logo
মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  সালাম সালেহ উদদীন   ২০ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

দুর্ঘটনা ও স্বাভাবিক মৃতু্যর নিশ্চয়তা

৭০ ভাগ গ্যাস পাইপলাইন ঝুঁকিপূর্ণ। ৫০ বছরের পুরনো পাইপ লাইনও রয়েছে রাজধানী ঢাকায়। সিএনজিচালিত পরিবহণের অনেক সিলিন্ডার মেয়াদোত্তীর্ণ। এগুলো চেক না করার কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো মনোযোগ নেই। কেবল কি গ্যাস দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে মানুষ। বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনের পরও সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসেনি। বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ কার্যকর করা হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে পরিবহণ সংশ্লিষ্টদের মাঝে, তারা ধর্মঘট ডেকেছে।

মৃতু্য যেন কোনোভাবেই পিছু ছাড়ছে না। নানাভাবে মানুষের অকাল মৃতু্য হচ্ছে। এই অকাল মৃতু্য রোধ করা যাচ্ছে না। মানুষ পথে, রাজপথে, বন্যায়, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে, ঘূর্ণিঝড়ে, নৌ-রেলপথে, সড়ক দুর্ঘটনায়, গ্যাস বিস্ফোরণে মারা যাচ্ছে। এর থেকে রেহাই পাচ্ছে না আমাদের কোমলমতি শিশুরাও। বাংলাদেশে এখন আর স্বাভাবিক মৃতু্যর নিশ্চয়তা নেই। যাদের এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা যাদের তারা রয়েছে উদাসীন। এক মৃতু্যর রেশ না কাটতেই আরেক মৃতু্য এসে হাজির হয়। আমরা শোকগ্রস্ত ও হতাশ হই। এটাই বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতা। সম্প্রতি কয়েকটি দুর্ঘটনায় বেশ কিছু মানুষের অকাল মৃতু্য হয়েছে। চট্টগ্রামের পাথরঘাটা এলাকায় গ্যাসের পাইপলাইন বিস্ফোরণে দেয়াল ধসে ৭ জন নিহত এবং ১০ জন দগ্ধ হয়েছেন। রোববার সকালে নগরীর পাথরঘাটা এলাকার ব্রিক ফিল্ড রোডের ধনা বড়ুয়ার পাঁচতলা ভবনের নিচতলায় ওই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এর আগে রান্নার চুলার গ্যাস বিস্ফোরণ, সিলিন্ডার বিস্ফোরণে হতাহতের বেশ কয়েকটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীর রূপনগরে ৭ শিশুর মৃতু্য হয়েছে। বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগে বা গ্যাসের চুলার ব্যবহারে অসাবধানতা ও অসচেতনতা, গ্যাসের সিলিন্ডার পরীক্ষা না করা এবং সরবরাহকৃত গ্যাসলাইনের ত্রম্নটির কারণে বিপদ এবং মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে আনতে পারে তার দৃষ্টান্ত এসব দুর্ঘটনা। এক প্রতিবেদনে প্রকাশ,

৭০ ভাগ গ্যাস পাইপলাইন ঝুঁকিপূর্ণ। ৫০ বছরের পুরনো পাইপ লাইনও রয়েছে রাজধানী ঢাকায়। সিএনজিচালিত পরিবহণের অনেক সিলিন্ডার মেয়াদোত্তীর্ণ। এগুলো চেক না করার কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো মনোযোগ নেই। কেবল কি গ্যাস দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে মানুষ। বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনের পরও সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসেনি। বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ কার্যকর করা হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে পরিবহণ সংশ্লিষ্টদের মাঝে, তারা ধর্মঘট ডেকেছে।

\হউলেস্নখ্য, ২০১৮ সালে বিমানবন্দর সড়কে বাস চাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়। ওই সময়ে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়নের দাবিতে সারা দেশে আন্দোলন করে। অবশেষে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ আইন জাতীয় সংসদে পাস হয়। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এই আইনটি খুবই সুচিন্তিত, সময়োপযোগী ও বাস্তবভিত্তিক। নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের পর দেশের বিভিন্ন জেলায় বাস চলাচল বন্ধের পর এবার সারাদেশে ট্রাক ধর্মঘটের ডাক এসেছে। বাংলাদেশ ট্রাক-কভার্ডভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন আইন স্থগিত রাখাসহ নয় দফা দাবিতে বুধবার থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ডেকেছেন। শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে নতুন সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়নের শুরু থেকে তার বিরোধিতা করে আসছিলেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। এবার দেখা যাক কী হয়। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসে কিনা। এখানেই শেষ নয়- বিদেশে লোভনীয় চাকরিপ্রাপ্তি ও উন্নত জীবনযাপনের আশায় দালালদের খপ্পরে পড়ে অনেকেরই জীবন চলে যায়। এর আগে দেশি-বিদেশি দালালচক্র গভীর সমুদ্রে ছোট্ট নৌকায় অনেক মানুষকে তুলে দিয়েছিল এমন ঘটনাও ঘটেছে। যেখানে নৌকাটি গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে কিনা, যাত্রীরা বেঁচে থাকবে কিনা, সে সব নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথাই ছিল না। এসব দালালচক্রের একমাত্র লক্ষ্য হলো- অর্থ উপার্জন। বিভিন্ন সময়েই সমুদ্রে নৌকা ডুবে বাংলাদেশি অভিবাসীদের মৃতু্যর ঘটনা ঘটেছে। কয়েক বছর আগে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথে অনেক বাংলাদেশি সাগরে ডুবে মারা গেছেন। আর শুধু সমুদ্রপথ নয়, দুর্গম মরুপথে, তুষারপথে ও বনজঙ্গল পার হতে গিয়েও অনেকে মারা গেছেন। এ ছাড়া নৌ ও ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রায়ই মানুষ মারা যাচ্ছে। কদিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় দুই ট্রেনের সংঘর্ষের ঘটনায় ১৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগেও মানুষ মারা যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় হুমকিতে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হলো জাপান, চীন, বাংলাদেশ ও ভারত। জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা না গেলে নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরও বেড়ে যাবে, বেড়ে যাবে মৃতু্যর হারও। এ ব্যাপারে আমাদের সচেতন ও সতর্ক হতে হবে। বাংলাদেশের অবস্থান এমন এক এলাকায় যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিত্য-ঘটনা। গত ৫০ বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগে কয়েক লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এ দেশে। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস কেড়ে নিয়েছিল কয়েক লাখ মানুষের প্রাণ। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তান্ডবে ২৬ জন মানুষ মারা গেছে, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যার ক্ষত এখনো শুকায়নি।

মানুষকে বলা হয় সৃষ্টির সেরাজীব, আশরাফুল মাখলুকাত। বর্তমান সমাজের মানুষ মানবিকতা হারিয়ে যেভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, মানুষের কারণে যেভাবে মানুষের মৃতু্য হচ্ছে, তাতে তাদের কী অভিধায় চিহ্নিত করা যেতে পারে। এ কোন সমাজে আমরা বসবাস করছি? এমন অপরাধপ্রবণ, অসহিষ্ণু ও অবক্ষয়গ্রস্ত উদাসীন ও কর্তব্যে অবহেলার সমাজ কি আমরা চেয়েছিলাম। আসলে আমরা আজ যে সমাজে বাস করছি সে সমাজ আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। আমরা নানারকম সামাজিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেও বারবার ব্যর্থ হচ্ছি। পা পিছলে ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছি। সমাজের একজন সুস্থ এবং বিবেকবান মানুষ হিসেবে এমন পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কি সামাজিক ক্ষেত্রে, কি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে- সর্বক্ষেত্রেই অবক্ষয় ও নিরাপত্তাহীনতা দেখতে পাচ্ছি, যা একজন শান্তিকামী মানুষ হিসেবে আমরা স্বাধীন ও একটি গণতান্ত্রিক দেশে কল্পনা করতে পারছি না। এ অবক্ষয় ইদানীং আরও প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। সামাজিক মূল্যবোধ তথা ধৈর্য, উদারতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ন্যায়পরায়ণতা, শৃঙ্খলা, শিষ্টাচার সৌজন্যবোধ, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায়, নান্দনিক সৃষ্টিশীলতা, দেশপ্রেম, কল্যাণবোধ, পারস্পপরিক মমতাবোধ ইত্যাদি নৈতিক গুণাবলি লোপ পাওয়ার কারণেই সামাজিক অবক্ষয় দেখা দেয়। যা বর্তমান সমাজে প্রকট। সামাজিক নিরাপত্তা আজ ভূলুণ্ঠিত। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, দেশের সামগ্রিক যে অবক্ষয়ের চিত্র নিরাপত্তাহীনতার চিত্র এর থেকে পরিত্রাণের কোনো পথই কি আমাদের খোলা নেই? আমাদের অতীত বিস্মৃতির অতল গহ্বরে নিমজ্জিত, বর্তমান অনিশ্চিত এবং নিরাপত্তাহীনতার দোলাচলে দুলছে এবং ভবিষ্যৎ মনে হচ্ছে যেন পুরোপুরি অন্ধকার। যারা সমাজকে, রাষ্ট্রকে পদে পদে কলুষিত করছে, সমাজকে ভারসাম্যহীন ও দূষিত করে তুলছে, সমাজের মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার ক্ষুণ্ন করছে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে এই নিরাপত্তাহীনতা ও অধঃপতনের জন্য দায়ী কে? দায়ী সমাজের একশ্রেণির মানুষ। কোনোভাবেই আমাদের সমাজ যেন আলোর দিকে অগ্রসর হতে পারছে না। একের পর এক অঘটন লেগেই আছে। নিরাপত্তাহীনতা আমাদের দিন দিন গ্রাস করছে। এর জন্য মানুষের খেয়ালিপনা উদাসীনতা কম দায়ী নয়। বাঙালি জাতির অতীত গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে। সে ঐতিহ্য সাহস ও সংগ্রামের। সে ঐতিহ্য মানবিক চেতনাবোধের। নানা বৈরী পরিবেশ ও প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও জাতি হিসেবে বাঙালি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। অদম্য সাহসী এ দেশের মানুষ। তাদের প্রতিরোধ বা প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন। অতীতে তারা নানা সংগ্রামের মধ্যদিয়ে প্রমাণ করেছে। প্রতিনিয়ত তারা ঝড়-ঝঞ্ঝা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও টিকে আছে। নানা ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যেও বাঙালির মনোবল কখনো দুর্বল হয়নি, হয়নি হীনবল। দৃঢ়চেতা ও মনোবলসম্পন্ন বাঙালি জাতি সবসময় এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। কখনো বন্যা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, টর্নেডো, সাইক্লোন, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলা করেছে, কখনো বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। বাঙালি জাতি বারবার প্রমাণ করেছে তারা অদম্য। এর প্রমাণ তাদের রাখতে হবে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে, সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, এর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।

সালাম সালেহ উদদীন: কবি, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে