logo
রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৫ আশ্বিন ১৪২৭

  সালাম সালেহ উদদীন   ৩০ জুলাই ২০২০, ০০:০০  

দুর্যোগকবলিত অসহায় মানুষ

শুধু সরকারকে এককভাবে দায়ী না করে দুর্যোগ মোকাবিলায় সবাইকেই সাধ্যমতো এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষভাবে এগিয়ে আসতে হবে. দেশের বিত্তশালীসহ বেসরকারি পর্যায়ের স্বেচ্ছাসেবী বিভিন্ন সংগঠনকেও। এবার বন্যায় দেশের যেসব মানুষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও তাই বলেছেন। বন্যা মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে স্থায়ী পরিকল্পনার দিকে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি করোনার ভয়াবহতা কীভাবে কমানো যায় সে বিষয়েও নিতে হবে যথাযথ ও কার্যকর উদ্যোগ।

দুর্যোগকবলিত অসহায় মানুষ
দেশের মানুষ আজ দুর্যোগকবলিত, করোনা ও বন্যা দুটোতেই আক্রান্ত। যতই দিন যাচ্ছে করোনার ভয়াবহতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, বাড়ছে বন্যাকবলিত এলাকাও। ফলে মানুষের জীবন-জীবিকা ও বেঁচে থাকা দুটোই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৩ হাজার ৩৫ জন মানুষের মৃতু্যর খবর গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে দুই লাখ ৩২ হাজার ১৯৪ জন মানুষ। দেশ করোনা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। নানা ধরনের অব্যবস্থাপনার চিত্র ফুটে উঠেছে দায়িত্বরত ব্যক্তিদের কারণে। করোনা নিয়ে হয়েছে প্রতারণাও। মানুষের জীবনযাপন বদলে গেছে, বদলে গেছে মনোজগৎও। করোনাকালে দেশের বেশিরভাগ মানুষ অর্থ সংকটে পড়েছে। করোনায় চরম বিপাকে পড়েছে গ্রামাঞ্চলের কৃষক থেকে শুরু করে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। একইসঙ্গে করোনাভাইরাসের চলমান প্রভাবে মানুষ গ্রামমুখী হচ্ছে। স্থায়ীভাবে অসংখ্য মানুষ গ্রামে আসায় নানামুখী নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আয়ের উৎস। ফলে সামগ্রিকভাবে বাড়ছে সংকট। শহরের চিত্র আরও করুণ। অনেকের চাকরি নেই, ব্যবসা নেই। চাকরি হারিয়ে একাধিক ব্যক্তি আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। মানুষের মধ্যে মৃতু্য আতঙ্ক কাজ করছে। তবে দেশের অনেক মানুষই স্বাস্থ্যসচেতন নয়। তারা সরকারের দেয়া স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে না। মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক হলেও পালন করছে না তা। সারা বিশ্বে মহামারি হয়ে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস প্রতিরোধে লকডাউনের চেয়েও সবচেয়ে কার্যকর পন্থা হলো মাস্ক ব্যবহার করা। কারণ করোনাভাইরাস মূলত বাতাসে ড্রপলেটস বা মুখ থেকে নিঃসৃত মিহি জলকণার মাধ্যমে ছড়ায়। আর মাস্ক ব্যবহার করলে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায় বলে নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে। তারপরেও আমরা তা মানছি না। ফলে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে, বাড়ছে মৃতু্যও।

এর মধ্যে দেখা দিয়েছে বন্যা। চলতি মৌসুমে বন্যা শুরু হয়েছে গত ২৬ জুন। প্রথম ধাপে অন্তত ১০টি জেলায়, দ্বিতীয় ধাপে আরও আটটি জেলায় বিস্তার ঘটে বন্যার। ২৬ জুলাই পর্যন্ত সব মিলিয়ে দেশের ৩১ জেলার নিম্নাঞ্চল তিন ধাপে পস্নাবিত হয়েছে। দেশের মধ্যাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। অনেক এলাকার গ্রামীণ রাস্তাঘাট এখন পানির নিচে। শহরাঞ্চলে সরকারি বিভিন্ন অফিসেও ঢুকেছে পানি। কোথাও কোথাও রেলপথও পস্নাবিত হয়েছে। ফেরিঘাটের সংযোগ সড়ক বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি ঢুকেছে বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিক ও হাসপাতালে। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের দুর্দশার শেষ নেই। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণে থাকা ১০১টি পানির স্টেশনের মধ্যে ৪৪টি স্টেশনের পানি বাড়ছে। ৫৪টির কমছে। অপরিবর্তিত রয়েছে তিনটি স্টেশনের পানি। বিপদসীমার ওপরে স্টেশনের সংখ্যা এখন ২৮ আর বিপদসীমার ওপরে নদীর সংখ্যা ১৮। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি সমতল থেকে বাড়ছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, ১৬ বছর পর বন্যার পানি ঢুকেছে রাজধানীতে। ডুবে গেছে সিটি করপোরেশনের আওতাধীন বেরাইদ, সাতারকুল, গোড়ান, বনশ্রী, বাসাবো, আফতাবনগরের নীচু এলাকা। রাজধানীর আশপাশের বালু, তুরাগ ও টঙ্গীখালের পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ঢাকার পূর্বাঞ্চলে যতদিন বাঁধ নির্মাণ না হবে ততোদিন বন্যায় ভাসতে হবে রাজধানীবাসীকে।

তুলনামূলকভাবে পানির উচ্চতা প্রবাহ, যা নদীর তীর অতিক্রম করে ধাবিত হয়, তীর ছাড়িয়ে পানি আশপাশের সমভূমিকে পস্নাবিত করে এবং ক্ষেতের ফসল, বৃক্ষ, গবাদিপশু ও ঘরবাড়িসহ মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে সর্বগ্রাসী বন্যা। ভারী বৃষ্টিপাত, হিমালয়ে তুষার গলন এবং হিমবাগুর স্থানান্তর সংঘটনের কারণে বন্যা দেখা দেয়। ১৯৮৮ সালে পানি ১১২ সেন্টিমিটার এবং ১৯৯৮ সালে বিপদসীমার ৮৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দেশে বন্যার সৃষ্টি করেছিল। অতীতে বাংলাদেশে বন্যা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে ১৯৬৬, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৮ ও ২০১৭ সালে। প্রতিবছর বাংলাদেশে ২৬ হাজার বর্গমিটার এলাকা বন্যায় পস্নাবিত হয়। দেশে প্রতিবছরই ছোট-বড় একাধিক বন্যা হতে দেখা যায়। সেই বন্যার স্থায়িত্বের ওপর ভিত্তি করে আবার এর ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে থাকে। প্রতি ১০ বছর পরপর বাংলাদেশের ইতিহাসে একেকটি বড় আকারের বন্যা আঘাত হানতে দেখা যায়।

ব্যাপ্তির বিচারে আগের অনেক বন্যার চেয়ে এবারের বন্যা কম ভয়ঙ্কর হলেও এবারে গতি-প্রকৃতি 'কিছুটা ব্যতিক্রম' বলে মনে করছেন বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, 'প্রচুর রাস্তাঘাট আর অবকাঠামোগত উন্নয়ন হওয়ায় নদীর মুখ অনেক জায়গা ভরাট হয়ে গেছে। তাতে বন্যা আর আগের মতো বেশি এলাকায় না ছড়িয়ে অববাহিকায় আটকে থাকছে, তাতে বন্যার স্থায়িত্ব বাড়ছে।'

অভিযোগ রয়েছে, ভারতের অভিন্ন নদীগুলোর সব বাঁধ ব্যারেজের গেট খুলে দেওয়ায় উজান থেকে নেমে আসা বন্যার পানি বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, মেঘনা, মহানন্দা, পদ্মা, তিস্তা ও ধরলা নদীর অবাহিকায় প্রায় ৩৪টি জেলা ইতিমধ্যে পস্নাবিত হয়ে গেছে। কয়েকটি জেলায় এক মাসের মধ্যে দুই-তিন বার বন্যার পানি উজান থেকে এসে ঘরবাড়ি, ফসলের ক্ষেত ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। বন্যায় অসহায় মানুষের দুর্দশার চিত্র অনুধাবন করতে হবে। খাবার নেই, আশ্রয় নেই। অনেকে ঘরের চালে আশ্রয় নিয়েছে।

ভারতের সঙ্গে যে অভিন্ন নদী প্রায় ১৫৪টি, একমাত্র পদ্মার ফারাক্কা বাঁধ ব্যতীত কোনোটারই কোনো পানি বণ্টন চুক্তি ভারতের অনীহার কারণে সম্পন্ন হয়নি। তিস্তার চুক্তি এক দশক ধরে ঝুলে আছে ভারতের কারণে। এখানে বড় বাধা পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের কোনো আন্তরিকতার অভাব নেই। প্রায় প্রতি বছর বাংলাদেশের নদী অববাহিকায় বসবাসকারী মানুষ এই বন্যায় আক্রান্ত হয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। তাদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ছে। ভারত যদি প্রকৃত অর্থেই বন্ধুরাষ্ট্র হয়ে থাকে, তা হলে ভারতকে কেবল নিজের স্বার্থ দেখলে চলবে না, বাংলাদেশে স্বার্থও দেখতে হবে। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন কী করছে এটাই অনেকের প্রশ্ন।

আশার কথা, বন্যা শেষ হলে সময় মতো কার্যকর পুনর্বাসন কর্মসূচি হাতে নিয়ে সেগুলো বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সোমবার ভার্চুয়াল মন্ত্রিসভা বৈঠকে বন্যা নিয়ে আলোচনার সময় প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশনা দেন। আমরা আশা করছি, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা কার্যকর হবে। আশার কথা, অতিবর্ষণ জনিত কারণে সৃষ্ট বন্যায় ৩১টি জেলায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে মানবিক সহায়তা হিসেবে এ পর্যন্ত সাত হাজার ১৪৭ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। বন্যাকবলিত জেলা প্রশাসনসমূহ থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী নগদ টাকা বিতরণ করা হয়েছে দুই কোটি দুই লাখ ১২ হাজার ৭০০ টাকা। শিশু খাদ্য ক্রয় বাবদ বিতরণের পরিমাণ ৩৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা, গো খাদ্য ক্রয় বাবদ বিতরণের পরিমাণ ৫৭ লাখ ৫৯ হাজার টাকা, শুকনো ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে ৮২ হাজার ১২ প্যাকেট। এছাড়াও ঢেউটিন বিতরণ করা হয়েছে ১০০ বান্ডিল এবং গৃহ মঞ্জুরি বাবদ বিতরণ করা হয়েছে তিন লাখ টাকা। এ ছাড়াও করোনাকালে ৭ কোটি মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দেয়া হয়েছে।

এটা সত্য, বন্যা চলে যাওয়ার পর কৃষি পুনর্বাসন, ভেঙে যাওয়া বাঁধ ও রাস্তাঘাট পুনঃসংস্কার করা, জরুরি ওষুধ সরবরাহ ইত্যাদি তাৎক্ষণিক প্রয়োজন হয়ে পড়ে। বন্যা চলাকালে খাদ্যের সংকট, বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট, মানুষের খাদ্যের পাশাপাশি পশুখাদ্যের সংকট ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। আর সেসব কারণে মানুষের নানা ধরনের পেটের পীড়াজনিত রোগ দেখা দেয়। সে জন্য সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ কার্যক্রম হিসেবে এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রাদি সরবরাহের ওপর জোর দেয়া হয়ে থাকে। এবারও জোর দিতে হবে। সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে। মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য- এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। নিজেকে নিয়োজিত করতে হবে আর্তমানবতার সেবায়।

অনেকদিন থেকে একটা বিষয় লক্ষণীয়, আমরা যে কোনো প্রাকৃতিক কিংবা দৈব-দুর্বিপাক মোকাবিলার ক্ষেত্রে শুধু সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে বসে থাকি। মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে সরকারের অবশ্যই দায় রয়েছে।

শুধু সরকারকে এককভাবে দায়ী না করে দুর্যোগ মোকাবিলায় সবাইকেই সাধ্যমতো এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষভাবে এগিয়ে আসতে হবে. দেশের বিত্তশালীসহ বেসরকারি পর্যায়ের স্বেচ্ছাসেবী বিভিন্ন সংগঠনকেও। এবার বন্যায় দেশের যেসব মানুষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও তাই বলেছেন। বন্যা মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে স্থায়ী পরিকল্পনার দিকে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি করোনার ভয়াবহতা কীভাবে কমানো যায় সে বিষয়েও নিতে হবে যথাযথ ও কার্যকর উদ্যোগ।

সালাম সালেহ উদদীন : কবি, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে