logo
রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২২ চৈত্র ১৪২৫

  শাকিলা নাছরিন পাপিয়া   ১৮ মার্চ ২০২০, ০০:০০  

প্রতিবাদের নতুন পথ

শিক্ষা ক্ষেত্রে সততা, সম্মান ফিরে না এলে দেশের কোনো স্তরই শুদ্ধ হবে না। শিক্ষাকে শুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজন শুদ্ধ শিক্ষক। রাষ্ট্রকে শুদ্ধ শিক্ষক সৃষ্টি করতে হলে বাঁকা পথে, অন্যায় পথে বেঁচে থাকার জন্য, টিকে থাকার জন্য শিক্ষকদের ঠেলে দিলে এই অবস্থা থেকে উত্তোলন ঘটবে না।

কথায় বলে, প্রয়োজন মানুষকে পথ দেখায়। সৃজনশীল মানুষ নতুন পথ খোঁজে। আর খারাপ মানুষ বাঁকা পথ খোঁজে। কিছু শব্দ সর্বকালে, সর্বযুগে সম্মানের সঙ্গে লালন করা হয় মানব সভ্যতার কারণেই। মা, বাবা এবং শিক্ষক এই তিনটি শব্দ, তিনটি সম্পর্ক মানব জাতির মানবিকতা লালনের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো কারণে এই সম্পর্কগুলো তার বৈশিষ্ট্য হারায় তাহলে মানব সভ্যতা এবং বিকাশের জন্য তা হুমকি।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই পাল্টে গেছে। পরিবর্তন এসেছে চিন্তা-ভাবনায়। মানুষের নীতি-নৈতিকতায় ধস নেমেছে অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গেই যে ব্যাংক ছিল টাকা রাখার নিরাপদ স্থান তা এখন ভদ্রভাবে টাকা ডাকাতির স্থানে পরিণত হচ্ছে দিন দিন।

শিক্ষক শব্দের প্রতিশব্দ গুরু। গুরু শব্দটি আমাদের সংস্কৃতিতে সম্মানের, শ্রদ্ধার অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হাজারটা পরিবর্তনের মধ্যেও মানুষ শিক্ষকদের ব্যাপারে মনে করে, শিক্ষক হবেন সৎ কিন্তু দরিদ্র। লোভ, উন্নত জীবনমান, নিজের পরিবারের সুন্দর ভবিষ্যতের চিন্তা এসব শিক্ষকের থাকবে না। শিক্ষকের দায়িত্ব দেশময় জ্ঞানের আলো প্রজ্বলিত করা কিন্তু তার সন্তান থাকবে অশিক্ষিত। বংশানুক্রমিকভাবে শিক্ষক নুয়ে পড়া শির, দুর্বল দেহ, সাত চড়ে চুপ করে থাকা মানসিকতা নিয়ে চলবে এটাই চায় এ সমাজ। ফলে, শিক্ষকের চাওয়া, শিক্ষকের স্বপ্ন, শিক্ষকের অধিকার ভুলুণ্ঠিত হয়।

এই তো কিছুদিন আগে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী একটি টক-শোতে বলেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বেতন পান ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। এই বেতন যে একজন শিক্ষক শেষজীবনে পান তা তিনি জানতেন না। অথচ তার অবচেতন মন ঠিকই জানতেন একজন শিক্ষক শুরুতে এ বেতন না পেলে তার জন্য অসম্মানের।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নানাভাবে নানাদিক দিয়ে নির্যাতনের এবং বৈষম্যের শিকার। শুধু বেতন বৈষম্যই নয়- নিয়মের হাজারটা বেড়াজালে তাদের বাঁধতে গিয়ে নির্যাতনই করা হয়েছে ক্রমাগত।

বদলে গেছে সময়, বদলে গেছে সমাজ। পরিবর্তন এসেছে জীবনমানে কিন্তু শিক্ষকদের জন্য পরিবর্তন আসেনি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। বরং শিক্ষকদের অর্থনৈতিক দীনতা থাকলেও সম্মানের যে জায়গাটা ছিল তা বদলে গেছে। শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে মানুষ এখন শিক্ষকদের ওপর বিরক্ত। হাজারটা অভিযোগের তীর এখন শিক্ষকের পানে।

অনেক কিছু বদলে গেলেও মানুষ শিক্ষকদের ব্যাপারে রয়ে গেছে এখনো সনাতন চিন্তাধারায়। মানুষের মস্তিষ্কে রয়ে গেছে শিক্ষকের সেই চিত্র- শিক্ষক হবেন সৎ, আদর্শবান কিন্তু চরম দরিদ্রতা তাকে ঘিরে থাকবে। উন্নত জীবনমান তার জন্য নয়। বিলাসিতা, প্রাচুর্য শিক্ষক শব্দের সঙ্গে বেমানান।

শিক্ষক জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করবেন পুরো সমাজ। ঘরে ঘরে প্রত্যেকের সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব শিক্ষকের কিন্তু শিক্ষকের নিজের সন্তান থাকবে অন্ধকারে।

এ দেশের মানুষের মাথায় পন্ডিত মশাইয়ের মতো শিক্ষক যার গোটা পরিবারের জন্য বরাদ্দ লাট সাহেবের তিন ঠ্যাংওয়ালা কুকুরের এক পালের সমান খরচ। তালেব মাস্টারের মতো শিক্ষক যার ছাত্ররা ব্যারিস্টার হয় কিন্তু নিজের পুত্র বিনা চিকিৎসায় মরে। ইয়াদ আলী মাস্টারের মতো শিক্ষক যার স্ত্রীর ছেঁড়া কাপড়ে থাকে তালি দেয়া। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানসহ মৌলিক চাহিদা নিয়ে নির্ভাবনায় থাকার মতো উন্নত জীবনমানের শিক্ষক এ সমাজ পছন্দ করে না। তাই তো শেষজীবনে চিকিৎসার জন্য একজন শিক্ষক যখন সাহায্যের জন্য স্কুলে স্কুলে হাত পাতেন তখন এ সমাজ, এ রাষ্ট্র লজ্জিত হয় না, অপমানিত হয় না।

বদলে যাওয়া সময়ের সঙ্গে চলতে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য ধীরে ধীরে আত্মমর্যাদাবোধ বিসর্জন দিতে হলো শিক্ষককে। সাহসী, সত্যবাদী অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হলো শিক্ষক। নিত্য-নতুন পথ আবিষ্কারের মধ্যে শিক্ষক তার গুরু নামক শাব্দিক অর্থ থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে এলো। নষ্ট ক্ষমতাধারিরা তাদের ক্ষমতা দখলের খেলায় টিকে থাকার কৌশলে শিক্ষকদের যখন থেকে ব্যবহার করতে শুরু করল তখন থেকেই শিক্ষকনামক শব্দটি সমাজের কাছে বিরক্তিকর এক শব্দে পরিণত হওয়া শুরু করল।

যারা আদর্শকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইল। যারা নিজেকে শিক্ষক ভেবে, শিক্ষক শব্দের আদর্শকে সঙ্গে নিয়ে বাঁচতে চাইলেন তারা বহুকালের নির্যাতনের অবসান চাইলেন। উন্নত দেশের সম্মান আর উন্নত জীবনমানের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে গিয়ে শাসকশ্রেণিকে বোঝাতে চাইলেন শিক্ষক মানে কী?

শিক্ষায় বিপস্নব ঘটাতে চাই আমরা অথচ শিক্ষার জন্য যে শিক্ষকের প্রয়োজন তার ব্যাপারে সনাতন চিন্তা থেকে বের হতে পারছে না রাষ্ট্র।

শিক্ষকদের বেতনস্কেল, সরকারি কর্মচারী হিসেবে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধার বঞ্চনা, নানা ধরনের হয়রানি বন্ধের জন্য অনেক দিন ধরে আন্দোলন করছিলেন প্রাথমিকের শিক্ষকরা। সর্বশেষ আন্দোলনে দাবি আদায় না হলেও পুলিশের বুটের লাথি জুটেছিল শিক্ষকদের ললাটে। এ নিয়ে শিক্ষক সমাজে হৈ চৈ হলেও রাষ্ট্র ছিল নীরব। লজ্জিত হওয়া তো দূরের কথা বরং এ আন্দোলন পুরোই উপেক্ষা করে এ ব্যাপারে কোনো কথাই আসেনি উচ্চপর্যায় থেকে। শিক্ষক নেতারা আট থেকে দশ ভাগে বিভক্ত হওয়ায় এ আন্দোলন কোনো পরিণতি পায়নি।

শিক্ষকসমাজ যখন চরম হতাশায় নিমজ্জিত তখন আচমকা কুড়িগ্রাম জেলার রাজার হাট উপজেলার আবুল কাশেম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মনিবুল হক বসুনিয়া প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দকৃত টিফিন ভাতাকে অসম্মান, অপমানজনক আখ্যায়িত করে ব্যক্তিগত ইচ্ছা উলেস্নখ করে টিফিনভাতা প্রত্যাহার করে আবেদনপত্র জমা দেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর। সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং অনলাইন পত্রিকায় মনিবুল হক বসুনিয়ার এ আবেদন পত্রটি ছড়িয়ে পড়ে। উলেস্নখ্য যেখানে বিমা, ব্যাংকে দুপুরের লাঞ্চের জন্য প্রতিদিন বরাদ্দ ২০০/- টাকা, সেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য এক মাসের জন্য বরাদ্দ টিফিন ভাতা ২০০/- টাকা। যা গড়ে প্রতিদিন ৬.৬৬ টাকা।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. ফফি উলস্নাহ বলেন, সরকারকে প্রতিদিন সাড়ে তিন লাখের বেশি শিক্ষককে টিফিনভাতা দিতে হয়। সাড়ে ছয় টাকা অবশ্যই খুবই কম। তবে এটি বাড়াতে গেলে বড় বাজেট লাগবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষ মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আলোচনা করা হবে।

মনিবুল হক বসুনিয়ার এই ব্যতিক্রমী আবেদন পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে ফলাফল কী দাঁড়াবে শেষ পর্যন্ত তা বোঝা না গেলেও এটা প্রচলিত ধ্যান-ধারণা এবং ক্রমাগত শিক্ষকদের অসম্মানের বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের ধাক্কা। হাজার হাজার শিক্ষকের সমাবেশ, পুলিশের পদাঘাত, উর্ধ্বতনের উপেক্ষায় উপহাসে পরিণত হয়েছে। সেখানে এই আবেদন পত্রটি এবং এর বাণী ঊর্ধ্বতনের কানে শিক্ষকদের অসম্মানের কথা তো জানাতে পেরেছে? এটাই বড় পাওনা।

রাজধানীর আশপাশের এলাকায় ১০টি সরকারি স্কুল নির্মাণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পে একটি নারকেল গাছের দাম ধরা হয়েছে ৬১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। একটি কলা গাছের দাম ছয় লাখ টাকা। একটি টিনের ছাপড়া ঘর ৩ কোটি টাকা। পুকুর নয় এটা সমুদ্র চুরি বললেও কম বলা হবে। দেশটা লুটেপুটে খাবার মহোৎসব চলছে নানা প্রকল্পে। অথচ শিক্ষকদের জন্য টিফিন ভাতা বরাদ্দ প্রতিদিন সাড়ে ৬ টাকা দিয়ে, ড্রাইভারের চেয়ে নিচের স্কেলে বেতন দিয়ে সততা আর দায়িত্ব আশা করা হয়। শিক্ষকদের টিকে থাকার সংগ্রামে নিত্য-নতুন বাঁকা পথ খুঁজতে কারা বাধ্য করছে জাতি কি এটা নিয়ে ভাববে? দুর্নীতি আর অপকর্ম প্রতিটি স্তরে স্তরে। প্রতিদিনই নানা অনিয়মের খবর আমাদের বিস্মিত করে। দশকের পর দশক ধরে অনিয়ম চলে। টাকার পাহাড় গড়ে ওঠে দুর্নীতিবাজদের গৃহে অথচ রাষ্ট্র জানে না।

শিক্ষা ক্ষেত্রে সততা, সম্মান ফিরে না এলে দেশের কোনো স্তরই শুদ্ধ হবে না। শিক্ষাকে শুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজন শুদ্ধ শিক্ষক। রাষ্ট্রকে শুদ্ধ শিক্ষক সৃষ্টি করতে হলে বাঁকা পথে, অন্যায় পথে বেঁচে থাকার জন্য, টিকে থাকার জন্য শিক্ষকদের ঠেলে দিলে এই অবস্থা থেকে উত্তোলন ঘটবে না।

আন্দোলন শব্দের সঙ্গে জ্বালাও, পোড়াও, সেস্নাগান, মিছিল, ভাঙ্গচুর, জড়িত। আন্দোলন শব্দটি মনিবুল হক বসুনিয়ার অসম্মানের টিফিনভাতা প্রত্যাহার চেয়ে যে আবেদনপত্র তা নতুন এক পথ নির্দেশনা দিল। আশা করি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, নীতি-নির্ধারকরা দয়া নয়, শিক্ষাগুরুর প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে দেশের গোটা শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম দূরীকরণের স্বার্থে শিক্ষকদের সম্মানজনক জীবনযাপনের কথা ভাববেন।

শাকিলা নাছরিন পাপিয়া: কবি, কথাসাহিত্যিক, শিক্ষক ও কলাম লেখক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে