শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০২৪, ৩ শ্রাবণ ১৪৩১

বছরে তিন হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি ঢাকার ফুটপাতে 

যাযাদি ডেস্ক
  ১৩ জুন ২০২৪, ২৩:৩৯
আপডেট  : ১৩ জুন ২০২৪, ২৩:৪৬
ছবি- ডয়চে ভেলে

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় যানজটের প্রধান কারণ হচ্ছে ফুটপাত দখল। এখন তো এমন অবস্থা হয়েছে রাজধানীর বিভিন্নস্থানে ফুটপাত দখলের পর প্রধান প্রধান সড়কের একাংশ দখলে নিয়েছে হকাররা। রাজধানী ঢাকার ফুটপাতের চাঁদাবাজি নিয়ে ডয়চে ভেলের এই প্রতিবেদনটি বিস্তারিত যায়যায়দিনের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের দাবি, ঢাকার ফুটপাতে হকারদের কাছ থেকে বছরে তিন হাজার কোটি টাকার চাঁদা তোলা হয়৷ সেই হিসাবে প্রতিদিন আট কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় হয়৷

ঢাকার ফুটপাত থেকে সংগ্রহ করা বিপুল চাঁদা পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও লাইনম্যানরা নেয় বলে ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি আবুল কাসেম৷ তবে পুলিশ ও সিটি কর্পোরেশন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে৷ নির্দিষ্ট কারো বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছে তারা৷

ফুটপাতের ‘ইজারা'

হকার্স ফেডারেশনের হিসাবে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে হকারের সংখ্যা দুই লাখ৷ উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ৭০ হাজার৷ দুই সিটিতে সব মিলিয়ে দুই লাখ ৭০ হাজার হকার রয়েছে৷ ঈদের সময় এই সংখ্যা আরো বেড়ে তিন লাখ ২০ হাজারের মতো হয়৷ গড়ে প্রতিদিন হকার প্রতি ৩০০ টাকা চাঁদা নেয়া হলে বছরে তিন হাজার কোটি টাকার চাঁদা আদায় হয়৷

ঢাকার কয়েকজন হকারের সাথে কথা বলে জানা গেছে অনানুষ্ঠানিকভাবে ফুটপাত ইজারার ব্যবস্থা আছে৷ আর সেটি দেয়া হয় রাস্তা ধরে, ফুট হিসাব করে৷ চৌকি, ভ্যান গাড়ি বা ভ্রাম্যমাণ হকারদের জন্যেও আলাদা হিসাব আছে৷ পুলিশ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা এর নিয়ন্ত্রণ করে বলে অভিযোগ হকারদের৷ এই ব্যবসার ব্যবস্থাপনায় আছে লাইনম্যান৷

ঢাকার গুলিস্তান, নিউ মার্কেট, বায়তুল মোকাররম, পল্টন, মতিঝিল, দৈনিক বাংলা মোড়, গোলাপশাহ মাজার, জিরো পয়েন্ট, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এবং ফুলবাড়িয়া এলাকার ফুটপাতে সবচেয়ে বেশি দোকান আছে৷ ফলে এই এলাকাগুলোকে কেন্দ্র করেই সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজি হয়৷ কিন্তু ঢাকার এমন কোনো অলিগলি নাই যেখানে ফুটপাতকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ গ্রুপ নাই৷ ঢাকার কোনো গলিতে একটি ছোট সবজি দোকান বসাতেই দিনে দুইশ' থেকে তিনশ' টাকা চাঁদা দিতে হয়৷ আর এই চাঁদা পুলিশ ও লাইনম্যানেরা নিয়ে থাকেন বলে জানান হকাররা৷

হকারপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০০ টাকা চাঁদা

গুলিস্তান ও নিউ মার্কেট এলাকায় টেবিল ও চৌকির আকারের ওপর নির্ভর করে দৈনিক চাঁদার পরিমাণ৷ পাঁচ ফুট লম্বা আর তিন ফুট চওড়া একটি টেবিল এবং তার সামনে একটি টুল বসিয়ে ব্যবসা করতে স্থান ভেদে দেড়শ' থেকে আড়াইশ' টাকা চাঁদা দিতে হয় প্রতিদিন৷ তবে ঈদের সময় তা আরো বেড়ে যায়৷ এর বাইরে বিদ্যুতের জন্য আলাদা টাকা দিতে হয়, তার হিসাব হয় বাল্ব প্রতি৷ একটি বাল্ব জ্বালালে দিনে ১০০ টাকা দিতে হয়৷ আবার নিরাপত্তার নামেও চাঁদা আদায় করা হয়৷

বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি আবুল কাসেম বলেন, ‘‘ফুটপাতে দৈনিক ব্যবসা প্রতি চাঁদার পরিমাণ ১০০ টাকা থেকে দেড় হাজার টাকা৷ যারা ফেরি করে পান-সিগারেট বিক্রি করে তাদেরও কমপক্ষে ১০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়৷ আর গুলিস্তানে যে গলির মধ্যে ঘেরাও দেয়া বেল্টের দোকান আছে তাদের দিনে চাঁদা দিতে হয় দেড় হাজার টাকা৷ এইভাবে স্থান ও আকার বিবেচনা করে বিভিন্ন হারে চাঁদা দিতে হয়৷''

‘নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ'

গাউছিয়া মার্কেটের সামনে এবং আশপাশের এলাকায় ৩০০ হকার ব্যবসা করেন৷ হকারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, যারা কাঠের চৌকি পেতে জামা-কাপড় বিক্রি করেন তাদের চাঁদার হার বেশি৷ চার ফুট বাই সাত ফুট একটি চৌকির জন্য দিতে হয় দিনে ৮০০-১০০০ টাকা৷ ওই একটি এলাকা থেকে দিনে গড়ে দেড় লাখ টাকার চাঁদা ওঠে৷ সেখানকার একজন হকার মনির হেসেন (ছদ্মনাম) জানান, ‘‘পুলিশের লাইনম্যানরা দুপুরের পর এসে টাকা নিয়ে যান৷ এই লাইনম্যানদের পরিচালনা করারও লোক আছে৷'' মনির হোসেন ওই এলাকায় ভেলপুরি বিক্রি করেন৷ তাকে একটি ছোট ভ্যানের ওপর এই ব্যবসা করতে দিনে ১৫০ টাকা দিতে হয়৷

জায়গা বা টেবিল সারা বছরের জন্য লিজও নেয়া যায়, তাতে খরচ একটু কম পড়ে৷ কেউ কেউ আছেন লাইনম্যানদের কাছ থেকে বসার জায়গা এক বছরের জন্য ‘ইজারা' নিয়ে আবার হকারদের কাছে ভাড়া দেন৷ এই ব্যবসাও আজকাল ভালো চলছে বলে জানান মনির৷ হকারদের নেতা আবুল কাসেম বলেন, ‘‘আমাদের হিসাবে ঢাকা শহরে প্রায় তিন লাখ হকার আছে৷ আমরা আনুমানিক হিসাব করে দেখেছি বছরে তাদের কাছ থেকে বছরে তিন হাজার কোটি টাকার চাঁদা নেয়া হয়৷''

রাজনীতিবিদদের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে এই চাঁদাবাজি পুলিশই নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি৷ বলেন, ‘‘এই ফুটপাতের মূল নিয়ন্ত্রক পুলিশ৷ তারাই স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বছরের পর সমঝোতা করে এই অবৈধ ব্যবসা চালাচ্ছে৷ আর লাইনম্যান নামে একটি স্থায়ী গ্রুপ গড়ে উঠেছে যারা ফুট বিক্রি এবং চাঁদা আদায়ের কাজ করে৷ তবে রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের সাথে এদের অবস্থানের তেমন পরিবর্তন হয় না৷ কারণ তারাই পুলিশের আস্থাভাজন৷ আর বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগের সাথে যুক্ত বিদ্যুৎ বিভাগের এক শ্রেণির লাইনম্যান৷''

সিটি কর্পোরেশনের কিছু কর্মচারীরাও এর সঙ্গে যুক্ত বলে জানান হকাররা৷ আদায়কৃত চাঁদার ভাগ ঢাকায় পুলিশের উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে যায় বলে জানান আবুল কাসেম৷

চাঁদার ভাগ যায় কাদের কাছে?

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স এন্ড ডেভেলমেন্ট-এর এই সংক্রান্ত একটি গবেষণা রয়েছে৷ ‘দ্য স্টেট অব সিটিজ ২০১৬: ট্রাফিক কনজেশন ইন ঢাকা সিটি-গভর্নেন্স পারসপেক্টিভ' শিরোনামের গবেষণাটিতে বলা হয়েছিল, ঢাকার দুই সিটির ফুটপাত থেকে বছরে এক হাজার ৮২৫ কোটি টাকার চাঁদা আদায় হয়, যা ওই সময়ে দুই সিটি কর্পোরেশনের মোট বাজেটের চেয়ে বেশি ছিল৷

গবেষক দলের প্রধান ছিলেন ড. মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ৷ তিনি এখন ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল স্টাডিজ অ্যান্ড গভর্নেন্স বিভাগের অধ্যাপক৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘আমরা গবেষণার সময় যে পরিস্থিতি দেখেছি তা এখনো অব্যাহত আছে৷ হকার ও চাঁদার পরিমাণ আরো বেড়েছে৷ হকার্স ফেডারেশন এখন বছরে যে তিন হাজার কোটি টাকা চাঁদার কথা বলছে তা আমার কাছে বাস্তব ভিত্তিক মনে হয়েছে৷''

গবেষণার তথ্য থেকে তিনি জানান, চাঁদার টাকা মোট তিনটি ভাগ হয়৷ এর মধ্যে পুলিশ নেয় ৩০ শতাংশ৷ আর যারা নিয়ন্ত্রণ করে এবং লাইনম্যানরা নেয় ৪০ শতাংশ৷ আর বাকি ৩০ ভাগ নেয় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা৷

ড. শাহনেওয়াজ বলেন, ‘‘আমরা প্রস্তাব করেছিলাম হকারদের জন্য এই ফুটপাতের ব্যবস্থা শৃঙ্খলার মাধ্যমে বৈধতা দিতে৷ তাদের পরিচয়পত্র বা ব্যবসার অনুমোদন দিতে৷ তাদের কাছ থেকে নির্ধারিত হারে অর্থ নিলে সেটা সরকারের তহবিলে জমা হতো৷ এতে সরকার লাভবান হতো এবং অবৈধ ব্যবসা বন্ধ হতো৷ কিন্তু সেটা হবে না৷ কারণ সরকার যাদের দিয়ে এটা করাবে তারাই এটা পরিচালনা করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ আয় করছে৷ তারাই এই ফুটপাতে চাঁদাবাজি টিকিয়ে রাখবে৷''

‘অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ'

ঢাকা মোট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ড. খ. মহিদ উদ্দিন বলেন, ‘‘এই (চাঁদাবাজির) অভিযোগ তো বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ চলে আসছে৷ সিটি কর্পোরেশন পুলিশের সহায়তায় বার বার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে, আবার তারা ফুটপাতে বসে৷ আর আমরা তো চাঁদাবাজি নিয়ে গবেষণা করিনি৷ যারা করেছেন তারা বলতে পারবেন৷ আমরা যদি আমাদের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাই তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিই৷''

প্রায়ই একই মন্তব্য করেছেন দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলামের৷

তিনি বলেন, ‘‘আমরা নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালাই৷ কিন্তু কাদের সহায়তায় তারা আবার বসে সেটা আসলেই দেখার বিষয় আছে৷ আমাদের কেউ যুক্ত থাকার প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেব৷''

তবে ফুটপাত থেকে হকারদের সরাসরি উচ্ছেদ না করে পুনর্বাসনে উদ্যোগ নেয়ার কথা জানান তিনি৷ ড. মহিদ উদ্দিন বলেন, ‘‘আমরা আধুনিক সিটি গড়ার জন্য একটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি৷ সেখানে শুধু ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ নয়, তাদেও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও থাকবে৷''

যাযাদি/ এস

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে