মহান নেতা বঙ্গবন্ধু

মহান নেতা বঙ্গবন্ধু

অদম্য সাহস, অনমনীয় মনোভাব আর আপসহীন নীতিতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন অনন্য সাধারণ কালজয়ী এক নেতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা মানেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ দেশে তার মতো একজন অবিসংবাদিত নেতার জন্ম হয়েছিল বলেই বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। বাংলাদেশের কথা বলতে গেলে তাই অনিবার্যভাবে এসে যায় বঙ্গবন্ধুর জীবনগাথা। এমন কিংবদন্তি মহানায়ক পৃথিবীতে বারবার জন্মগ্রহণ করে না। বঙ্গবন্ধু সবসময় গরিব-মেহনতি, বঞ্চিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের এবং দেশের মানুষের সুখ-সমৃদ্ধি আর উন্নয়নের স্বপ্ন দেখে গেছেন। শুধু স্বপ্ন দেখেই ক্ষান্ত হননি, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বঙ্গবন্ধু ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। ছিলেন নিঃস্বার্থ এবং প্রগতিশীল চিন্তাচেতনা আদর্শের অনুসারী। সেই মহান নেতার জীবনের নানা বিষয়, সংগ্রামী জীবনের চড়াই-উতরাই, নাটকীয়তা, অসাধারণত্ব, স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে অনন্য চিন্তাভাবনা, ব্যতিক্রমী রাষ্ট্রদর্শন ইত্যাদি বিষয় একটি মাত্র লেখায় পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ সমগ্র বাঙালি জাতির মনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে দিয়েছিল শত সহস্রগুণ। দেরি যেন আর সয়না কারও এক মুহূর্তও সারাদেশের মানুষের, বেসামরিক প্রশাসন, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান সবকিছুই তখন থেকে চলছিল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। সাধারণ কৃষক-শ্রমিক থেকে দিনমজুর, গায়ের গৃহবধূর মুখে মুখে তখন বলাবলি হচ্ছিল বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের সঙ্গে থাকছে না। শেখ সাহেব ঘোষণা করছেন, দেশে স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে। অবস্থা বুঝে সবাই ধরে নিয়েছিলেন, যে কোনো মুহূর্তে দেশে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। শুধু সময়ের অপেক্ষা। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ওই ভাষণেই তিনি জনগণকে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দিয়েছিলেন। শত্রম্নকে মোকাবিলার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম' প্রকারন্তরে তিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাই দিয়েছিলেন তার এই ঘোষণাকে ভিত্তি করেই সারাদেশে শুরু হয়েছিল প্রস্তুতি। তবে ওইদিন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দেওয়ার কারণ প্রসঙ্গে ওই সময়ের সার্বিক প্রেক্ষাপট ও বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। তৎকালীন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তখনো বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ শক্তি চীন পাকিস্তান সরকারের প্রতি নিরঙ্কুশ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৭০-এর নির্বাচন পরবর্তী দিনগুলোতে বিভিন্ন সময় পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী বাংলার মুক্তিকামী ছাত্র-জনতার প্রতিবাদ বিক্ষোভ দমনের উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যাকান্ড চালিয়ে যেতে থাকে। পাশাপাশি ২ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমতো প্রতিদিন পালিত হতে থাকে হরতাল। ৬ মার্চ পর্যন্ত কর্মসূচি পালিত হওয়ার পর এলো সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত ৭ মার্চ, শিহরণ জাগানো ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানের রাজপথজুড়ে নেমেছিল জনতার ঢল, বিশাল রেসকোর্স ময়দানের কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। ছাত্র-জনতাসহ দেশি-বিদেশি অনেকের ধারণা ও প্রত্যাশা ছিল, এই বিশাল জনসমুদ্রের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। তাই সভার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবার দৃষ্টি ছিল বঙ্গবন্ধুর দিকে। সবার অনুমান ছিল রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ঘোষণা দেবেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের কথা বলেছেন। মুক্তির জন্য সংগ্রামের কথা বলেছেন। যুদ্ধ শব্দটি সরাসরি না বলে লড়াই-এর জন্য জনগণকে প্রস্তুত হতে বলেছেন। সামরিক বেসামরিক পর্যায়ে চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষের অনেকেই এই ভাষণ শুনে শিহরিত হয়েছেন। সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছেন বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের গন্ডিবদ্ধ নেই। বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতাপ্রাপ্তি তার সময়ের ব্যাপার মাত্র। এই ভাষণ শোনার পর থেকে রক্তে আগুন জ্বলে ওঠে বাঙালির শিরায় শিরায়- সেই থেকে নতুন উদ্যোমে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলে বা যুদ্ধ শুরু হলে তা দীর্ঘায়িত হবে নাকি স্বল্পকালীন হবে তার নিশ্চয়তা ছিল না। এ ছাড়া যুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন লাভের বিষয়টি বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মৈত্রী চুক্তি তখনো সম্পাদিত হয়নি। পাকিস্তানিদের দীর্ঘদিনের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, বছরখানেক আগে শেষ হওয়া আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার ফলাফলসহ সামগ্রিক বিষয়টি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছিলেন সে সময় বঙ্গবন্ধু। সবদিক বুঝে-শুনেই ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি দিয়েছিলেন তিনি। আব্রাহাম লিংকন, উইনস্টন চার্চিল এবং বঙ্গবন্ধু- তিন মহানায়কের তিনটি কালজয়ী ভাষণ বিশ্বের ইতিহাসে অম্স্নান হয়ে আছে। এই তিন মহানায়কের ভাষণের মধ্যে অপূর্ব মিল দেখা যায়- মার্কিন গণতন্ত্রের পথ প্রদর্শক আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষণ, ব্রিটিশ জাতির সংকটকালীন প্রদত্ত উইনস্টন চার্চিলের যুদ্ধকালীন একটি বেতার ভাষণ ও বাঙালি জাতির চরম ক্রান্তিলগ্নে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত হওয়ার সার্বিক দিক-নির্দেশনা দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ। তিনি ৭ মার্চের ভাষণে জনতাকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তার অবর্তমানে কীভাবে শত্রম্নর মোকাবিলা করতে হবে, তার সুস্পষ্ট কৌশল পন্থা তিনি তার ভাষণে সহজভাবে ব্যক্ত করেছিলেন। ৭ মার্চের অবিস্মরণীয় ভাষণ দিতে সভায় তিনি ছিলেন একাই। দৃপ্ত পদক্ষেপে তিনি সভামঞ্চে উপস্থিত হন। চরম আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান মহানায়ক শির উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন জীবনের শ্রেষ্ঠতম বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। বিভিন্ন জনের বক্তব্য বিবেচনা করে এটা দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ যে ভাষণ দিয়েছেন তা তার নিজস্ব চিন্তাভাবনা প্রসূত। তার কাছে কোনো লিখিত কাগজ ছিল না। তার সামনে পডিয়ামের উপর শুধু চশমা রাখা ছিল। তিনি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে, নিজস্ব ভাষায় সেরা সেই অবিস্মরণীয় ভাষণ প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধু আজীবন স্বতঃস্ফূর্তভাবে বক্তৃতা দিতেন। কারও লিখিত বক্তৃতা তিনি পড়তে পারতেন না, পড়েনওনি। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ লিখিত হতো না। সমাজবিজ্ঞানী সরদার ফজলুল করিমের ভাষায় 'শেখ মুজিবের ভাষণ যেমন লিখিত হতো না, তেমনি তার প্রদত্ত ভাষণকে লেখা যেত না।' ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে ইতোমধ্যেই অসংখ্য লেখা বেরিয়েছে। একাধিক বই রচনা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ পৃথিবীর সেরা ভাষণের একটি হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩১ অব্দ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত ইতিহাস সৃষ্টিকারী ভাষণের মধ্যে স্থান পেয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইচ্ছাশক্তি ও দূরদর্শিতা ছিল অত্যন্ত প্রবল। তার সহকর্মীদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত তরুণরা এবং ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের টগবগে সদস্যরা তার নেতৃত্বের প্রতি মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েছিল। পাকিস্তানিদের অন্যায়, অবিচার, জুলুম, শোষণের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবই তাদের হৃদয়ে আসন গেড়ে বসতে সক্ষম হয়েছিলেন। পাকিস্তানি দুঃশাসন ও বৈষম্যমূলক নীতির শিকার সামরিক বাহিনীর কিছু চাকরিরত ও অবসরপ্রাপ্ত সদস্যও শেখ মুজিবের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে ভাবতে শুরু করেছিলেন। দৃশ্যত, পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী সামরিক বেসামরিক পর্যায়ে বাঙালিদের প্রতি যে অমানবিক শাসন-শোষণের প্রক্রিয়া চালাতে থাকে তা থেকে জাতিকে মুক্তির লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছিল ঐতিহাসিক ৬ দফা। পরবর্তী সময়ে প্রমাণিত হয়েছে, ৬ দফা ছিল পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলন রচনার প্রধান সোপান। শেখ মুজিব জানতেন, ৬ দফা দাবি কোনোভাবেই পাকিস্তান সরকার মেনে নেবে না। আর বাংলার জনগণ ৬ দফা গ্রহণ করলে এর ভিত্তিতে নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার জনগণ পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারবে। আর এভাবে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিকভাবে গড়ে উঠবে একটি ভিত্তি। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ বঞ্চনার মাত্রা চরমে পৌঁছেছিল। বিশেষ করে অর্থনৈতিক শোষণ পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়ন অগ্রগতির চাকাকে রুদ্ধ করেছিল। মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার এবং বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের উন্নয়নের ব্যাপারে সুষম দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না। বিদেশি সাহায্যভুক্ত প্রকল্পের সিংহভাগই নেওয়া হতো পশ্চিমাঞ্চলে এবং বিনিয়োগও হতো সেখানে। বাংলাদেশে উৎপাদিত পাট ও পাটজাত দ্রব্যের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার হতো পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পোন্নয়ন খাতে। এ অবস্থায় বাংলার জনগণ সামগ্রিকভাবে উন্নয়নে পিছিয়ে পড়ে, ফুটে ওঠে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে চরম বৈষম্যের চিত্র। ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণের প্রতিটি শব্দে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিকে বিদ্রোহ করার অনুপ্রেরণা দেওয়া হয়েছে। ওই ভাষণে যুদ্ধ পরিচালনার সব নির্দেশনা ছিল। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের উদ্দীপনায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে এবং মাত্র নয় মাসে দেশ স্বাধীন হয়েছে এটা মানতেই হবে সবাইকে। ৭ মার্চের ভাষণে প্রদত্ত নির্দেশ মতো মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছে জীবনবাজি রেখে। ওই ভাষণই ছিল মুক্তিযুদ্ধের নৈতিক বলের প্রধান উৎস এবং যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতি ও কৌশল। আজকের নতুন প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দারুণ ক্যারিশমাটিক একজন নেতা মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ একটি ভাষণেই তিনি গোটা বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন। এর আগে ক্ষুদিরাম এসেছিলেন, তিতুমীর, সুভাষ বসু, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সূর্যসেন এসেছিলেন। তারা পরতে পরতে মহা আহ্বানের সোপান রচনা করে গেছেন। অবশেষে এলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সাগর সমান প্রমত্ত প্রবাহ তার ভাষণকে হৃদয়ের বীণায় ঝংকৃত করে দিয়েছিল। ছোট-বড় ৮২টি বাক্য সমন্ব্বয়ে সাড়ে ১৮ মিনিটের ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ওই ভাষণে রাজনীতি ছিল, সমাজ অর্থনীতি ইতিহাস সবই ছিল, অসহযোগের আহ্বান ছিল, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ধিক্কার ছিল, যুদ্ধের বিশাল প্রস্তুতির কথা ছিল। এমন হৃদয় বিদীর্ণ করা, এমন দিগন্ত পস্নাবিত করা, এমন আবেগ মথিত জলোচ্ছ্বাসময় প্রবল ভাষণ বাংলাদেশের মানুষ আগে কখনো শোনেনি। এই ভাষণ শুধু ভাষণ ছিল না- যা ছিল এক বীজমন্ত্র- যা কোটি কোটি মানুষকে শুধু উদ্দীপ্ত করেনি, এক কঠিন সংগ্রামের দিকে ধাবিত করেছে। যে কোনো ব্যক্তি নয়, একটা আলোড়িত জাতির মর্মমূল থেকে এই ভাষণের উৎপত্তি প্রাকৃতিক ঘটনার মতো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে সমগ্র বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার জন্য পুরোপুরি মানসিকভাবে তৈরি করেছিলেন। স্বাধীনতার ঘোষণা ছাড়া, অন্যকিছুতেই তারা তখন সন্তুষ্ট হতো না। সে জন্যই ২৬ মার্চ থেকে বাঙালিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেশের সবখানে প্রতিরোধের লড়াইয়ে নেমে পড়েছিল। আর কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য তারা অপেক্ষা করেনি তখন। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন তিনিই দেখিয়েছিলেন বাঙালিকে। তিনি বহু দলে বিভক্ত বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন ৭ মার্চের কালজয়ী সেই ভাষণের মাধ্যমে। তার উদাত্ত আহ্বান জাদুকরী প্রভাব ফেলেছিল এ দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা সবার হৃদয়ে। ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জাতির জনক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিলেন জনগণের কাছে। ওই ভাষণেই তিনি সাহস, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণাবলির প্রকাশ ঘটিয়ে ছিলেন অদ্ভুত সুনিপুণতায়। যা সচরাচর সব নেতার ক্ষেত্রে ঘটে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা মানেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। হিমালয়সম এমন নেতা এখানে জন্মেছিলেন বলেই বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা, বাংলাদেশ- এ শব্দগুলো যেন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ অভিন্ন। বাংলাদেশের কথা বলতে গেলে অনিবার্যভাবে এসে যায় বঙ্গবন্ধুর জীবনগাঁথা। সাধারণ জনগণের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত তার ও বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই সামনে এসে দাঁড়ায় বাংলাদেশ নামের স্বাধীন ভূখন্ডের জন্ম কাহিনী। তরুণ রাজনৈতিককর্মী শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান আন্দোলনে যুক্ত না হলেও দেশটির জন্ম ঠেকে থাকত না। কিন্তু তিনি না থাকলে বাংলাদেশের জন্মই হতো না। পাকিস্তান যে বাঙালি জাতির বিকাশে অনুকূল স্থান হবে না, তা তিনি দেশটির জন্মের পরপরই উপলব্ধি করেছিলেন। তার আত্মজীবনীতে এই গভীর উপলব্ধির প্রকাশ ঘটেছে। শুধু ঘোষণা দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভু্যদয় ঘটেনি। এ জন্য আন্দোলন-সংগ্রামের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। বাঙালির প্রতিটি অধিকার আদায়ের আন্দোলনে আর শোষণ, বঞ্চনা, অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগ্রামে সব সময় নেতৃত্বের অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির প্রতিটি পদক্ষেপই বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিল। তার সঠিক দিকনির্দেশনা ও সময়মতো স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল রাজনৈতিক প্রজ্ঞারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। লেখক অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে