সন্তান প্রসব করেছেন ৫৩৯ জন, সিজার হয়েছে ১৮০ জনের। কোনো গর্ভবতী মা-ই প্রাণ হারাননি। বেশির ভাগের অর্থাৎ ২৭১ জন গর্ভবতীর প্রসব হয়েছে নিজ বাড়িতে। আর সরকারি হাসপাতালে ১০০ ও বেসরকারি হাসপাতালে ২৪৮ জনের প্রসব হয়েছে।

কাপাসিয়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুর রহিম বলেন, কাপাসিয়ায় এমপি নিজে উপস্থিত থেকে প্রতি তিন মাসে ইউনিয়নভিত্তিক মা সমাবেশ করে গর্ভবতীদের চিকিৎসা ও অন্যান্য বিষয়ে খোঁজ নেন।

মাননীয় সংসদ সদস্য ‘সিমিন হোসেন রিমি'র উদ্ভাবনী উদ্যোগ, প্রযুক্তি ব্যবহারের নির্দেশনা, রাজনৈতিক-প্রশাসনিক সমন্বয়, আন্তরিকভাবে সময় দেওয়া এবং নিবিড় যোগাযোগের কারণেই মাতৃমৃত্যু শূন্যের কোটায় আনা সম্ভব হয়েছে।’

সিমিন হোসেন বলেন, ‘সংসদ সদস্য হওয়ার আগে যখন থেকেই এলাকায় যেতাম গর্ভবতী মা ও শিশু যখন মারা যেত তখন এ বিষয়টি আমাকে খুবই পীড়া দিতো। তখন থেকেই তাদের মৃত্যু ঝুকি কমাতে নানা স্বপ্ন বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিয়েছি। জেলা প্রশাসক, ইউএনওসহ অন্যদের আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া এ সফলতা সম্ভব হতো না।’ তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যবীমা চালু করতে পারলে মানুষ সহজেই সুস্থ থাকবে। আর মানুষ সুস্থ থাকলে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গঠণ, জ্ঞানভিত্তিক জাতি গঠন এবং মানুষকে আইন মানানো সম্ভব।

কাপাসিয়া উপজেলা মাতৃমৃত্যু শূণ্য রাখার নানা উদ্যোগের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে সিমিন হোসেন রিমি বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতিতেও উপজেলার মাঠপর্যায়ে থাকা অন্তত ১৮০ জন স্বাস্থ্যকর্মীকে করপোরেট মোবাইল সিম ও টকটাইম রিচার্জ করে দেয়া হচ্ছে। তাঁরা মোবাইল ফোনে প্রত্যেক গর্ভবতীকে স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ দিচ্ছেন। যাঁদের বেশি জটিলতা আছে সে ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি যাচ্ছেন। এ কারণে দুর্যোগের সময়েও কাপাসিয়ায় মাতৃমৃত্যু হার শূন্য আছে।’

এক্ষেত্রে ‘গর্ভবতীর স্বামীর আর্থিক অবস্থাটাও জানা খুব দরকার হয়। স্বামী দিনমজুর এবং অশিক্ষিত হলে ওই গর্ভবতীর বিষয়ে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া গর্ভবতীর উচ্চতা একদম কম থাকলে তার স্বাভাবিক ডেলিভারির সম্ভাবনা খুবই কম। যাঁদের রক্তের গ্রুপ ‘ও’ নেগেটিভ তাঁদের বাড়তি যত্ন নিতে হয়। এসব কারণেই গর্ভবতীর তথ্যগুলো কাজে দেয়।’

যাযাদি/এস

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে