শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০
walton

যেমন আছেন খুরশীদ আলম

মাতিয়ার রাফায়েল
  ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩, ১০:৫৮

বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব মো. খুরশীদ আলম। এ দেশের সঙ্গীত শিল্পীদের মধ্যে যাদের কণ্ঠে প্লে-ব্যাক আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা পেয়েছে তাদের অন্যতম এই শিল্পী। অসাধারণ সুরেলা কণ্ঠের এই প্লে-ব্যাক শিল্পী ১৯৬৯ সালের ১ আগস্ট থেকে শুরু করে সর্বশেষ প্লে-ব্যাক করেছেন ২০১৬ সাল পর্যন্ত। তার প্লে-ব্যাকের সংখ্যা সাড়ে চারশত। প্রথম প্লে-ব্যাক করেই শ্রোতামহলের নজর কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাবুল চৌধুরী পরিচালিত ‘আগন্তুক’ চলচ্চিত্রের সেই গানটি হলো ‘বন্দি পাখির মতো’। গনটির ১০০ টাকা পেয়েছিলেন বলে জানালেন এই খ্যাতিমান তারকা। গানের কথা লিখেছেন ডা. আবু হায়দার সাজেদুর রহমান, সুর ও সঙ্গীত পরিচালনা করেন আজাদ রহমান। ছবিতে গানটির সঙ্গে ঠোঁট মিলিয়ে অভিনয় করেন নায়করাজ রাজ্জাক।

সেই প্রথম গাওয়া প্লে-ব্যাকটিই খুরশীদ আলমের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ব্যাপারটি এমন হয়ে গিয়েছিল যে, খুরশীদ আলমের কণ্ঠে যে প্লে-ব্যাকই শোনা যেত সেই প্লে-ব্যাকই শ্রোতাদের কাছে আলোড়িত এবং অনুরণিত হতো।

খুরশীদ আলম জানান, চলচ্চিত্র ও আধুনিক গানের শিল্পী হলেও বাল্যে তিনি স্বপ্ন দেখতেন একজন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হওয়ার। কিন্তু যে সময়টায় তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন সেই সময়টা ছিল রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্য এক কালো অধ্যায়। সেই বৈরী পরিবেশে আরও অনেকের মতো খুরশীদ আলমের কণ্ঠও একপর্যায়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়তে বাধ্য হয়। ১৯৬৫ সালে শেখ বোরহান উদ্দিন কলেজে প্রথমবারের মতো রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছিলেন তিনি। ঐ বছরই ১৯৬৫ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে চর্চা বন্ধ করে দেয়। ফলে তখন নিরুপায় হয়ে তিনি রেডিওতে আধুনিক গানের শিল্পী হওয়ার জন্য অডিশন দেন। রেডিওতে তার গাওয়া প্রথম দুটি গান হলো ‘তোমার দু’হাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম’ ও ‘চঞ্চল দু’নয়নে বলো না’। দুটো গানই শ্রোতামহলে দারুণ সাড়া পায়।

খুরশীদ আলম মানুষ হিসেবেও বেশ আমোদপ্রিয়। একবার তিনি এক ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছিলেন। কথাটি তিনি সবার সঙ্গেই বলেন। নামকরা গানের শিল্পী হলেও গাড়ি নেই তার। বেশির ভাগ সময় পায়ে হেঁটে চলাফেরা করেন। সেই ছিনতাইকারীও ছিল গানপিপাসু। কোমরে অস্ত্র আছে, সেটা দেখিয়ে শিল্পীকে বলেছিলেন, আপনাকে এখানে মেরে রেখে গেলে একটা গাড়িও থামিয়ে কেউ দেখতে আসবে না। আপনার একটা গান আমার অনেক ভাল্লাগে। দুই লাইন গেয়ে শোনাবেন? খুরশীদ আলম সেই ছিনতাইকারীকে তার প্রিয় গানটি শুনিয়েছিলেন। তারপর তাকে খানিকটা পথ এগিয়েও দিয়েছিল সেই ছিনতাইকারী।

বোঝাই যাচ্ছে যার গান দুষ্কৃতিকারীদেরও প্রিয় সাধারণ মানুষের কাছে তার গান কেমন প্রিয় হবে! আসলেই খুরশীদ আলমের কণ্ঠে এমন গান খুব কমই আছে যে গান শ্রোতাপ্রিয় হয়নি। আজও তার এমন বহু গান আছে যেসব গান আজকের প্রজন্মের শিল্পীরাও পুরনো দিনের গান শুনতে গিয়ে তার সেই গানগুলোও শোনেন। তবে মো. খুরশীদ আলমের মতে, তার জীবনের সেরা গান ‘সমাধান’ ছবির ‘মাগো মা ওগো মা, আমারে বানাইলি তুই দিওয়ানা’। গানটির গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক সত্য সাহা। এ ছাড়াও আরও একটি গান তার খুব ভালো লাগার বলে জানালেন খুরশীদ আলম। সেটি হচ্ছে, রাজ্জাক পরিচালিত ‘অনন্ত প্রেম’ ছবির ‘ও চোখে চোখে পড়েছে যখনই’। গানের কথা লিখেছেন আহমেদ জামান চৌধুরী, সুর ও সঙ্গীত পরিচালনা করেন আজাদ রহমান।

যখন কোনো মঞ্চে গাইতে উঠেন তখন দর্শকরা তার কোন গানগুলো বেশি শুনতে চায় এমন প্রশ্নে খুরশীদ আলম বলেন, ‘বন্দি পাখির মতো’, ‘চুমকি চলেছে একা পথে’, ‘বন্ধু তোর বরাত নিয়া আমি যাব’, ‘আজকে না হয় ভালোবাস আর কোনো দিন নয়’, ‘ও অনুপমা ওহো নিরূপমা’, ‘আজ মন রাখা হলো দায়’, ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনই’, ‘ধীরে ধীরে চল ঘোড়া সাথী বড় আনকোরা’ ‘রূপনগরের পরী’, ‘মাগো মা ওগো মা, আমারে বানাইলি তুই দিওয়ানা’, ‘বাপের চোখের মণি নয়’, ‘এই আকাশকে সাক্ষী রেখে’, ‘আলতো পায়ে’, ‘চুরি করেছ আমার মনটা’, ‘মনেরও রঙে রাঙাবো’, ‘ও দুটি নয়নে’, ‘পাখির বাসার মতো দুটো চোখ তোমার’, ‘তোমরা যারা আজ আমাদের ভাবছো মানুষ কিনা’Ñ প্রভৃতি গানগুলো শ্রোতারা বেশি শুনতে চায়।

শ্রোতাদের কাছে আসলেই এই গানগুলো তখন ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। পিছিয়ে নেই জনপ্রিয়তার দিক থেকে আজও এই গানগুলো। কিন্তু এত শ্রোতাপ্রিয় প্লে-ব্যাকে কণ্ঠ দিলেও আজও পর্যন্ত তিনি কোনো একটি গানের জন্য বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য মনোনীত হননি- এ নিয়ে কি কখনো মন খারাপ করেন তিনি? এমন প্রশ্নে খুরশীদ আলম বলেন- ‘না ভাই, সৃষ্টিকর্তা আমাকে যথেষ্ট সম্মানিত করেছেন। সৃষ্টিকর্তার কাছে অশেষ কৃতজ্ঞ আমি। ২০১৭ সালে চ্যানেল আই আজীবন সম্মাননা পেয়েছি, ২০১৮ সালে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক পেয়েছি, আরও অনেক পুরস্কৃত হয়েছি সব মিলিয়েই আমার আর কোনো অপ্রাপ্তি নেই। আমি ১৯৬৮ সাল থেকে শুরু করে সর্বশেষ প্লে-ব্যাক করেছি ২০১৬ সালে। এ পর্যন্ত ৪৫০টি প্লে-ব্যাক করেছি। প্রায় সব নায়কই আমার গানে ঠোঁট মিলিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ঠোঁট মিলিয়েছেন রাজ্জাক সাহেব। এছাড়া রহমান, ওয়াসিম, জাফর ইকবাল, সোহেল রানা, মাহমুদ কলি, আলমগীর, জাভেদ, ইলিয়াস কাঞ্চনসহ বিভিন্ন চিত্রনায়কের ছবিতে প্লে-ব্যাক করেছেন। প্লে-ব্যাকের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাইনি বলে কোনো আক্ষেপ নেই আমার। প্লে-ব্যাকে আমার বহু গানই হিট হয়েছে। আমার এই শ্রোতাপ্রিয় গানগুলোর জন্যই দেশের আঠারো কোটি লোক এখনও আমাকে ভালোবাসেন।’

নিজের সময়ের গানের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের গানের গুণগত পার্থক্য কেমন, জানতে চাইলে খুরশীদ আলম বলেন- ‘এখন যারা গান লিখছে তারা যে খুব খারাপ লিখছে, সেটা বলব না। মোবাইল ফোন, অ্যাপ, ইউটিউব যুগের সাথে তাল মিলিয়ে গান লিখছে। আমাদের সময়ের অনেক গান যেমন আজকে ভালো বলছে বর্তমানের কোনো গানও বিশ বছর পর তেমনি হয়তো বলবে ঐ গানগুলো ভালো ছিল। তবে আগের গানে যেমন ওজন ছিল, বাণীর প্রাধান্য ছিল, শিল্প ছিল, স্বাচ্ছন্দ্যতা ছিল, শ্রুতিমধুরতা ছিল এখনকার গানে খুব কম।’

যাযাদি/ এস

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে